সাঙ্গুর স্রোতে ভেসে চলে হাজারো জীবন

ভোরের প্রথম আলো পাহাড়ের গায়ে পড়তেই সাঙ্গু নদীর বুক জেগে ওঠে। ভোর হতেই থানচির ঘাটগুলোতে শুরু হয় ব্যস্ততা। শহরের বাসস্ট্যান্ডের মতোই এখানে জমে ওঠে নদীর ঘাট। কারণ দিনের প্রথম যাত্রা শুরু হয় নৌকায়। উপজেলার থেকে তিন্দু রেমাক্রী, বড়মদক, ছোটমদক ও আন্ধারমানিকসহ বহু দুর্গম পাড়ায় পৌঁছাতে এখনও ভরসা একমাত্র নৌকা। এ যেন একটি নদীর নয়, একটি জনপদের জেগে ওঠার গল্প।
সাঙ্গু নদীর বাঘের মুখ এলাকায় ৪০ বছর ধরে টং ঘর দোকান বসিয়ে ব্যবসা করছে অংসাজাই মারমা। তার ছোট্ট দোকানে কিছু বিস্কুটের প্যাকেট, পাহাড়ে উৎপাদিত কলা ও চামচের টংটাং শব্দের চা বিক্রি করে চলে সংসার। নদীতে পানি বেড়ে গেলে পাহাড়ে উঠে যান আর কমে গেলে আবার নেমে ব্যবসা শুরু করেন। সামান্য নৌকা যাত্রী কিংবা পর্যটকদের কাছে টুকটাক বিক্রি করে নদীর চরে জীবনের সংগ্রাম চালাচ্ছেন অংসাজাই মারমা।
ছোট টং ঘর দোকানে বসে কথা হয় অংসাজাই মারমা সাথে। তিনি আবেগ নিয়ে বলেন, আগে এই দুর্গম এলাকাতে কেউ ছিল না। পাহাড় ঘেরা জঙ্গল আর বড় বড় গাছ ছিল। এখন মানুষজন ধীরে ধীরে বসবাস শুরু করছে। থানচি সদর থেকে আন্ধারমানিক পর্যন্ত যাতায়াতের একমাত্র রাস্তায় হল সাঙ্গু নদী। রোগী, শিক্ষার্থী, কিংবা নানা সমস্যা হলেও এক নদীর পথে দিনে-রাতে নৌকা শব্দ শুনা যায়। আমাদের অনেক কষ্ট হয়’ তবুও জীবনের সংগ্রাম চালাতে এখানে থাকতে হয়।
কুয়াশার চাদর সরিয়ে একের পর এক ইঞ্জিনচালিত নৌকা আর ডিঙি ভেসে চলে। থানচি ঘাট হয়ে দুর্গম প্রতিটি এলাকায় নৌকা ছুটে গেলে কোথাও স্কুলগামী শিশুরা বই বুকে নিয়ে বসে আছে, কোথাও বাজারের ব্যাগ হাতে অপেক্ষা করছেন কৃষক কিংবা গৃহিণী। কারও গন্তব্য উপজেলা সদর, কারও হাসপাতাল, আবার কেউ যাচ্ছেন জীবিকার সন্ধানে। যোগাযোগের পথ না থাকায় স্কুলে যাওয়া, বাজার করা, চিকিৎসা নেওয়া কিংবা সরকারি সেবা পেতে—প্রতিটি প্রয়োজনেই নদীপথে নির্ভরশীল দুর্গম প্রত্যাঞ্চলের মানুষদের।
থানচি সদর হয়ে দুর্গম বড় মদক পর্যন্ত নৌকা চালাচ্ছে কোসাই মারমা। তিনি বলেন, প্রতিদিন দুর্গম অঞ্চলের হাজারো মানুষ এই নদীর পথেই যাতায়াত করছে। কারণ এই নদীর আমাদের সড়ক পথ। নদীর পানি যখন শুকিয়ে যায় তখম আমাদের পরিবারে সমস্যা প্রভাব পড়ে। কেননা এই নদী পথে নৌকা চালিয়ে আমাদের সংসার চলে আর দুর্গম মানুষের যাতায়াতের একমাত্র রাস্তা হল সাঙ্গু নদীর পথ।
দুর্গম তিন্দু ও রেমাক্রী ইউনিয়নের জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার অধিক মানুষের বসবাস। নদীর পথে পাহাড়ে উপর কারো জুম চাষ, কারো কলা চাষ,আবার কারো ছোট্ট টং দোকান বসিয়ে ব্যবসা করছেন। কেননা এটি মানুষের পথ, প্রয়োজন, জীবনের সংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার প্রতিদিনের অবলম্বন। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেখানে পিচঢালা সড়ক মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, সেখানে থানচির বহু দুর্গম পাড়ায় এখনো নদীই একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। তাই এখানকার মানুষের কাছে নদী মানেই রাস্তা, নদী মানেই জীবন।
পদ্মমুখ এলাকায় টং ঘর বসিয়ে ব্যবসা করছেন ক্যম্রা থোয়াই। তিনি জানান, প্রয়োজন বা অপ্রয়োজনে এই নদীর পথে ছুটতে হয় শহরে কিংবা এক গ্রাম থেকে অন্যগ্রামে। আর নদীর পানি কমিয়ে গেলে চরে এসে সবাই টুকটাক ব্যবসা করেন। কেননা আমাদের দোকানের সব মালামাল নদী দিয়ে আসে। নদী বন্ধ মানেই ব্যবসা বন্ধ।
দুর্গম মানুষরা বলছেন, নদী থেমে গেলে যেন থেমে যায় পুরো জনপদ। কারণ খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ, নির্মাণসামগ্রী—সবকিছুই আসে নদীপথে। আবার কৃষকের উৎপাদিত ফসল কিংবা পাহাড়ের ফলও পৌঁছে যায় বাজারে এই পথ ধরেই। এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে থানচির মানুষের সংস্কৃতি ও জীবনযাপন। শিশুদের বেড়ে ওঠা, জেলেদের জীবিকা, কৃষকের বাজার, শিক্ষার্থীর স্বপ্ন—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাঙ্গুর জলধারা। নদী এখানে কেবল ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়; এটি মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও অস্তিত্বের অংশ।
থানচি নৌকা সমবায় ও গাইড সমিতি তথ্য মতে, থানচি সদর ঘাট হয়ে তিন্দু, রেমাক্রী, ছোট মদক, বড় মদক ও আন্ধারমানিক পর্যন্ত সাঙ্গুর বুকে চলাচল করছে ৩২০ টির নৌকা। এ পেশায় জড়িত রয়েছে প্রায় ৪০০ জন নৌকা চালক। আর পর্যটকদের গন্তব্যে নিয়ে আসা-যাওয়া নিবন্ধিত পর্যটক গাইড রয়েছে ১৫৮ জন ও আবেদনকারীসহ প্রায় ২০০ জন। গাইডরাও এই নদীর পথেই আয়ের প্রধান উৎস।
তবে নদীর এই নির্ভরতা সবসময় স্বস্তির নয়। বর্ষাকালে সাঙ্গু নদী রূপ বদলায়। প্রবল স্রোত, পাহাড়ি ঢল আর অনিশ্চিত আবহাওয়া তখন প্রতিটি যাত্রাকে করে তোলে ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও থেমে থাকে না জীবন। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষকে তখনও নৌকায় চড়তেই হয়। বছরের পর বছর নদীর স্রোত, গভীরতা আর বাঁক চিনে তারা নিরাপদে পৌঁছে দেন যাত্রী ও পণ্য। নদীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক জীবিকারও, জীবনেরও।
থানচি ট্যুরিস্ট গাইডে সভাপতি মামুনুর রশীদ বলেন, এই নদীর পথে হাজারো মানুষ জীবনযাপন করছে। ব্যবসা থেকে শুরু করে রোগী,শিক্ষার্থী সহ সবকিছু আনা-নেওয়া এই সাঙ্গুর নদীর পথ। পর্যটকদের আসলে এখানে মানুষের সংসারে চাঁকা ঘুরে আর না আসলে সমস্যা মুখোমুখি হতে হয়,নৌকা চালক,গাইড ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। তাই এই নদীর পথই আমাদের জীবন সংগ্রাম।
উন্নয়নের ছোঁয়ায় দেশের অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তন এলেও থানচির বহু মানুষ এখনো প্রতিদিন নদীর ওপর ভরসা করে পথ চলেন। সেই বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের আলো পৌঁছালেও প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এই গল্প এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সাঙ্গুর ঢেউ যেমন অবিরাম বয়ে চলে, তেমনি বয়ে চলে থানচির মানুষের জীবনও। তাদের প্রতিটি সকাল শুরু হয় নদী দিয়ে, দিনের প্রয়োজন মেটে নদী দিয়ে, আর সন্ধ্যা নামে নদীর বুকেই।
থানচি নৌকা সমবায় সমিতি সভাপতি মংপ্রু অং মারমা বলেন, আমাদের চলাচলের পথ একটা সাঙ্গু নদী। দুর্গম হওয়াতেই এখানে রাস্তা কিংবা যোগাযোগের কোন পথ নাই। তাই নদীর পথ ধরে হাজার মানুষের চলচল করছে। রেমাক্রী ও তিন্দু ইউনিয়নের মানুষ ব্যবসা থেকে শুরু সবকিছু সাঙ্গু নদী ভরসা। তাই চলাচলের সুবিধার্থে নদীর সংস্কার করা হলে তাহলে ভবিষ্যতে আরো চলাচল সহজ হবে।
জেলা পরিষদ সদস্য উবাথোয়াই মারমা বলেন, রেমাক্রী দুর্গম অঞ্চলের মানুষের একমাত্র ভরসা সাঙ্গু নদী পথ। ব্যবসা কিংবা মুহুর্ষ রোগী থেকে শুরু করে প্রতিদিন এই নদীর পথে হাজারো মানুষের আসা-যাওয়া করছে। তাই নদীর সংস্কার বিষয়ে জেলা পরিষদ আলাপ আলোচনা করে পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।
















