দ্বিতীয় দিনে সিএইচটি কমিশনের বাবুছড়া ও দুইটিলা পরিদর্শন: উপজেলা চেয়ারম্যানদের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও এসপি বাসায় ডিনার

Untitled-2

পার্বত্য নিউজ রিপোর্ট:

পাহাড়ে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে পার্বত্য চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় । পরিপূর্ণভাবে চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এসব ঘটনা ঘটতো না। তাই পাহাড়ের মানুষের শান্তি সম্প্রীতি উন্নয়নে পার্বত্য চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। বৃহস্পতিবার খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনকে কেন্দ্র করে বিজিবি-গ্রামবাসীর মধ্যে চলমান ভূমি বিরোধ সরেজমিন পরিদর্শনকালে এসব কথা বলেন, সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারপার্সন এডভোকেট সুলতানা কামাল।

বৃহস্পতিবার সুলতানা কামালের নেতৃত্বে ছয় সদস্যসের একটি প্রতিনিধি দল দীঘিনালার বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠি পাহাড়ীদের সাথে কথা বলেন। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের উপরোক্ত কথাগুলো বলেন সুলতানা কামাল।

উল্লেখ্য ১৪৪ ধারা জারী করলেও পুলিশ নিজেই পাহারা দিয়ে কমিটির সদস্যদের দিঘীনালা নিয়ে যায়। দিঘীনালায় কমিশন প্রথমেই স্থানীয় স্কুলে যান। সেখানে অবস্থানরত পাহাড়ী পরিবারের সাথে কথা বলেন।বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়া পরিবারের পক্ষে গোপা চাকমা, মৃনাল কান্তি চাকমা ও রিপন চাকমা সিএইচটি কমিশনকে অভিযোগ করে জানান, আমাদের বসতভিটায় বিজিবি’র সদর দপ্তর স্থাপন করায় আমরা আশ্রয়হীন হয়ে বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছি। আমরা বিজিবি সদর দপ্তর চাই না। আমরা বসতভিটায় ফিরে যেতে চাই। প্রথাগত অধিকার মূলে বসতভিটা ফেরৎ দেয়ার দাবী জানান তারা, এসময় সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারপার্সন এডভোকেট সুলতানা কামাল বক্তব্য শুনেন এবং বসতভিটা ফিরে পাওয়ার লক্ষ্যে সুদৃঢ় অবস্থান নেয়ার পরামর্শ দেন।  এ সময় কমিশনের এক সদস্য পাহাড়ীদের বলেন, ভয় পাবেন না। আমরা আপনাদের পাশে আছি। শক্ত হয়ে থাকতে হবে। স্থান ত্যাগ করবেন না।

এরপর কমিশন বাবুছড়া জোন সদর দফতর পরিদর্শন করেন। এসময় জোন উপ অধিনায়ক মেজর কামাল তাদের সকল পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলেন, সকল ঘটনার আদ্যপান্ত জানান। বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনে কোনো পরিবার উচ্ছেদ হয়নি দাবি করে উপ-অধিনায়ক বলেন, ‘যারা উচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবি করছেন, বাস্তবিক অর্থে তারা বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন প্রকল্প শুরু হওয়ায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় ৩/৪ মাস আগে বসতি স্থাপন করেছিলেন।’ মতবিনিময়কালে বিজিবি’র ৫১ ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর মোঃ কামাল উদ্দীন ও বাবুছড়া সাবজোন কমান্ডর মেজর মঈন সিএইচটি কমিশনকে জানান, বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য ২৯.৮১ একর ভূমি অধিগ্রহন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক সকল প্রকার সরকারী নিয়মনীতি অনুসরন করে বিজিবিকে অধিগ্রহনকৃত ভূমি হস্তান্তর করেন। হস্তান্তরিত ভূমিতে বিজিবি’র স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় গত ১০ জুন সকাল ১০ টায় ভূমি নিয়ে গ্রামবাসীদের সাথে যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে তা নিষ্পত্তি করার জন্য আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিদের সাথে মতবিনিময় সভা করি। মতবিনিময়ে আলোচনার মাধ্যমে এসমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে বানচাল করার জন্য একটি বিশেষ মহলের প্ররোচনায় বিকালে একদল মহিলা আমাদের হেলিপ্যাডে কলাগাছ লাগাতে থাকে। তাদেরকে বাধা দিলে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের মহিলা ও যুবকরা দল বেধে এসে বিজিবি সদর দপ্তরে হামলা চালায় এবং বেশ কিছু স্থাপনা ভাংচুর করে। হামলায় এক পুলিশ সদস্যসহ ৬ বিজিবি সদস্য আহত হয়। মেজর মঈন আরো জানান, এই বিজিবি সদর দপ্তরের আওতাধীন ৪৭ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা অরক্ষিত রয়েছে। অরক্ষিত এলাকায় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র সদস্যরা অভয়ারণ্য গড়ে তোলেছে। ওই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু প্রানহানির ঘটনাও ঘটেছে। তাই অরক্ষিত ওইসব এলাকা নিয়ন্ত্রনে আনার লক্ষ্যে সরকার বাবুছড়ায় বিজিবি’র ৫১ ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কাউকে উচ্ছেদ কিংবা কারো ভূমি বেদখল করে নয় সরকারী নিয়মনীতি অনুসর করেই বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের কার্যক্রম চলছে বলে জানান তিনি। 

এ সময় কমিশন সদস্য ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্লটটি তো ভালই সাজিয়েছেন কিন্তু বাস্তবে তা টিকবে না।  এছাড়াও কমিশনের আরো কেউ কেউ বিজিবিকে অবজ্ঞাসূচক কথা বলেন। সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারপার্সন এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, বিজিবি সদর দপ্তরে পাহাড়ী মহিলারা হামলা করতে পারে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তারপরও বিজিবি’র সদর দপ্তর স্থাপনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় গ্রামবাসীদের সাথে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেয়ার জন্য তিনি বিজিবি কর্মকর্তাদের পরামর্শ দেন।

এদিকে দিঘীনালা পরিদর্শন শেষে কমিশন সদস্যরা বাঘাইছড়ি উপজেলার দুইটিলা এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় সেখানে দায়িত্বপালনরত পুলিশ সদস্যরা সেখানে ১৪৪ ধারা জারী রয়েছে জানিয়ে কমিটির সাথে যাওয়া পাহাড়ীদের সেখানে প্রবেশ করতে দিতে অস্বীকৃতি জানান। এসময় কমিশন সদস্যরা ১৪৪ ধারা জারীর কারণ জানতে চাইলে পুলিশ সদস্যরা জানান, ফরেস্টের জমিতে অবৈধভাবে মন্দির নির্মাণ করতে গেলে তাদের বারণ করা হয়। তারা তা না শুনলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারী করে। জবাবে কমিশন মন্তব্য করে বন বিভাগের জায়গায় মসজিদ থাকতে পারলে মন্দির কেন থাকতে পারবে না। দুই টিলা পরিদর্শন শেষে  কমিশন স্থানীয় অগালচুক মন্দিরে গিয়ে লাঞ্চ সারেন। 

পরিদশর্দন করে স্থানীয়দের সাথে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের কাছে সুলতানা কামাল বলেন, সময়মতো পুরোপুরি শান্তি-চুক্তি বাস্তবায়ন করা হলে পরিস্থিতি এতো জটিল হতো না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বশেষ অবস্থা, শান্তিচুক্তির অগ্রগতি এবং বাবুছড়ার ঘটনা সম্পর্কে জানতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলটি গত বুধবার বিকেলে খাগড়াছড়িতে আসেন। আজ বৃহস্পতিবার সকালে দীঘিনালা ও বাবুছড়া এলাকা পরিদর্শন করেন।

কমিশনের কো-চেয়ারপারসন সুলতানা কামালের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে অন্যরা হলেন কমিটির সদস্য ও টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখায়রজ্জামান, খুশী কবীর, কমিশনের সদস্য ড. স্বপন আদনান, ও কমিশনের বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েটের সমন্বয়কারী হানা শামস আহমেদ প্রমুখ।

এদিকে বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে একই সময়ে ও একই স্থান বিবদমান দুটি পক্ষের মানববন্ধনসহ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষনার করায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় জারি করা ১৪৪ ধারা বলবৎ আছে। ১৪৪ ধারার কারণে উভয় পক্ষের সকল কর্মসুচী পন্ড হয়ে যায়। রাস্তায় পুলিশের টহলের পাশাপাশি বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে ১৪৪ ধারা জারী করলেও প্রশাসন নিজেই তা ভঙ্গ করে বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনকে প্রটোকল দিয়ে দিঘীনালা ও বাঘাইছড়িতে নিয়ে যায় ও ফিরিয়ে নিয়ে আসে। খাগড়াছড়িতে ফিরে টিম তাদের বুকিং দেয়া পর্যটনের মোটেলে না ফিরে শহরের মহাজন পাড়াস্থ টং রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে। বিকাল থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত কমিশন সদস্যরা এ্রই রেস্টুরেন্টে অবস্থান করেন। এসময় তারা জেলার ৪ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের সাথে দীর্ঘ সময় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে। উপজেলা চেয়ারম্যান হলেন খাগড়াছড়ি সদর, পানছড়ি, দিঘীনালা ও লক্ষ্ণীছড়ি।

গতকালও এই ৪ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের সাথে কমিশন একই স্থানে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তবে তাদের বৈঠকের বিষয়বস্তু জানা যায়নি। এদিকে টং রেস্টুরেন্টেই কমিশন সদস্যদের রাতে ডিনারের কর্মসূচী থাকলেও খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশ সুপার শেখ মিজানুর রহমান রাতে কমিশন সদস্যদের নিজ বাড়িতে ডিনারের আমন্ত্রণ জানালে কমিশন সদস্যরা এসপি’র বাড়িতে যান এবং সেখানে ডিনার করেন। 

এদিকে সিএইচটি কমিশনের মতো একটি বিতর্কিত ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত সংগঠনকে জেলা পুলিশ সুপার কী করে তার বাড়িতে ডিনারে আহ্বান করলেন তা নিয়ে শহরে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। 

 বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন প্রত্যাহার ও পাহাড়ীদের বসতভিটা ফিরিয়ে দেয়ার দাবীতে দীঘিনালা ভুমি রক্ষা কমিটি এবং বিজিবি সদর দপ্তরে হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ একই সময়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসুচির ঘোষনা দিয়েছে। 

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের নির্দেশে দীঘিনালা উপজেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা হতে রাত ১২টা পর্যন্ত দীঘিনালা উপজেলা পরিষদ হতে বাবুছড়া বাজার পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

 

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: অবরোধ, আন্তর্জাতিক সিএইচটি কমিশন, পার্বত্যনিউজ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − 7 =

আরও পড়ুন