সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ঢাবি মেধাবী শিক্ষার্থী রিফাত: মৃত্যু ঘটেছে স্বপ্নেরও

fec-image

স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা শেষ করে দেশের মানুষের সেবা করার। তার সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। এক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল তার স্বপ্ন। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তার সব স্বপ্ন কড়ে নিবে হয়তো তিনি কখনো ভাবেননি। স্বপ্ন পূরণের আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আমজাদ হোসেন রিফাত। থাকতেন শহিদুল্লাহ হলে। ছোটকাল থেকেই খুব মেধাবী ছিলো। প্রতিটি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার স্বাক্ষর রয়েছে।

স্বপ্ন ছিলো পড়ালেখা শেষ করে দরিদ্রতাকে জয় করবেন। মা, বাবা, ভাই-বোনদের ঢাকা নিয়ে গিয়ে এক সঙ্গে থাকার পরিকল্পনাও ছিলো তার। কিন্তু তার সেই স্বপ্নের মৃত্যু হলো কাভার্ডভ্যানের চাকায় পিষ্ট হয়ে।

নিহত রিফাতের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউপির আলিপুর পাহাড়ি এলাকায়। তাদের নেই কোনো নিজস্ব জমি। সরকারি জায়গায় একটি ঘর তৈরি করে বসবাস করছেন তারা। বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া রিফাতের বাবা বশিরের ছোট্ট একটি মুদির দোকান। মা-বাবা, দুই ভাই ও এক বোনের পরিবার। বাবা বশির আহমদ এক সময় কাঠ মিস্ত্রির কাজ করলেও বর্তমানে বাড়ির পাশে ছোট্ট একটি মুদির দোকান চালাচ্ছেন। তবে এই রোজগারে তাদের সংসার খেয়ে না খেয়ে চলে।

পরিবারের মূল চালিকা শক্তি রিফাতের মা রেহেনা বেগম। তিনিও খুব মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। অভাবের কারণে বেশি পড়ালেখা করার সুযোগ না হলেও এসএসসি পাশ করেছিলেন। তাই তার স্বপ্ন ছিলো ছেলেদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলবেন। এজন্য তিনি জীবনে কম পরিশ্রম করেনি। পরের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ পর্যন্ত করেছেন সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য।

গত রোববার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়ার জিদ্দাবাজার এলাকায় কাভার্ড ভ্যানের চাকায় পিষ্ট হয়ে তার সেই স্বপ্ন এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো। আদরের সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। মুখ থেকে কোনো কথাই বের হচ্ছেনা।

নিহত রিফাতের আত্মীয় ও দিগরপানখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মোস্তফা জামাল বলেন, বশির ও রেহেনার ঘরে আমজাদ হোসেন রিফাত, সাদিয়া সুলতানা রিয়া ও মেহেদি হাসান রিমন মিলে পাঁচজনের সংসার। খুব কষ্টের সংসার।

বশির এক সময় কাঠ মিস্ত্রির কাজ করলেও অসুস্থতার কারণে সে কাজও ছেড়ে দিয়েছেন। বাড়ির পাশে ছোট্ট একটি মুদির দোকান চালান। তবে ওই দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব। তারপরও সন্তানদের মায়ের খুব ইচ্ছে সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলবেন।

সব কিছু ঠিকঠাক মতই চলছিলো। বড় ছেলে আমজাদ হোসেন রিফাতকে হারবাং ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে এসএসসি পাশ করিয়েছেন। কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসিতেও গোল্ডেন এ প্লাস পান রিফাত। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হন। মেয়ে সাদিয়া সুলতানা রিয়া চলতি বছরের হারবাং ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেছেন। কলেজে ভর্তির অপেক্ষায় রয়েছে। আর সবার ছোট মেহেদি হাসান রিমন উত্তর হারবাং জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে।

মোস্তফা জামাল আরো জানান, রিফাত সংসারের অভাবের কথা চিন্তা করে মা-বাবা ও ভাই-বোনদের ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ছিলো। রিফাত ঢাকায় কয়েকটি টিউশনি করে সংসারের হাল ধরার ইচ্ছেও পোষণ করেছিলেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। ট্রাকের চাকার নিচেই স্বপ্ন ধুলিসাৎ হয়ে গেছে।

জানা গেছে, রিফাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগের প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ হয়েছিলো। সেজন্য পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে তাকে পুরস্কারও দেয়া হয়েছিলো। ওই পুরস্কার গ্রহণ করার সময় তার মা রেহেনা বেগমকে ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন রিফাত।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, রিফাতের বাড়ি একেবারে নিরব। কিছুক্ষণ পর পর কান্নার রোল শোনা যাচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে খাওয়া-দাওয়া ভুলেই গেছেন তারা। শুধু মা রেহেনা বেগম তার সন্তানকে ফিরিয়ে দেয়ার আকুতি জানাচ্ছেন। বাবা, ভাই-বোনদেরও একই অবস্থা। পাড়া- প্রতিবেশিদের শত শান্তনাতেও তাদের থামানো যাচ্ছে না। আদরের ছেলে হারানোর শোকে একটু পরপর বিলাপ করে কান্না করছেন মা-বাবাসহ সবাই।

রিফাতের বাবা কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, কি হয়ে গেলো বুঝতে পারছিনা। আল্লাহ আমাদের কোন পাপের শাস্তি দিলেন। আমাকে নিয়ে গিয়ে আমার সন্তান বেঁচে থাকলেও কোনো আপসোস থাকতো না। এই বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

আর মা রেহেনা বেগমের সঙ্গে তো কথাই বলা যাচ্ছে না। একটু পরপর শুধু বিলাপ ধরে কান্না করছেন। শুধু আল্লাহর কাছে তার প্রিয় সন্তানকে ফিরিয়ে দেয়ার আকুতি জানাচ্ছেন।

গত রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে রিফাত, তানজিলুর ও নিলয় তিনজন মিলে একটি মোটরসাইকেলে করে ঘুরতে যান লক্ষ্যার চর ইউপির শাপলা বিলে। সকাল থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তারা নৌকা নিয়ে শাপলা বিলে ঘুরেও বেড়ান।

মোটরসাইকেল নিয়ে ফেরার পথে চকরিয়ার জিদ্দাবাজার এলাকায় কাভার্ডভ্যানের চাকার নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলে মারা যান রিফাত ও নিলয়। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যায় তানজিলুর রহমান।

তানজিলুর রহমান ও তারেকুল রহমান নিলয় তারা পরস্পর আপন সহোদর। এক সঙ্গে দুই সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন আবদুল হাকিম দম্পতি।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সড়ক দুর্ঘটনা
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 5 =

আরও পড়ুন