অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়েই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় রোনালদোর


যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে স্পেন-পর্তুগাল ম্যাচের শেষ বাঁশি যেন শুধু একটি নকআউট লড়াইয়েরই সমাপ্তি টানেনি, শেষ করেছে বিশ্বকাপে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর এর দুই দশকের বর্ণাঢ্য অধ্যায়ও।
ফুটবলে বিদায় অনিবার্য। তবে কিছু বিদায় কেবল একজন খেলোয়াড়ের নয়, একটি যুগের সমাপ্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। ডালাসের রাতটি ছিল ঠিক তেমনই। স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে পর্তুগাল। সেই সঙ্গে শেষ হয়েছে বিশ্বকাপে রোনালদোর দীর্ঘ যাত্রা।
ম্যাচের আগে ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড নিজেই জানিয়েছিলেন, এটিই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। তাই স্পেনের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াই ছিল শুধুই একটি ম্যাচ নয়; ছিল তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়।
পুরো ম্যাচজুড়ে লড়াই করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি পর্তুগাল। যোগ করা সময়ে মাইকেল মেরিনির একমাত্র গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় স্পেন। আর চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় বিশ্বকাপে রোনালদোর পথচলা।
২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে সম্ভাবনাময় এক তরুণ হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। ২০২৬ সালে এসে বিদায় নিলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল কিংবদন্তি হিসেবে। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া এবং ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য কীর্তি গড়েছেন তিনি।
তবে বিশ্বকাপ ট্রফি অধরাই থেকে গেছে। ২০০৬ সালে সেমিফাইনালে ওঠাই ছিল তার সেরা সাফল্য। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬ কোনো আসরেই শিরোপার এতটা কাছে যেতে পারেননি বিশ্ব ফুটবলের এই তারকা।
স্পেনের বিপক্ষে বিদায়ী ম্যাচেও খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেননি রোনালদো। প্রথমার্ধে গোলরক্ষক উনাই সিমনকে পরীক্ষা নেওয়া একটি শট ছাড়া তেমন সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। বয়স হয়তো তার গতি কমিয়েছে, কিন্তু জয়ের আকাঙ্ক্ষা কমাতে পারেনি। শেষ বাঁশির পর তার নীরব অভিব্যক্তিই যেন বলে দিচ্ছিল, বিশ্বকাপের মঞ্চে এটাই শেষ উপস্থিতি।
তবে বিদায়ের মুহূর্তেও আক্ষেপকে প্রাধান্য দেননি তিনি। ম্যাচ শেষে রোনালদো বলেন, “আমি পরিষ্কার বিবেক নিয়েই বিদায় নিচ্ছি। দেশের জন্য যা করার, তার সবটাই করেছি।” পাশাপাশি তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৬ সালে পর্তুগালকে ইউরোপ শেরা করানোটাই তার কাছে বিশ্বকাপ জয়ের সমান গর্বের।
পরিসংখ্যানের পাতায় রোনালদো আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা, সর্বাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ফুটবলারদের একজন এবং ছয়টি বিশ্বকাপ ও ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন।
তবে সংখ্যার বাইরেও রোনালদোর উত্তরাধিকার আরও বড়। শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম, অদম্য মানসিকতা এবং কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠার গল্পই তাকে অনন্য করে তুলেছে। বিশ্বকাপ ট্রফি তার ক্যারিয়ারে যোগ হয়নি, কিন্তু তাতে তার কিংবদন্তি মর্যাদা এতটুকুও ম্লান হয়নি।
ফুটবল ইতিহাসে অনেক মহান খেলোয়াড়ই বিশ্বকাপ ট্রফি ছাড়াই ক্যারিয়ার শেষ করেছেন। তবু তাদের মহত্ত্ব কখনো শুধু শিরোপায় মাপা হয়নি। রোনালদোও সেই কাতারেরই একজন। কারণ কিছু কিংবদন্তির পরিচয় ট্রফিতে নয়, একটি প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখানোর ক্ষমতায়। সেই উত্তরাধিকারই তাকে অমর করে রাখবে ফুটবল ইতিহাসে।

















