চকরিয়ায় অধিক লাভের আশায় “কচু চাষে” ঝুঁকছে প্রান্তিক কৃষক


কক্সবাজারের চকরিয়ায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় চলতি মৌসুমে কন্দাল ফসল উন্নয়নে কচু চাষে সফলতার মুখ দেখেছে বহু প্রান্তিক কৃষক। অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি এবারে কন্দাল ফসল বৃদ্ধিতে অধিক লাভের আশায় ঝুঁকে পড়েছেন কৃষকরা। প্রতি বছরই বিভিন্ন এলাকায় বাড়ছে কন্দাল ফসল চাষের আওতায় কচু চাষের আবাদ। সাধারণ কৃষকরাও এই কচু চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। কোন ধরণের ঝুঁকি না থাকায় গরীবের সবজি হিসেবে পরিচিত মুখিকচু ও লতিরাজ আবাদ করে বাণিজ্যিক ভাবে অধিক লাভের মুখ দেখছেন।
কচু চাষ এখন শুধু নিজস্ব ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক কৃষির একটি স্থায়ী মডেলে। কৃষি বিভাগের সঠিক দিকনির্দেশনা মাধ্যমে এই খাত থেকে কৃষকরা নিয়মিত আয় করতে পারছেন, যা অর্থনৈতিকভাবে তাদের স্বাবলম্বী করে তুলছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানাগেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার ৩৩ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিক ভাবে কচু চাষ হচ্ছে। প্রতি হেক্টরে ১০ থেকে ১৫ টন লতি উৎপাদিত হচ্ছে, যার বাজারমূল্য টনপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত। মুখিকচু হিসেবে পরিচিত স্থানীয়ভাবে লতিরাজ জাতের কচু অনেকের কাছেই জনপ্রিয় সবজি হয়ে উঠেছে। এ অঞ্চলের কচু চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় স্থানীয় কৃষি বিভাগের প্রয়োজনীয় সার্বিক সহযোগিতা এবং উপযুক্ত ভূমি, অনুকূল আবহাওয়া থাকায় কচুর চাষাবাদ ভালো হয়েছে। ধান চাষের চেয়ে অন্তত পাঁচগুণ বেশি লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা কচু চাষের দিকে দিন দিন আগ্রহী হয়ে উঠছেন। কচু চাষে খুব অল্প পরিচর্যা করতে হয়। তাই এ চাষে ঝুঁকিও অনেক কম। এছাড়া ঝড়ে হেলে পড়া কিংবা বৃষ্টিতে ক্ষতির কোন ধরণের আশঙ্কাও নেই।
কৃষকেরা জানান, কচু গাছ বহুমুখি ব্যবহার হয়। প্রথমতো কচুর পাতা সবজি হিসেবে খাওয়া যায়, কচুর শক্ত শরীর ও কচুর লতি পুষ্টিকর তরকারি হিসেবে এবং কচুর গাছ থেকে মূল বা চারা হিসেবেও বিক্রি করা যায়। তাই একজন কৃষক ৪০ শতক জমিতে কচুর আবাদ করে প্রতি মৌসুমে অনায়াসে একলাখ টাকা থেকে দেড়লক্ষ টাকা লাভ করতে পারেন কোন ঝুঁকি ছাড়াই।
বর্তমানে স্থানীয় বাজারে কচু ও কচুর লতি ৪০-৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য সবজির চেয়ে কচুর স্বাদ ও পুষ্টিগুণ বেশি থাকায় এর চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। এতে কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না। গরু, ছাগল কচু খায় না এবং তা দেখাশোনার জন্য বাড়তি কোনো শ্রমিকেরও প্রয়োজন হয় না। কৃষক জমিতে মুখি কচু রোপণ করে ৪৫ দিনের মধ্যে বিক্রি করতে পারেন। প্রতিকানি জমি হতে ৮০ থেকে ৯০ মণ পর্যন্ত কচু উৎপাদন হয়।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার ফাঁসিয়াখালী, সাহারবিল, পূর্ব বড় ভেওলা, বিএমচর, কৈয়ারবিল, কাকারা, হারবাং, বরইতলী ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় ৩৩ হেক্টর বিস্তৃর্ণ দিগন্ত মাঠ জুড়ে দেখা গেল কচু চাষ। যতদুর চোখ যায় দেখা মেলে সবুজ কচু গাছের আবাদ।
ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের হাঁসেরদীঘির কৃষক মো. করিম জানান, আমার জীবনে এই প্রথম লতিরাজ কচুর আবাদ করেছি। তাই একটু শঙ্কায় ছিলাম। চলতি মৌসুমে ৪০শতক জমিতে কচুর আবাদ করেছি। বাজারে দাম কেমন পাব, ফলন কেমন হবে চিন্তায় ছিলাম। তবে এখন আমি খুবই খুশি। প্রতিদিন কচুর লতি তুলছি, স্থানীয় বাজারে ভালো দামে বিক্রি করতে পারছি। আর এই লতি কচু চাষের শুরু থেকে এ পর্যন্ত কৃষি অফিস আমাকে সর্বত্র সহযোগিতা করেছে।
চকরিয়া পৌরসভার সালাম মাস্টারপাড়া এলাকার কৃষক আহমদ নবী বলেন, চলতি মৌসুমে তিনি ৮০ শতক জমিতে লতিরাজ কচু চাষের আবাদ করেছেন। ঝামেলা কম ও কম খরচে কচুতে অনেক লাভ করেছি যা অন্য কোন ফসল থেকে সম্ভব নয়। তাই আগামীতে আমি কৃষি অফিসের পরামর্শে আরো জমিতে কচু চাষ করবো।
চকরিয়া পৌরশহরের বাজারের খুচরা সবজি ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, গত সপ্তাহে কচুর লতি ৫০ টাকা কেজি বিক্রি করলেও এ সপ্তাহে দাম কমে ৪০ টাকা কেজি বিক্রি করছি। আগামী সপ্তাহে দাম আবার উঠানামা হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। তবে যারা কচু চাষের আবাদ করেন তাদের কোন ধরণের ক্ষতি সম্মুখীন হওয়ার শঙ্কা থাকে না।
চকরিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আরিফুর ইসলাম বলেন, প্রান্তিক উদ্যমী কৃষকদের মাঝে কৃষি বিভাগ থেকে আমরা সবসময় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে থাকি। কচু চাষে ক্রমাগত চাহিদা বৃদ্ধি ও ভালো বাজার মূল্য পাওয়ায় উপেজলার বির্স্তীণ এলাকায় দিন দিন অন্যান্য ফসলের মতো এই ফসলের আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, লতি কচু চাষ লাভজনক ও তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ। কৃষকরা সঠিক পরামর্শ গ্রহণ ও তা প্রয়োগ করলে অল্প সময়ের মধ্যেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। কচু চাষের এই সাফল্য অন্যান্য চাষিদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহনাজ ফেরদৌসী বলেন, বর্তমানে উপজেলার প্রান্তিক কৃষকরা অধিক লাভজনক হওয়ায় কচু চাষের দিকে ঝুঁকছেন। কৃষি বিভাগ আগ্রহী কৃষকদের মাঝে উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন চারা সরবরাহ করাসহ সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে। কৃষকেরা এখন এই ফসলকে অর্থকরী সবজি হিসেবে বিবেচনা করছে। সঠিক পরিচর্যায় চার থেকে পাঁচ মাস পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।
















