পানছড়ির হামিদার ভ্যালেন্টাইনস ডে সারা বছর
শাহজাহান কবির সাজু, পানছড়ি:
১৪ ফেব্রুয়ারী’১৫ শনিবার ভ্যালেন্টাইস ডে। দেশের বড় বড় শহরগুলোর মত পার্বত্য জেলাগুলোতেও এ দিনে জমে উঠে নানান আয়োজন। তবে তা সীমাবন্ধ থাকে কিছু কিছু মানুষের মাঝে। এরই মাঝে কেউ ব্যস্ত ফুল কেনায়, কেউ গিফট সামগ্রী আর কেউবা ভালোবাসার বই ক্রয়ে। আর অনেকেরই অজানা রয়েছে ভ্যালেন্টাইস ডে তথা ভালোবাসা দিবস নামে যে একটি দিন রয়েছে। তারই একজন হামিদা খাতুন।
এই হামিদা পানছড়ি বাজারের পিঠা মেম্বার হিসাবে খ্যাত আবদুল আলীর স্ত্রী। পানছড়ি ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার পিছনে বাঁশঝাড় বেষ্টিত চেঙ্গী খালের পাড়েই তাদের জরাজীর্ণ ঘর। তাদের সন্তান শাহানা (১৯) আম্বিয়া (১৪) ও আবদুল হামিদ (১২) তিনজনই খর্বকায় প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী তিন ভাই-বোন এই প্রতিবেদককে দেখেই সালাম দিয়ে বলে স্যার আমরা টু ক্লাশে পড়ি। বাড়ির আঙিনায় দাড়িয়ে থাকা তাদের মা হামিদাকে ভালোবাসা দিবসের কথা জিজ্ঞাসা করা মাত্রই হামিদার সরাসরি উত্তর, “আমরা গরীব মানুষ ভালোবাসা-টালোবাসা ইতা বুঝিনা। পোলা আইতের বাপে পিডা বেইচ্ছা চাইল-ডাইল আইন্যা দে রাইন্দা খাওয়াই ইতাই আমরার ভালোবাসা”। এর মাঝে হামিদার এক কঠিন প্রশ্ন, “স্যার আরার ভালোবাসা কি একদিনের” ?
এই দিবস নিয়ে পানছড়ি বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সুলতান মাহমুদ জানান, “দিবসটি উপভোগ করি। তবে এবারের উপভোগে ভিন্নতা এসেছে”। তিনি জানান, বন্ধু-বান্ধবদের সময় দেয়ার পাশাপাশি সহধর্মিনী তাসলিমা ও একমাত্র কন্যা তানিসা’সহ অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা পানছড়ির রাবার ড্যাম এলাকায় উপভোগ করবেন। তিনি দুর-দুরান্তে থাকা বন্ধু-বান্ধবদের মিস করবেন বলেও জানান।
কিন্তু ভিন্ন সূর দিয়েছেন পানছড়ির বিএ পড়ুয়া ছাত্র ইসমাইল হোসেন রাজু। সে জানায়, ভালোবাসা দিবসে সহপাঠিদের নিয়ে তাদের ব্যাপক প্রস্তুতি। ইকবাল, নাঈম, আনোয়ার, সাহাদাত, জামশেদসহ অনেক বন্ধু-বান্ধবীরা মিলে পানছড়ির শান্তিপুর অরণ্য কুটিরে তারা আনন্দের পাশাপাশি বনভোজনেরও আয়োজন করেছে। দিবসটিকে প্রাণভরে উপভোগ করার কথাই জানালেন এই দলটি।
পানছড়ি টিএন্ডটি টিলার বাসিন্দা কলেজ শিক্ষক প্রিয়াশীষ চাকমার বিয়ের বয়স মাত্র দুই মাসেরও কিছু সময় বেশী। ভ্যালেন্টাইস ডে কিভাবে কাটাবে তা জানতে চাইলে প্রিয়াশীষ চাকমা মুচকি হেঁসে জানালেন, সহধর্মিনী পপি চাকমাকে নিয়ে শুক্রবার রাঙামাটি যাচ্ছেন শ্বশুরবাড়িতে। বনরূপা থেকে শালা-শালিদের নিয়ে প্রথমে রাঙামাটি বন বিহারে প্রার্থনা করবেন। তারপর পড়ন্ত বিকেলে রাঙামাটি পর্যটনে গিয়ে অনেক মজা করে উপভোগ করবেন ভালোবাসা নামক দিবসটিকে।
পানছড়ি একটি প্রত্যন্ত উপজেলা হলেও সৌখিনতার দিক দিয়ে এই উপজেলার রয়েছে যথেষ্ট খ্যাতি। ভালোবাসা দিবসে পানছড়ির পর্যটন হিসাবে খ্যাত শান্তিপুর রাবার ড্যাম, অরণ্য কুটির ও ঝর্ণাটিলা এলাকায় নামে মা-বাবা, ভাই-বোন, নব-দম্পত্তি ও প্রেমিক প্রেমিকা যুগলের ঢল। বুট-বাদাম, চানাচুর-মুড়ি, মারমা পিঠা, টক বরই ও তেতুলের আচারের ব্যাপক চাহিদা এদিনে। এসব সামগ্রী আদান-প্রদানের দৃশ্য ও উকি, ঝুকি এদিনটিকে করে তোলে প্রাণবন্ত। ড্যামের পানির কলকল ধ্বনিতে সন্ধ্যা যখন ঘনিয়ে আসে তখনি অনেকে চায় দিনটি আরো বড় হোক, অনেকে বলে, ইস শেষ হয়ে গেলো।
আসলে দিন আসে দিন যায় কিন্তু গৃহবধু হামিদা খাতুন দীর্ঘ ১৯ বছর বুকের ভালোবাসা দিয়ে আকড়ে ধরে আছেন তার তিন প্রতিবন্ধী সন্তানকে। তার ভালোবাসা যে সারাবছর জুড়ে, তা আসলে চিরন্তন। তার ভালবাসার কাছে অসাড় হয়ে যায় এই এক দিনের কর্পোরেট ভালবাসা ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র কনসেপ্ট।



















