পাহাড়ে ষড়যন্ত্রকারীদের কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া যাবে না


গত কয়েকদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িতে রীতিমত তাণ্ডব হয়ে গেছে। এক মারমা কিশোরীর ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ ওঠায়, তার বিচারের দাবিতে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতার’ ব্যানারে ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর নেতাকর্মী ও সমর্থকরা অবরোধ কর্মসূচির নামে ব্যাপক ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ করে। তাদের তাণ্ডব চলাকালে জেলার গুইমারাতে ৩ জন নিহত হওয়াসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। অপরদিকে অবরোধ কর্মসূচির নামে ইউপিডিএফের তাণ্ডব মোকাবিলা করতে গিয়ে একজন মেজরসহ সেনাবাহিনীর ১০ সদস্য এবং পুলিশের ৩ সদস্য আহত হয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে খবর আসে, খাগড়াছড়ি সদরে সিঙ্গিনালা এলাকায় এক মারমা কিশোরী (১২) সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে সদর থানায় যে এজাহার দায়ের করেন তা থেকে জানা যায়, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া তার মেয়ে বাড়ির কিছুটা দূরে প্রতিদিনের মতো সেদিন সন্ধ্যা ৬টায় প্রাইভেট পড়তে যায়। অন্যান্য দিনের মতো রাত ৯টার দিকে সে বাড়িতে ফিরে না আসায় তারা খোঁজ করতে থাকেন। প্রাইভেট শিক্ষকের বাড়িতে গিয়ে জানতে পারেন, মেয়েটি প্রতিদিনের মতোই ৯টার দিকে চলে গেছে। প্রতিবেশীদের নিয়ে ব্যাপক খোঁজাখুঁজির পর রাত ১১টার দিকে প্রাইভেট শিক্ষকের বাড়ি থেকে আনুমানিক দেড়শ’ গজ দূরে ধানক্ষেতে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান মেয়েকে। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে রাত ১২টা ১০ মিনিটে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা শেষে কিশোরীটি বাসায় ফিরে যায়।
প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর দাবি অনুযায়ী, ওই ঘটনায় সন্দেহভাজন অপরাধী হিসেবে শয়ন শীলকে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ২৪ সেপ্টেম্বর গেফতার করে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নেয়া হয়। শয়ন শীলকে গ্রেফতার করা সত্ত্বেও ইউপিডিএফের অঙ্গসংগঠন পিসিপির নেতা উখ্যানু মারমা ‘জুম্ম ছাত্র-জনতার’ ব্যানারে ২৪ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল এবং প্রতিবাদী মানববন্ধনের ডাক দেয়। ২৫ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফ’র আহ্বানে খাগড়াছড়িতে অর্ধবেলা হরতাল পালিত হয়।
একই সময় দেশে-বিদেশে অবস্থানরত কতিপয় চিহ্নিত ব্লগার এবং পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন কমিউনিটির কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ অনলাইনে বাঙালিদের উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন রকম অপপ্রচার ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়া শুরু করেন। ফলে ২৬ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

অবরোধ চলাকালে এক পর্যায়ে ইউপিডিএফের প্ররোচনায় উশৃঙ্খল এলাকাবাসী টহলরত সেনাদলের উপর ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে ৩ জন সেনা সদস্য আহত হয়। সার্বিক পরিস্থিতি এবং উসকানির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেনাবাহিনী অত্যন্ত ধৈর্য, সংযম ও মানবিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে এবং বল প্রয়োগ থেকে বিরত থাকে।

২৭ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফ এবং অঙ্গ সংগঠনের কর্মীরা আবারো দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টির চেষ্টা চালায় এবং বিভিন্ন স্থানে বাঙালিসহ সাধারণ মানুষের উপর গুলি, ভাঙচুর, অ্যাম্বুলেন্সে আক্রমণ এবং রাস্তা অবরোধসহ নাশকতা করে সমগ্র খাগড়াছড়ি পৌরসভা এলাকার আইনশৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটায়। ওই দিন দুপুর নাগাদ ঘটনাটি পাহাড়ি-বাঙালির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ নেয়। অবস্থা বিচারে জেলা প্রশাসন খাগড়াছড়ি সদর ও গুইমারা জেলায় ১৪৪ ধারা জারি করে। সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং অন্যান্য আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অক্লান্ত পরিশ্রমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
২৭ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি সদরের পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসার পর ইউপিডিএফ ও এর অঙ্গসংগঠনসমূহ ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে গুইমারা উপজেলার রামসু বাজার এলাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে। সাধারণ মানুষকে উস্কে দিয়ে অবরোধ করে গুইমারা-খাগড়াছড়ি রাস্তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইউপিডিএফ কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরাও যুক্ত হয়ে স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। রামসু বাজারের বিভিন্ন দোকাপাট ও সংলগ্ন বাড়ি-ঘরেও তারা অগ্নিসংযোগ করতে শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে তারা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র, ইট-পাটকেল, গুলতি ও লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে সেনাবাহিনীর উপর হামলা চালায়। এতে সেনাবাহিনীর ৩ জন অফিসারসহ ১০ জন সদস্য আহত হয়।
একই সময় তারা রামগড় এলাকায় বিজিবির গাড়ি ভাঙচুর করে এবং বিজিবি সদস্যদের আহত করে। সাড়ে ১১টার দিকে রামসু বাজারের পশ্চিম দিকে অবস্থিত উঁচু পাহাড় থেকে ইউপিডিএফ সশস্ত্র দলের সন্ত্রাসীরা অটোমেটিক অস্ত্র দিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত পাহাড়ি, বাঙালি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকা সেনাসদস্যদের লক্ষ্য করে ১০০-১৫০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। এতে ঘটনাস্থলে সংঘর্ষে লিপ্ত এলাকাবাসীর মধ্যে অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে হতাহতের শিকার হন। এমতাবস্থায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনীর টহল দল সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করে। এরপর থেকে সেনাবাহিনীর তৎপরতায় ধীরে ধীরে পরিস্থিতি শান্ত হতে থাকে এবং বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নিয়ন্ত্রণে আসে। ততক্ষণে ৩ জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হন।

কিন্তু যে ধর্ষণের অভিযোগে ইউপিডিএফ খাগড়াছড়িতে কয়েকদিন ধরে তাণ্ডব চালিয়েছে, সেই কিশোরীর শারীরিক পরীক্ষায় মেডিকেল বোর্ড ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে আটটার দিকে খাগড়াছড়ির সিভিল সার্জন ছাবের আহম্মেদের কাছে এ প্রতিবেদন জমা দেন মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা। ধর্ষণের আলামত পরীক্ষায় ৩ চিকিৎসক দলের নেতৃত্ব দেন খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ জয়া চাকমা। সাথে ছিলেন হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন ও নাহিদা আকতার।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সূত্রে জানা গেছে, সিভিল সার্জনের কাছে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে ধর্ষণের পরীক্ষার ১০টি সূচকের সব কটিতে স্বাভাবিক পাওয়া গেছে। এর অর্থ ধর্ষণের কোনো আলামত নেই। জেলা সিভিল সার্জন ছাবের আহম্মেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর এ ঘটনায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের দেওয়া প্রতিবেদনে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি।’ অপরদিকে সন্দেহভাজন আসামি শয়ন শীল ঘটনার সময় খাগড়াছড়ি সদরের বিভিন্ন দোকানে পূজার কেনাকাটা করেছেন বলে দাবি করেন। এই প্রেক্ষিতে বিভিন্ন দোকানের সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে তার কথার সত্যতা পেয়েছে পুলিশ।
এদিকে ১ অক্টোবর একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত সচিত্র প্রতিবেদন থেকে আরো কিছু তথ্য জানা যায়। ওই প্রতিবেদনে ভিক্টিম কিশোরী সাক্ষাৎকার দিয়ে জানায়, ঘটনার দিন প্রাইভেট পড়ে শিক্ষকের বাসা থেকে বের হয়ে কিছুদূর আসার পর পেছন থেকে কেউ একটি ইটের টুকরো ছুড়ে মারে তার দিকে। বিষয়টা দেখার জন্য পেছন দিকে তাকালে কয়েকজন তাকে ধরে কিছু একটা দিয়ে অজ্ঞান করে ফেলে। এরপর থেকে তার আর কিছু মনে নেই। কিশোরীর বাবা ধানক্ষেতের যেখান থেকে মেয়েকে উদ্ধার করেছিলেন, ভিডিওতে দেখা যায়, সেখানে একহাঁটুর বেশি উঁচু সবুজ ধানক্ষেতে কাদা-পানিতে কিছু ধান গাছ শুয়ে আছে। তবে সেখানে ধস্তাধস্তি হয়েছে এমন কোনো আলামত দেখা যায়নি, বরং একজন মানুষ পড়ে থাকার কারণেই যতটুকু জমির ধান কাদার সাথে মিশে থাকার কথা ঠিক ততটুকুই আছে। সড়ক থেকে ধানক্ষেতের ওই স্থানটিতে যেতে মাথা সমান উঁচু ঢোল কলমীর ঝোপঝার পার হয়ে বেশ কিছুটা যেতে হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো দুর্বৃত্ত বা দুর্বৃত্তরা যদি কিশোরীটিকে ধর্ষণ করার জন্যই সেখানে নিয়ে থাকবে, তাহলে সে বা তারা শুকনো ঢোল কলমীর উঁচু ঝোপঝার পার হয়ে ধানক্ষেতের কাদার মধ্যে কেন যাবে? আর কাদার মধ্যেও নিয়ে যদি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তাহলে সেখানকার অবস্থা যা হওয়ার কথা, সেটা সেখানে হলো না কেন? তাছাড়া, মেয়েটি কাউকে চিনতে পারেনি, এমনকি তারা বাঙালি না পাহাড়ি ছিলো সেটাও বলতে পারেনি। তার বাবা যে এজাহার দায়ের করেছেন সেখানেও অপরাধীরা বাঙালি বা পাহাড়ি সেটা উল্লেখ করতে পারেননি। এই অবস্থায় শয়ন শীল যে এই ঘটনার জন্য দায়ী সেটি ইউপিডিএফের সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীরা শনাক্ত করল কীভাবে? আবার উল্লেখিত সময়ে শয়ন শীল যে বিভিন্ন দোকানে পূজার কেনাকাটা করেছে সেই ফুটেজও আছে। বিষয়টি কোনোভাবেই কি স্বাভাবিক মনে হয়? মোটেই না। বরং এই ব্যাপারটি বুঝতে হলে আরো কিছু বিষয় খেয়াল করতে হবে।
গত বছর ঠিক একই সময় খাগড়াছড়িতে তাণ্ডব চালিয়েছিল ইউপিডিএফ। চোর সন্দেহে মামুন নামের একজন বাঙালি যুবককে পিটিয়ে হত্যার পর ফুঁসে উঠেছিল খাগড়াছড়ি। সেই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত খাগড়াছড়ি এবং রাঙামাটিতে ৬ জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়। দোকান-ঘর পুড়েছিল শতাধিক। ইউপিডিএফ এবং এর সহযোগী সংগঠনসমূহ সেই ঘটনার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এবার ১৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিল করে। মিছিল থেকে উত্তেজনাকর বিভিন্ন শ্লোগান দিয়ে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটাতে তারা ব্যর্থ হয়। ধারণা করা যায়, আন্দোলনে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে এমন একটি মানবিক ঘটনার প্রয়োজন ছিল, যা তারা ২৩ সেপ্টেম্বর ওই মারমা কিশোরীকে অজ্ঞান করে ধানক্ষেতে ফেলে রেখে বাঙালিদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের নাটক সাজানোর মাধ্যমে করতে পেরেছে।
সম্প্রতি এর আভাস পাওয়া যায় ইউপিডিএফের সংগঠক মাইকেল চাকমার এক মন্তব্য থেকেও। একটি বেসরকারি টিভির টকশোতে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনা তো একটি উপলক্ষ মাত্র।’ আসলেই ধর্ষণ একটি উপলক্ষ মাত্র, আন্দোলনের নামে তাদের মূল শ্লোগান হলো ‘পাহাড় থেকে সেনা হঠাও’, ‘বাঙালিদের সমতলে ফেরত নাও’। একই ধরনের কথা ২০২৪ সালের সহিংসতার পর শোনা গিয়েছিল ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমার মুখ থেকে। একটি বেসরকারি টিভিতে সে সময় সাক্ষাৎকার দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘নানা কৌশলের মাধ্যমে তারা আন্দোলনকে চাঙ্গা করেছিলেন’।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন হয়। সেই পতন প্রতিবেশী ভারত কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। যেমনটা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরেও তারা মেনে নিতে পারেনি। সেই সময়কার ইতিহাস জানা থাকার কারণে এবং পার্বত্য পরিস্থিতির একজন নিয়মিত পর্যবেক্ষক হিসেবে বুঝতে পারছিলাম, পাহাড়ে আবারো অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে যাচ্ছে। সেই ধারণা থেকেই ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারকে সতর্ক করতেই ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট দৈনিক ইনকিলাবে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। ‘ভারতের মদদে পাহাড়ে প্রতিবিপ্লবের আশঙ্কা’ শিরোনামের প্রবন্ধটিতে যেসব আশঙ্কার কথা লিখেছি, সেসব ঘটনা দৃশ্যমান হতে থাকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে। ১৯ তারিখে গিয়ে সেটা অনেকটা বিস্ফোরণের মতোই ঘটে।
খাগড়াছড়ির ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে রাঙামাটিতেও। গত বছর তারা প্রথমে চোর সন্দেহে মামুনকে এবং পরবর্তীতে ধর্ষণের অভিযোগে খাগড়াছড়ি পলিটেকনিকের এক শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছিল। এবার তারা একটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ তুলে একই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আর এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তারা ২৭ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি শহরের মহাজন পাড়ায় দিনের বেলায় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বাঙালিদের উপর হামলা করেছে। ২৮ তারিখ গুইমারাতেও দিনের আলোতে গুলি বর্ষণ করেছে। যার ফুটেজ এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু তাই নয়, গুইমারার রামসু বাজারে তারা যে বিভিন্ন দোকান ও ঘর-বাড়িতে আগুন দিচ্ছে তার ফুটেজও আছে। নিজেরা এসব ঘটনা ঘটিয়ে সেসবের দায় সেনাবাহিনী এবং বাঙালিদের উপর চাপিয়ে দিয়ে ইতোমধ্যে তারা জাতিসংঘে তাদের প্রতিবেদন পৌঁছে দিয়েছে। এটাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছে, যেসব প্রতিবেদনে দেখা গেছে জেএসএস এবং ইউপিডিএফ নেতারা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের উচ্চপদস্থদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে পার্বত্য পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছেন। কয়েকদিন আগে ত্রিপুরা রাজপরিবারের একজন সদস্যকে আমরা বলতে শুনলাম, তারা পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বৃহত্তর ‘টিপরা ল্যান্ড’ গঠন করতে চায়। এর আগে মিজেরামের মুখ্যমন্ত্রী পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং মায়ানমারের সংশ্লিষ্ট অঞ্চল নিয়ে বৃহত্তর ‘কুকি ল্যান্ড’ গঠনের কথা বলেছেন। সম্প্রতি মিজোরামে রাজ্যপাল হিসেবে একজন সাবেক সেনাপ্রধানকে নিয়োগ করেছে বিজেপি সরকার। তাছাড়া, মিজোরামে সংখ্যা বৃদ্ধি করে সেখানে বিএসএফের ফিল্ড কমান্ড সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আরেক প্রান্তে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য এখন বিদ্রোহী আরাকান আর্মির দখলে। তারাও বাংলাদেশের সঙ্গে নানাভাবে বৈরী আচরণ করছে। এসব ঘটনার মধ্যেই নিহিত আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা খাগড়াছড়ির সাম্প্রতিক উত্তপ্ত পরিস্থিতির পেছনের কারণ। সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে এই মুহূর্তে পার্বত্য চট্টগ্রামে আমাদের সার্বভৌমত্ব নানা চ্যালেঞ্জের মুখে আছে। সবকিছু বিবেচনা করলে খাগড়াছড়ির ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ভাবার সুযোগ নেই। তাই অতিদ্রুত পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা সংকট কাটাতে কঠোর এবং দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। পাহাড়ে ষড়যন্ত্রকারীদের কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া উচিত হবে না।
সাম্প্রতিক ঘটনার অনুপুঙ্খ তদন্ত করে দোষীদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হতাহত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত পুনর্বাসন করতে হবে। সেই সাথে বিভিন্ন জনগোষ্ঠির সামাজিক নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে আশ্বস্থ করে ষড়ন্ত্রকারীদের ব্যাপারে তাদেরকেও সোচ্চার করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প বৃদ্ধি করে সীমান্ত সিল করে দিতে হবে। দেশের অভ্যন্তরে থাকা সন্ত্রাসীদের নিরস্ত্র করার ব্যাপারে যা যা করা প্রয়োজন তার সবটুকুই করতে হবে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে ফর্মুলাতে পার্বত্য পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা করেছিলেন, সেই নীতিকে কার্যকর করতে হবে। অন্যথায় পাহাড়ের পরিস্থিতি ক্রমেই আরো নাজুক হতে থাকবে।
লেখক : সাংবাদিক ও পার্বত্য গবেষক, ইমেইল : [email protected]















