সেন্টমার্টিনে ট্রলারে হতাহতের ঘটনায় অভিভাবকদের কাছে লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু

teknaf pic 12-6-14(st) (3)

রামু প্রতিনিধি:

সেন্টমার্টিনে পাচারকারিদের হামলায় হতাহতের ঘটনায় অজ্ঞাত ৫০ জনসহ ৮৯ জনকে আসামী করে পৃথক ৩ টি মামলা দায়ের কেেরছ কোস্ট গার্ড। এদিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে হিমাগারে রাখা মৃতদেহগুলো শুক্রবার সকালে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

একই হাসপাতালে গুরুতর অবস্থায় ভর্তি করা হয়েছে ৩১ জনকে। তাদের মধ্যে থাইল্যান্ডের নাগরিক ও ট্রলারটির ২ ক্রু এবং ২৯ বাংলাদেশি রয়েছেন। বাংলাদেশিদের মধ্যে ২৭ জন গুলিবিদ্ধ। এদিকে উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার কক্সবাজার শহর থেকে ২ বাংলাদেশি দালালকে আটক করেছে পুলিশ। অন্যদিকে টেকনাফ থানায় আটক বাংলাদেশিদের ২৬২ জনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে অভিভাবকদের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশ।

এ ঘটনায় ট্রলারে থাইল্যন্ডের নাগরিক চেং ও জাহাজের ক্রু মং এবং দালাল মিয়ানমার নাগরিক আবদুল গফুর, একই ঘটনায় জড়িত নরসিংদীর শিবপুর থেকে কামাল সরকার , সাতকানিয়া থেকে কাঞ্চনাপাল পাড়ার মৃত ইন্দু ভূষণ পালের ছেলে প্রকাশ পাল (৪৮) ও মো. জাহাঙ্গীর আলম (২৭) আটক করা হয় । বর্তমানে ট্রলারটি কোস্ট গার্ড হেফাজতে রয়েছে। কোস্টগার্ডের টেকনাফ স্টেশনের কমান্ডার লে. কাজী হারুন অর রশীদ জানান, ট্রলার থেকে মালয়েশিয়াগামী ২৯৮ জনকে উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ৫ জন মৃত। রাতেই ৫ জনের মৃতদেহ, গুলিবিদ্ধ ২৭ জন, আটক ৩ বিদেশি নাগরিক এবং নানাভাবে আহত ও অসুস্থ ৩৩ জনকে টেকনাফ আনা হয়।

দ্বিতীয় দফায় ৩টি ট্রলারে করে ২৩০ বাংলাদেশিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় টেকনাফ আনা হয়। ট্রলারের ২৯৮ জন আরোহীর মধ্যে বেশির ভাগই টেকনাফ, মেহেরপুর, মাদারীপুর, সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর, ঝিনাইদহ, নাটোর ও রবিশালের বাসিন্দা রয়েছে। কোস্টগার্ডের দেয়া তথ্যমতে, নিহত ৫ জনের মধ্যে ৪ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তারা হলেন যশোরের মনিরামপুর উপজেলার এনায়েতপুরের হরিরামপুর এলাকার রশীদের পুত্র সেলিম, মোকামের পুত্র রুবেল, বগুড়ার কাহালুকা এলাকার সাইফুল ও সিরাজগঞ্জ জেলার মনির। টেকনাফে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে আটক ১ বিদেশি দালালকে। তিনি মিয়ানমারের নাগরিক। আটক অন্য ২ জন থাইল্যান্ডের নাগরিক। তারা চিকিৎসাধীন আছেন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে।

টেকনাফ থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ মোক্তার হোসেন জানান, ময়নাতদন্তশেষে হিমাগারে রাখা মৃতদেহগুলো অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় মানবপাচার, হত্যা ও অস্ত্র আইনে ৩ টি মামলা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি আরও জানান, আটক বাংলাদেশিদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করা হয়েছে। এখন তাদেরকে অভিভাবরকদের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মোজাহিদ জানান, টেকনাফ ডিগ্রি কলেজে আটক বাংলাদেশিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও খাবার প্রদান করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের কয়েকজন জানান, মালয়েশিয়ায় যাত্রী নিয়ে যাওয়ার জন্য মিয়ানমারের কাছে থাইল্যান্ডের একটি জাহাজ দাঁড়িয়ে ছিল। টানা ১৩ দিন দাঁড়িয়ে থাকার পর খাবার ও পানি নিয়ে তাদের সঙ্গে দালাল ও ক্রুদের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর দালালরা ফোনে বিষয়টি অন্য দালালদের জাহাজে খবর দেয়। খবর পেয়ে আরও ৩টি জাহাজ ঘটনাস্থলে এসে মালয়েশিয়াগামী ট্রলার যাত্রীদের লক্ষ্য করে গুলি করে এবং কুপিয়ে জখম করে। এতে ৫ জনকে হত্যা করে সাগরে ফেলে দেয়া হয়। অন্য ৫ জনকে ট্রলারে গুলি করে হত্যা করা হয়। যাত্রীরা সংঘবদ্ধ হয়ে ৩ ক্রুকে আটকে রাখে। হামলার পর-পরই ইঞ্জিন নষ্ট করে ট্রলারটি ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

উদ্ধার হওয়া যাত্রী কুমিল্লার চান্দিনার খুরশেদ আলম, টেকনাফের মৌলভীপাড়ার বশির আহাম্মদ ও কিশোরগঞ্জ জেলার সাহেবনগর এলাকার শাহাব উদ্দীন জানান, ভাগ্যের চাকা বদলাতে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে বড় ট্রলারে চড়ে তাদের অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। অর্ধাহার-অনাহার ও তৃষ্ণা মেটাতে না পেরেই বড় ট্রলারের ক্রুর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন তারা। এতে ক্রুরা এলোপাতাড়ি গুলি করলে অনেকে পানিতে পড়ে যান। আর ট্রলারে ৫ জনের মৃত্যু হয়। তবে প্রশাসনের চেষ্টায় প্রাণ নিয়ে বেঁচে আসতে পেরে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন তারা।

গুলিবিদ্ধ কিশোরগঞ্জের শাহাব উদ্দিন জানান, তার পরিবারের সদস্যসংখ্যা স্ত্রীসহ ৮। রিকশা চালিয়ে তিনি জীবন নির্বাহ করেন প্রায় ৯ বছর। একদিনের অন্ন জোগাতে তাকে ঘাম ঝরাতে হত প্রায় ১৬ ঘণ্টা। আয় হত ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এতে কোনোমতে চলত ৮ সদস্যের সংসার। স্থানীয় দালাল মোল্লার প্রলোভনে পড়ে কিছু টাকা দেন মালয়েশিয়া যেতে। বাকি দেড় লাখ টাকা মালয়েশিয়া পৌঁছানোর পর দেয়ার কথা ছিল। ১৭ দিন আগে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে অন্য সবার সঙ্গে তিনি ট্রলারে চড়েন। কিন্তু সাগরে ট্রলারে থাকাবস্থায় অন্ন-পানি কিছুই পাননি। এ নিয়ে দালাল ও ক্রুদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। পরে ক্রুদের করা গুলি লাগে তার পিঠে। এখন তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে।

সূত্র জানায় দীর্ঘ ২৫ কিলোমিটার সমুদ্র চ্যানেল অরক্ষিত হয়ে পড়ায় গত কয়েক বছর ধরে সৈকতকে মালয়েশিয়া মানব পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে পাচারকারীরা। যার কারণে টেকনাফ, উখিয়া, মহেশখালী ও কক্সবাজার সদরে মানব পাচার অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ছে। আদম পাচার কাজে সরাসরি রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। সংলিষ্ট প্রশাসন বহনকারিদের আটক করলেও ছদ্মনাম ব্যবহারকারি প্রকৃত দালালদের এখনো আটক করতে পারেননি।

এ প্রসঙ্গে লে.কর্ণেল কাজি হারুন অর রশীদ মালয়েশিয়া পাচারকাজে ব্যবহৃত ট্রলারগুলো দিনের বেলায় মিয়ানমার সীমান্তে থাকে এবং রাতে সুযোগ বুঝে মালয়েশিয়া পাঠিয়ে দেয় । যার জন্য তাদের সহজে আটক করা সম্ভব হয়না। এ বছর বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে কয়েকটি ট্রলারসহ ৫৭০ জন আটক করেছে বলে তিনি জানান। এদিকে সহকারি পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন মজুমদার জানান, মালয়েশিয়া পাচার প্রতিরোধে পুলিশের নজরধারি রয়েছে। টেকনাফে গত এক বছরে ৮৫৪ জন যাত্রী উদ্ধার. ১৬৪ জন দালাল ও ৪৪ টি মামলা দায়ের করেছেন বলে তিনি দাবি করেন। 

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন