মাধ্যমিকে স্থানীয় শিক্ষক নিয়োগ পরিকল্পনা প্রশংসনীয় হলেও আশঙ্কা ভয়াবহ


পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মাধ্যমিক শিক্ষক নিয়োগ স্থানীয়দের মধ্য থেকে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক একটি উদ্যোগ। স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দিলে শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবমুখী হয়, শিক্ষকরা স্থানীয় বাস্তবতা ভালো বোঝেন এবং শিক্ষার্থীরাও বেশি উপকৃত হয়। এই দিক থেকে সিদ্ধান্তটি প্রশংসনীয়। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া কার অধীনে পরিচালিত হবে?
যদি এই নিয়োগ আবারও পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে হস্তান্তর করা হয়, তাহলে বর্তমানে বিদ্যমান বৈষম্য আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, পার্বত্য জেলা পরিষদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট কোটা কাঠামো কার্যকর রয়েছে, যা এখনো বিভিন্ন নিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলায় নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ৬৭ শতাংশ এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য ৩৩ শতাংশ, বা কোথাও ৩০ শতাংশের মতো সীমাবদ্ধতা কার্যকর রয়েছে। এই কাঠামো এখনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে স্থানীয়দের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়ার নামে বাস্তবে আবারও একই বৈষম্য বহাল থাকার আশঙ্কা প্রখর।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি, পার্বত্য চট্টগ্রামে “স্থানীয়” বলতে শুধু একটি জনগোষ্ঠীকে বোঝানো যায় না। এই অঞ্চলে বহু বছর ধরে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীও স্থানীয়। তারা এই অঞ্চলের স্থায়ী নাগরিক, করদাতা এবং সমাজের অংশ। তাই স্থানীয়দের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া হলে তা অবশ্যই সব জনগোষ্ঠীর জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।
যদি নিয়োগ প্রক্রিয়া জেলা পরিষদের অধীনে থাকে, তাহলে অতীতের মতোই কোটা নির্ভর নিয়োগের কারণে আবারও বৈষম্যের অভিযোগ উঠতে পারে। এতে নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হবে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যও ক্ষতিকর হবে।
এই কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি জেলা প্রশাসন বা জেলা প্রশাসকের অধীনে পরিচালনা করা বেশি যৌক্তিক হতে পারে।
জেলা প্রশাসকের অধীনে নিয়োগ হলে, জেলা প্রশাসন যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করে, ফলে নিয়োগে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সহজ হবে। সব জনগোষ্ঠীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে উপজাতীয়, বাঙালি ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকবে। বর্তমানে বিদ্যমান কোটা ভিত্তিক বৈষম্যের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা যাবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা সহজ হবে, যা শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি সংবেদনশীল অঞ্চল। এখানে যেকোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া এমনভাবে পরিচালনা করা দরকার, যাতে কোনো জনগোষ্ঠী নিজেকে বঞ্চিত মনে না করে। স্থানীয়দের মধ্য থেকে মাধ্যমিক শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত ভালো, তবে সেটি যদি আবারও জেলা পরিষদের অধীনে দেওয়া হয়, তাহলে বিদ্যমান বৈষম্য আরও দৃঢ় হতে পারে।
তাই স্থানীয়দের অগ্রাধিকার বজায় রেখে, বৈষম্যহীন ও স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করতে মাধ্যমিক শিক্ষক নিয়োগ জেলা প্রশাসকের অধীনে পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি। এতে পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষা ব্যবস্থায় আস্থা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হবে।
















