পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন ও বাদপড়া ভোটারের অংকের খেলা

fec-image

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পেছনে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা নানা কারণ খুঁজে বার করছেন—দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক অনিয়ম, সংখ্যালঘু ভোটের বিভাজন। এই সব কারণের সম্মিলিত ফলেই হয়তো তৃণমূলের হার। তবে বিজেপির সাফল্যের পিছনে এসআইআর (SIR)-এরও বড় ভূমিকা রয়েছে। তথ্য খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যাচ্ছে, ভোটার সংশোধনের নামে আসলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া চলেছে, যা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পেরেছে।

সংখ্যাগুলোই অনেক কথা বলে। এবারের নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছে প্রায় ২ কোটি ১২ লক্ষ ভোট, আর তৃণমূল প্রায় ২ কোটি ৬০ লক্ষ। ব্যবধান মোটামুটি ৩২ লক্ষ ভোট, আর সেই ব্যবধানেই নির্ধারিত হয়েছে ১২৭টি আসনের ভাগ্য। কিন্তু আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা ‘পরিষ্কার’ করার নামে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে মৃত হিসেবে চিহ্নিতদের বাদ দিলেও প্রায় ৬৬ লক্ষ নাম উধাও। সংখ্যাগুলো কি নিছক কাকতালীয়?

সব মিলিয়ে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটার—বিভিন্ন জটিল ধাপ পেরিয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। এই সংখ্যা প্রায় অস্ট্রিয়ার জনসংখ্যার সমান। যত সহজে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরা যায়, বাস্তবে তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে ‘এসআইআর’ নামক এক হেনস্থার প্রক্রিয়া।

আসনভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়। ২৯৩টি আসনের মধ্যে ১৬১টিতে, অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি আসনে—যত ভোটার বাদ পড়েছে, তার সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি। মৃত ভোটারদের হিসেব বাদ দিয়েও এই চিত্র ১২০টি আসনে একই রকম থেকে যায়। আরও আশ্চর্যের বিষয়, শেষ মুহূর্তে বাদ পড়া ভোটারদের নিয়ে আপত্তি, শুনানি ও আংশিক পুনর্বহালের পরেও প্রায় ৫০টি আসনে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের মার্জিন ছাড়িয়ে গেছে।

বিজেপি জিতেছে ২০৭টি আসন। তার মধ্যে অন্তত ১০৫টিতে ভোটার বাদ দেওয়ার প্রভাব ফলাফল ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ছিল। তৃণমূল জিতেছে ৮০টি আসন, সেখানে এই সংখ্যা মাত্র ৫৩। মুর্শিদাবাদ, মালদা ও উত্তর দিনাজপুরের মতো মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান এতটাই বড় ছিল যে ভোটার বাদ পড়লেও তাতে খুব একটা প্রভাব পড়েনি। সমস্যা হয়েছে সেইসব আসনে, যেখানে লড়াই ছিল হাড্ডাহাড্ডি।

এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে। প্রথম ধাপে বুথকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাই করেন—কে মারা গেছেন, কে এলাকা ছেড়েছেন, কার নাম একাধিকবার রয়েছে। এই পর্যায়ে প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যায়। কিন্তু তারপরই শুরু হয় আরও জটিল খেলা।

এরপর নির্বাচন কমিশন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করে তথ্য যাচাই ও ভোটার নির্বাচন শুরু করে। এই পদ্ধতি আগে কোথাও প্রয়োগ করা হয়নি। আজ পর্যন্ত যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যান্সি’ তালিকা তৈরি করা হয়েছে, সেই সম্পর্কে জনপরিসরে কোনও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না।

নতুন এক শ্রেণিবিভাগ আনা হয়— ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যান্সি’। এআই-নির্ভর সফটওয়্যার ব্যবহার করে নামের বানানে সামান্য অমিল, বাবা-ছেলের বয়সের ফারাক, ঠিকানার সূক্ষ্ম পার্থক্যের মতো কারণ দেখিয়ে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে সন্দেহের তালিকায় ফেলা হয়। পরে আদালত-নিযুক্ত পর্যবেক্ষকের সামনে শুনানি হলেও অল্প কয়েকজনের নাম ফিরেছে—বেশিভাগই বাদই থেকে গেছেন।

এই গোটা প্রক্রিয়ায় একটি স্পষ্ট প্যাটার্নও দেখা যায়। বিজেপি যেসব আসনে জিতেছে, সেখানে সাধারণভাবে সংখ্যালঘু ভোটারের হার ছিল তুলনামূলক কম—প্রায় ১৫ শতাংশের আশেপাশে। কিন্তু যেসব আসনে ভোটার বাদ পড়া ফলাফলে বড় ভূমিকা নিয়েছে, সেখানে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা বেড়ে ১৮ থেকে ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

তৃণমূলের ক্ষেত্রেও ছবিটা আলাদা নয়। যেসব আসনে তারা জিতেছে, সেখানে সংখ্যালঘু ভোটারের হার অনেক সময় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে বিপুল ব্যবধানে জয়ের কারণে ভোটার বাদ পড়লেও ফল খুব একটা বদলাত না।

কিন্তু বিপদ তৈরি হয়েছে সেই মধ্যবর্তী এলাকাগুলোতে, যেখানে সংখ্যালঘু ভোটার ২০ থেকে ৪০ শতাংশ, আর জয়-পরাজয়ের ব্যবধান মাত্র কয়েক হাজার ভোট। সেখানে কয়েক হাজার ভোটার বাদ পড়া মানেই সমীকরণ বদলে যাওয়া।

নন্দীগ্রামের উদাহরণ ধরা যাক। সেখানে মুসলিম ভোটার প্রায় ২৫ শতাংশ, কিন্তু যাদের নাম বাদ পড়েছে তাদের মধ্যে সংখ্যালঘুর হার ছিল প্রায় ৯৯ শতাংশ।

কমিশন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করে তথ্য যাচাই ও ভোটার নির্বাচন শুরু করে। এই পদ্ধতি আগে কোথাও প্রয়োগ করা হয়নি। আজ পর্যন্ত যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যান্সি’ তালিকা তৈরি করা হয়েছে, সেই সম্পর্কে জনপরিসরে কোনও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না।

ভবানীপুরেও একই প্রবণতা—সংখ্যালঘু ভোটার প্রায় ২০ শতাংশ, অথচ বাদ পড়াদের মধ্যে তাদের হার ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। এই ধরনের আসনগুলোতেই তৃণমূল কার্যত জয়ের সম্ভাবনা হারিয়েছে।

সব মিলিয়ে আধুনিক নির্বাচনের চরিত্র যেন বদলে যাচ্ছে। এখন আর শুধু প্রচার, জনসভা বা ভোটের দিন নয়, আসল লড়াই শুরু হয়ে যাচ্ছে অনেক আগে, ভোটার তালিকার সংশোধন, ডেটা যাচাই, অ্যালগরিদমিক বাছাই এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। ফলে প্রশ্নটা আরও জোরালো হয়ে উঠছে—এটা কি সত্যিই গণতান্ত্রিক নির্বাচন, নাকি নিছক সংখ্যার অঙ্ক কষে ফল নির্ধারণের খেলা?

লেখকদ্বয়: গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: অংকের খেলা, অশীষ চক্রবর্তী, নির্বাচন
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন