বিরোধী দল থেকে ক্ষমতাসীন দলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি : একটি প্রত্যাশা

fec-image

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৭ সালের দোসরা ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির যৌক্তিক সমালোচনা করেছিলেন। এই সমালোচনা পার্বত্য অঞ্চলের ৫২ ভাগ বাঙালি জনগোষ্ঠীর আশার প্রদীপ হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বেগম জিয়ার লিগ্যাসি ধারণ করে পার্বত্য চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করার মাধ্যমে সেই প্রত্যাশাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেন। কেন পার্বত্য চুক্তির সংস্কার প্রয়োজন এ সম্পর্কে তৎকালীন বিরোধী দল তথা সাত দলীয় ঐক্যজোট কিছু যৌক্তিক কারণ দাঁড় করিয়েছিল। এ সম্পর্কে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা ও সমাধান’ গ্রন্থের প্রণেতা জিবলু রহমান এবং ‘বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি’ গ্রন্থের লেখক মাহফুজ পারভেজ বিস্তারিত জানা যায়। বক্ষ্যমান মতামতে উক্ত দুটি গ্রন্থ থেকে মৌলিক তথ্য ‍ও উপাত্ত গ্রহণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মাহফুজ পারভেজের গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রথম ১৯৯১ সালে পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনী মোতায়েন রেখেই পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিল। তবে তা ছিল বেজায় কণ্টকাকীর্ণ। বেগম খালেদা জিয়ার সরকার জনসংহতি সমিতির নেতা হংসধ্বজ চাকমার নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের সাথে একটি লিঁয়াজু কমিটি করে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা শুরু করেন। সে আমলেই জনসংহতি সমিতি প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের দাবি থেকে সরে এসে আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবি করা শুরু করে।

রাজনৈতিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের পথ বেগম জিয়ার আমলেই সুস্পষ্ট হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার গঠনের ৬ মাসের মধ্যেই জাতীয় সংসদের চিফ উইপ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহকে প্রধান করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ সালে জনসংহতি সমিতির সাথে বৈঠক করে ঐকমত্যে পৌছায়। পরিশেষে দোসরা ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির ৭২টি ধারা ও উপধারার অধিকাংশই তৎকালীন বিরোধীদল সাত দলীয় ঐক্যজোট, প্রধানত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মেনে নিতে পারেনি। পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন ও বাঙালি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অপসারনের কোন ইঙ্গিত চুক্তিতে না থাকায় এর বিরোধীতা করে জনসংহতি সমিতির একটি অংশ ২৬ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিল আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউপিডিএফ। তাছাড়া, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বলেছিলেন এ চুক্তি সংবিধান পরিপন্থী।

বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জোড়ালো ভাষায় জানায় ক্ষমতায় আসলে এ চুক্তি বাতিল করা হবে। চুক্তি সম্পর্কে খাগড়াছড়ির স্থানীয় সরকার পরিষদের সাবেক সদস্য নক্ষত্র ত্রিপুরা বলেন, “সম্পাদিত শান্তিচুক্তিতে ৬ লাখ বাঙালি ও ২ লাখ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতিকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র চাকমা সম্প্রদায়ের সাথে এ চুক্তি করা হয়েছে।” যাহোক, চুক্তি সাক্ষরের পরদিন থেকেই কঠোর আন্দোলন শুরু হয়। পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের পরদিন ৩ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বেগম খালেদা জিয়া ১৮টি অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করেন।

গবেষক মাহফুজ পারভেজ আজকের কাগজ ১৯৯৭ সালে ৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন এর বরাত দিয়ে বিএনপির অভিযোগগুলো উল্লেখ করেছেন। বিএনপির অভিযোগগুলোর সার হল, প্রথমত, এ চুক্তির মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ থেকে এককেন্দ্রিকতা প্রত্যাহার করে সরকার স্বাধীনতার সংকট সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয়ত, চুক্তির ফলে বাংলাদেশে বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বিষবৃক্ষ রোপিত হয়েছে। তৃতীয়ত, জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। চতুর্থত, চুক্তির ‘গ’ অধ্যায়ের ১ নং পঙ্কক্তিতে যে আঞ্চলিক পরিষদের বিধান রাখা হয়েছে তা সংবিধানের ১ নং ধারার পরিপন্থি। পঞ্চমত, বাংলাদেশ সংবিধানে অঞ্চলভিত্তিক মন্ত্রী নিয়োগের কোন বিধান না থাকলেও বিশেষ মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয় সৃষ্টি সরকারের বিপরীতে একটি সমান্তরাল সরকার গঠনের শামিল বিধায় এ চুক্তি অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য। ষষ্ঠত, বৈষম্য নিরসনে অনগ্রসর শ্রেণিকে বিশেষ সুবিধা দিতে গিয়ে সরকার পাল্টা যে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে তা সংবিধানের ২৯ নং ধারার পরিপন্থি। সপ্তম, চুক্তির ‘গ’ খণ্ডের ১৩ ধারার মাধ্যমে জাতীয় সংসদ কর্তৃক আইন প্রণয়নের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে। অষ্টম, চুক্তির ‘গ’ ধারার ২৬ নং পঙ্কক্তি সংবিধানে প্রদত্ত নাগরিকদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে।

নবম, সংবিধানের ৪২(১) ধারার অধীনে প্রত্যেক নাগরিকদের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর বা বিলিব্যবস্থার যে  মৌলিক অধিকার রয়েছে তা চুক্তির ২৬ নং পঙ্কক্তির মাধ্যমে মৌলিক অধিকার বিনষ্ট করেছে সরকার। দশম, ভূমির সাথে সম্পর্কিত সকল ক্ষমতা আঞ্চলিক পরিষদের নিকট সমর্পন করে সরকারের ক্ষমতা ম্লান করে দিয়েছে। এগার, শান্তিশৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ, সরকারি ও আধাসরকারি, জেলা প্রশাসকের পদ বিলুপ্তি ও কমিশনারের দায়িত্ব সীমিতকরণের মাধ্যমে দুটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার সৃষ্টি করে সরকারি প্রশাসনের ক্ষমতা খর্ব করেছে সরকার। বার, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাংলাভাষাভাষী নাগরিকদের দ্বীতিয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করেছে। তের, পার্বত্য অঞ্চলে প্রধানমন্ত্রী ও সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা সীমিতকরণের মাধ্যমে দেশের সম্মান ও মর্যাদার হানি করেছে। চৌদ্দ, সামারিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর চলাফেরা সীমিতকরণের মাধ্যমে তাদের মর্যাদা ও দায়িত্ব পালনের অধিকার ক্ষুন্ন করা হয়েছে। পনের, প্রটেক্টেড বনাঞ্চলের উপর সরকারের অধিকার থাকা সত্বেও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ত্যাগ ও  নতুন জমি অধিগ্রহণের ক্ষমতাও প্রত্যাহার করা হয়েছে এ চুক্তিতে।

ষোল, একদিকে সরকার সহিংসতাবাদীদের পুরস্কৃত করেছে অন্যদিকে বাঙালি জনগোষ্ঠীর যাদের স্বজন নিহত হয়েছে তথাপি তাদের নামে যে হয়রানীমূলক মামলা দেওয়া হয়েছে সরকার তা প্রত্যাহার করেনি। সতের, পরিষদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া জমি, পাহাড়, বনাঞ্চল অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর নিষিদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে সরকার নিজস্ব ক্ষমতা আঞ্চলিক পরিষদের কাছে সমর্পণ করেছে। আঠার, সরকারের নানা ধরণের রাষ্ট্রীয় আয়ের ক্ষমতা, শিল্প স্থাপনের অনুমতি এবং খনিজ সম্পদ উত্তোলন নিয়ে সরকারের ক্ষমতা ও রাজকোষের অর্থ উপার্জন সংকুচিত করা হয়েছে। এই চুক্তি বাতিলের জন্য তৎকালীন বিরোধী দল আন্দোলন শুরু করে। ১০ ডিসেম্বর হরতাল, অনশন এবং লং মার্চ কর্মসূচি পালন করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাংগা উপজেলায় বিক্ষুব্ধ জনতার উপর সরকরের নির্দেশে বৃষ্টির মত গুলি ছোড়া হয়। সে গুলিতে শহীদ হয় জাকির হোসেন ও গোলাম রসূলের মত দুইজন বাঙালি। শত শত মানুষ আহত হয়। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল ও এর ছাত্র সংগঠন এবং পাহাড়ি ছাত্রপরিষদের নেতৃবন্দ জেলা প্রশাসক ও পুলিশের সহযোগিতায় আন্দোলনরত বাঙালিদের উপর নির্মম নির্যাতন করে।

৩০ মার্চ  ১৯৯৮ সালে পার্বত্য চুক্তির আওতায় আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়। জিবলু রহমানের গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ৩ মে ১৯৯৮ সালে সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আঞ্চলিক পরিষদের বিলকে সংবিধান বিরোধী ও দেশের অখণ্ডতা বিরোধী বলে পার্লামেন্ট থেকে ওয়াক আউট করেন। একই দিনে রাঙামাটি জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ (সংশোধিত) বিল পাশ হয়। ৫ মে তারিখে বেগম জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে বক্তব্যের শেষাংশে বলেন, “আজ দেশের ভূখণ্ডের ১০ ভাগের এক ভাগ আমাদের রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, একটি গভীর ষড়যন্ত্রমূলক নীলনকশা বাস্তবায়নের জন্য।” দেশবাসীর নিকট তিনি এ ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্য আবেদন জানান। জিবলু রহমান এ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘‘৮০ বছরের বৃদ্ধ থেকে ১০ বছরের নাবালক পর্যন্ত গ্রেফতার করে জেলখানায় বন্দি করা হয় ‘’।

এ চুক্তি বাতিলের সর্বশেষ চেষ্টা হিসাবে বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঢাকার পল্টন ময়দান থেকে ১৯৯৮ সালের ৯ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে লংমার্চের যাত্রা শুরু করে। ১১ জুন খাগড়াছড়ি শহরে ১০ কিলোমিটারের বেশি মানুষের তিল ধারণের ঠাই ছিল না। সে মহাসমাবেশে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি আসনের বর্তমান সাংসদ ওয়াদুদ ভুঁইয়া। তাছাড়া, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারী জেনারেল কামারুজ্জামান ও মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদি এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া মহাসমাবেশের বক্তব্যে, পার্বত্য চুক্তিকে ‘কালো চুক্তি’ হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। এভাবেই বেগম খালেদা জিয়া পার্বত্য চুক্তিকে নিয়ে ভাবতেন। তার হাতে গড়া এই দলটি বর্তমান রাষ্ট্রক্ষমতায়। ক্ষমতায় আসার প্রাক্কালে ৬ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনী ইশতেহারে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, সকল জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে পার্বত্য চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বঞ্চিত বাঙালি সম্প্রদায় সেই প্রত্যাশায় প্রতীক্ষমান। পার্বত্য চুক্তির সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করা এই দলটি চুক্তির সংস্কার সাধন করে পাহাড়ের সকল জনগোষ্ঠীর শান্তি ফিরিয়ে আনবেন বলে বিশ্বাস করা যায়।

লেখক: এমফিল গবেষক (পার্বত্য চট্টগ্রাম) ইতিহাস বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।  
Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: পার্বত্য চট্টগ্রাম, শান্তিচুক্তি
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন