মাইকেল চাকমাঃ স্বেচ্ছায় নির্বাসিত নাকি অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দলের বলি

fec-image

গত ১৮ মার্চ রাংগামাটির বাঘাইছড়িতে উপজেলা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সরকারী ব্যক্তিবর্গের উপর নৃশংস হামলায় ৮ খুনের পর হামলার সাথে জড়িত পাহাড়ি নেতারা এলাকা ত্যাগ করে আত্নগোপনে চলে যায়। মাইকেল চাকমাও আত্নগোপন করে ঢাকায় পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে, ৯ এপ্রিল মাইকেল চাকমা নিখোঁজ হবার নাটক সাজায় তারা।

গত ২৬ মে ২০১৯ তারিখে দেশের প্রথম সারির ইংরেজি পত্রিকা The Daily Star এর প্রথম পৃষ্ঠায় “Bring them back before Eid” শিরোনামে একটা সংবাদ ছাপানো হয়েছে। সেই সংবাদের সাথে বিশাল আকৃতির একটা ছবি দেয়া হয়েছে।

ছবির নীচে ক্যাপশন দেয়া হয়েছে- “Hridi, holding the photo of her father Parvez, cries as she asks at a human chain in front of the Jatiya Press Club for her father to be returned before Eid. Mayer Daak organised the the programme with family members of enforced disappearance victims demanding they be returned home safe.”

খুবই হৃদয় বিদারক এক সংবাদ। ছবিতে হৃদি নামের ছোট্ট মেয়েটি ক্রন্দনরত অবস্থায় তার বাবার ছবি ধরে রেখেছে। ছবিটা দেখে আমার মনটা সিক্ত হয়ে গেল। সেই সাথে ছবির মধ্যে আরেকটি পোস্টার দেখে চোখ আটকে গেল সেখানে। তাতে লেখা “মাইকেল চাকমা কোথায়?”

ছবিটি তুলেছেন Amran Hossain নামে এক ভদ্র লোক। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সাথে বলতে হচ্ছে যে, চিত্রগ্রাহক Amran Hossain সাহেব অত্যন্ত কাঁচা হাতে ছবিটি তুলেছেন। অথবা তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে অতি চতুরতার সাথে ছবিটি তুলেছেন। কারণ, হৃদি নামে যে মেয়েটি তার বাবার ছবি ধরে আছে এবং যেটা মূল সংবাদের ক্যাপশন সেই হৃদির বাবার ছবিটাই অর্ধেকের বেশী নেই। অথচ ছবিতে ফোকাস করা হয়েছে “মাইকেল চাকমা কোথায়?” লেখা একটা পোস্টার যেটা ধরে আছে একজন উপজাতি মেয়ে।

যাই হোক, মাইকেল চাকমা নামটার সাথে আমি পরিচিত ছিলাম না। তাই তার সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া শুরু করলাম। যা জানলাম তাতে দেখলাম যে, গত ৯ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে ঢাকা থেকে মাইকেল চাকমা নিখোঁজ হয়েছেন। কিন্তু কে এই মাইকেল চাকমা? যাকে নিয়ে The Daily Star পত্রিকা এতটা সমব্যথী?

মাইকেল চাকমা হলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ( ইউপিডিএফ) প্রসীত গ্রুপের একজন সংগঠক এবং শ্রমজীবী ফ্রন্টের (ইউডব্লিউডিএফ) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। এই ইউপিডিএফ হলো সেই দল যারা ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি হবার পর তা না মেনে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা স্বাধীন দেশ “ জুম্মল্যান্ড” গঠনের জন্য পাঁয়তারা করছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে নস্যাৎ করার জন্য যারা প্রকাশ্যে প্রচার প্রচারণা ও অস্ত্রের মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে। সেই দলের একজন নেতার জন্য The Daily Star পত্রিকার মায়াকান্না দেখে আমি যারপরনায় অবাক হয়েছি।

এই মাইকেল চাকমা একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসী। গত ৩ মে ২০১৮ সালে রাঙামাটির নানিয়ারচরের উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট শক্তিমান চাকমা এবং তার পরদিন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমাসহ ৬ খুনের মামলার অন্যতম প্রধান আসামী এই মাইকেল চাকমা। এছাড়াও ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর ঐতিহাসিক খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশে যোগদান করতে আসার পথে আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীদের গাড়ি বহরে হামলা ও বাঁধা দানের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।

ইউপিডিএফ এর নেতা প্রসীত বিকাশ খীসা নিজেই অন্তর্ধান অবস্থায় আছে। লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে প্রসীত খীসা তার দল পরিচালনা করছে। যেই দলের প্রধান নেতা নিজেই পলাতক অবস্থায় আছে সেই দলের সংগঠকেরও নিজেই অন্তর্ধান বা পলাতক হয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। মাইকেল চাকমা নিখোঁজ/পলাতক/অন্তর্ধান হবার পিছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। তার মধ্য থেকে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরছিঃ

ক। গত ১৮ মার্চ রাংগামাটির বাঘাইছড়িতে উপজেলা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সরকারী ব্যক্তিবর্গের উপর নৃশংস হামলায় ৮ খুনের পর হামলার সাথে জড়িত পাহাড়ি নেতারা এলাকা ত্যাগ করে আত্নগোপনে চলে যায়। মাইকেল চাকমাও আত্নগোপন করে ঢাকায় পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে, ৯ এপ্রিল মাইকেল চাকমা নিখোঁজ হবার নাটক সাজায় তারা।

মূলতঃ বাঘাইছড়ির ঐ নৃশংস হামলার ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে মাইকেল চাকমার নিখোঁজ হওয়ার নাটককে সামনে এনে তারা সাধারণ জনগণের সহানুভূতি আদায়ের প্রচেষ্টায় লিপ্ত হচ্ছে বলে ধারণা করা যায়। আর নিখোঁজ নাটকের প্রচারণায় তাদেরকে সার্বিক সহায়তা দিচ্ছে The Daily Star, Dhaka Tribune এর মত কিছু গণমাধ্যম এবং বামপন্থি সংগঠণগুলো।

খ। প্রসীত বিকাশ খীসা অন্তর্ধান/পলাতক থাকায় দলের সংগঠক হিসেবে মাইকেল চাকমা ইউপিডিএফ দলের সকল কিছু দেখভাল করতো। সম্প্রতি, ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র সন্ত্রাসের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা একজন কর্মীর ভাষ্যমতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রতিমাসে ইউপিডিএফ যে চাঁদার টাকা আদায় করতো তার পুরোটা মাইকেল চাকমার হাতে আসতো। মাইকেল চাকমা সেই টাকা দলের কর্মীদের মাঝে ভাগ বাটোয়ারা করার পর বাকী টাকা প্রসীত খীসার কাছে পাঠাতো।

কিন্তু প্রসীত খীসা যেহেতু আত্নগোপনে আছে আর মাইকেল চাকমা মাঠ পর্যায়ে দল পরিচালনা করছিলো। তাই চাঁদার টাকার একটা বড় অংশ মাইকেল চাকমা নিজের জন্য রেখে দিতো। প্রসীত খীসা এই তথ্য জানার পর মাইকেল চাকমার উপর ক্ষুব্ধ ছিলো। এরই জের ধরে প্রসীত খীসা নিজেই তার দলীয় কর্মীদেরকে দিয়ে মাইকেল চাকমাকে অপহরণ করিয়ে থাকতে পারে অথবা বিশাল অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে মাইকেল চাকমা নিজেই আত্নগোপনে চলে যেতে পারে।

গ। ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র সন্ত্রাসের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা ঐ কর্মী আরো জানায় যে, প্রসীত খীসার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে মাইকেল চাকমা নিজেই দলীয় প্রধান হবার পাঁয়তারা করতে থাকে। যা প্রসীত খীসার কানে পৌঁছায়। এরপর প্রসীত খীসা কৌশলে মাইকেল চাকমাকে ঢাকায় ডেকে নিয়ে যায় সংগঠনের মিটিংয়ের কথা বলে। তারপর থেকে মাইকেল চাকমা নিখোঁজ। এখান থেকেও দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানো যায়।

যাই হোক, ছোট্ট শিশু হৃদির বাবাসহ নিখোঁজ হওয়া সকল ব্যক্তি দ্রুতই ফিরে আসুক। মাইকেল চাকমাও ফিরে আসুক। তাহলেই সত্য বেরিয়ে আসবে। তবে খুনের আসামী দাগী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসী মাইকেল চাকমা ফিরে আসবে বলে মনে হয় না। কারণ ফিরে এলেই যে তাকে পুলিশি গ্রেপ্তারে পড়তে হবে।

আর পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল রাখতে অশান্তির রাজা ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ একটা ইস্যু জিইয়ে রাখতে মাইকেল চাকমাকে কখনোই আর জনসম্মুখে আসতে দিবেনা বলে আমার ধারণা। আর তাদের এই ইস্যুতে ঘি ছিটিয়ে মাঠ গরম করবে বামপন্থি সংগঠনগুলো। সেই সংবাদ ছাপিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করবে The Daily Star, Dhaka Tribune এর মতো পত্রিকাগুলো।

♦ লেখক- রাঙামাটি থেকে।


মুক্তমতে প্রকাশিত লেখার তথ্য, সূত্র, বক্তব্য একান্তই পাঠকের। পার্বত্যনিউজের সম্পাদকীয় নীতি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ইউপিডিএফ, মাইকেল চাকমা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − 11 =

আরও পড়ুন