আমের লাভ মধ্যস্বত্বভোগীর পেটে: বান্দরবানে খুচরায় ৬-৮গুণ দাম, ঠকছে কৃষক-ক্রেতা

fec-image

বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বান্দরবানে বেড়েছে আমসহ বিভিন্ন ফলের বাগান। এরপরও ক্রেতাদের নাগালে আসছে না দাম। ক্রেতারা বলছেন এই ভরা মৌসুমেও আমের দাম চড়া। কৃষক বলছে- নায্য মূল্য পাচ্ছে না আর মধ্যস্বত্তভোগী ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ‘এবার ব্যবসা হচ্ছে ভালো’। এভাবেই চলছে বান্দরবানে উৎপাদিত ফলের বাজার। এই মৌসুমে শুধু আম নয়, আনারস, লিচু, কাঠাল, কলা, পেপের দামও চড়া। কারণ, জেলার সাত উপজেলার গ্রামগঞ্জে বেড়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে। এই অবস্থায় সাধারণ পাহাড়ি কৃষকরা ঠকছেন। আর বেশি দামে ফল কিনে প্রতারিত হচ্ছেন স্থানীয় ভোক্তারা।

জানা গেছে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন ফল চাষে সরকারের গুরুত্বে রয়েছে পার্বত্য এলাকা। এরমধ্যে বান্দরবান জেলা আম, আনারস, কাঠাল, কলা, লিচু ও পেপে চাষে এগিয়ে রয়েছে। জেলার রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচিসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রতি বছর বাড়ছে ফলের চাষ। বিশেষ করে আম বাগান বেড়েছে। কিন্তু ভাগ্যের পরিবর্তন নেই কৃষকদের।

ঘামঝরা পরিশ্রমে বাগানে ফলনের বাম্পার হলেও ফল বিক্রি করে নায্য মূল্য পাচ্ছেন না তারা। বরাবরের মতোই আমচাষিরা সুফল ভোগ করতে পারছেন না। তাদের কাছ থেকে কম দামে আম কিনে নিয়ে বাজারে বেশি দামে বিক্রি করে বাড়তি মুনাফা লুটছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।

গত সোমবার (১৪ জুন) জেলার রুমা ও রোয়াংছড়ির কয়েকটি এলাকা সরেজমিন ঘুরে এবং বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি বছরের তুলনায় এবার বান্দরবানে আম্রপালি, হাঁড়িভাঙা, বারি আম-৪, রাংগোয়াইসহ বিভিন্নজাতের আম ও আনারসের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষকরা প্রতি কেজি আম বাগানে খুচরায় বিক্রি করছেন ৮-১২ টাকায়। আর সেই আম মাত্র ৩০কি.মি দূরে জেলা শহরে ক্রেতারা কিনছেন প্রতি কেজি ৬০-৭০টাকায়। একইভাবে প্রতি জোড়া আনারস কৃষকরা বিক্রি করছেন ৪০-৫০ টাকা আর সেই আনারস জেলা শহরে বিক্রি হচ্ছে ১৬০-১৮০ টাকায়। অর্থাৎ ৬-৮গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বাজারে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত একমাস ধরে বাজারে ফল সরবরাহ বেড়েছে। তারা প্রতি কেজি কিংবা জোড়ায় সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত লাভ করতে পারেন। একশ্রেণির অসাধু মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে বিরাট একটি লাভের অংশ চলে যায়। এতে ক্রেতারা যেভাবে ঠকছেন, ঠিক তেমনি কৃষকরাও নায্য মূল্য পাচ্ছেন না।

সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, চলতি মৌসুমেও রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় আম ও আনারসের বাম্পার ফলন হয়েছে। এখানকার উপজাতী জনগোষ্টীদের মধ্যে অধিকাংশ পরিবার এই চাষে সম্পৃক্ত। জুম চাষের পাশাপাশি ফল বিক্রি করে পরিবারের ছেলে মেয়ের ভরণ পোষন চালান তারা। তেমনি রোয়াংছড়ি লংথাংপাড়ার একজন কৃষক থেওয়ালং কারবারীও পাড়ার অন্যদের মতো আম চাষ করেছেন।

তিনি জানান, বাইরের মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা বাগান থেকেই আম কিনে নেওয়ার কারণে শহরের মূল্য তারা পাননা। রোমা-রোয়াংছড়ি প্রধান সড়কে কথা হয় একই এলাকার বাসিন্দা প্রেমপ্রে খুমির সঙ্গে। তিনি চার একর আম বাগান থেকে ১ লাখ টাকা আয় করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। তবে এই আম শহরে নিয়ে বিক্রি করা গেলে অন্তত ২ লাখ টাকা আয় করতে পারতেন তিনি।

রুমা বাসালং পাড়াপ্রধান (কার্বারী) নাকলিয়ান বম জানান, পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, কেরানীহাট, চন্দনাইশ ও রাঙ্গুনিয়া এলাকার অন্তত ৩০-৪০জন মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী দুর্গম গ্রামেগঞ্জে ঢুকে সহজ সরল উপজাতীদের ঠকিয়ে স্বল্প মূল্যে আম কিনে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ওজনে না কিনে পুরো বাগান’ই কিনে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। যার ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চাষীরা ঠকছেন। একই কথা স্বীকার করেছে মুননমপাড়া, জুরবারংপাড়া, চাইরাগ্যপাড়া, বটতলীপাড়ার বাসিন্দারাও।

সরেজমিনে বটতলীপাড়া এলাকায় কথা হয় রাঙ্গুনিয়া এলাকার ব্যবসায়ী মো. নিজাম, আবদু শহিদ এবং কেরানীহাট এলাকার মোহাম্মদ নাছিরের সঙ্গে। এই পার্বত্যনিউজের প্রতিবেদককে তারা জানান- একসময় তারা কেজিতে আম কিনলেও এখন চুক্তিতে বাগান কিনে নেন। পরে এসব আম, আনারসহ অন্যান্য ফল চট্টগ্রাম, ফেনী এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান। এই ক্ষেত্রে পরিবহণ খরচও তাদের বহন করতে হয়। তবে কৃষকদের ঠকিয়ে ব্যবসা করার কথা অস্বীকার করেন তারা।

এই প্রসঙ্গে বান্দরবান সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক বলেন, চলতি মৌসুমে বান্দরবান জেলায় আমের ফলন ভালো হয়েছে। করোনাকালীন হলেও ফলন বিক্রি করতে তাদের দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছে না। তবে কৃষি বিভাগ বান্দরবানের আম ভোক্তার হাতে পৌঁছে দিতে এবং অনলাইনে বিক্রি করতে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এতে করে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 3 =

আরও পড়ুন