চীনা ভূরাজনৈতিক কৌশলে সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে পিছিয়ে পড়ছে মিয়ানমার

fec-image

মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি রাজ্যগুলোতে ২০২৪ সালে দেশটির সশস্ত্র প্রতিরোধযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা ছিল অভাবনীয়। সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ১০২৭’ চালু হওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ একের পর এক এলাকা দখল করতে থাকে।

বণিকবার্তার এক খবরে বলা হয়, মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি রাজ্যগুলোতে ২০২৪ সালে দেশটির সশস্ত্র প্রতিরোধযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা ছিল অভাবনীয়। সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ১০২৭’ চালু হওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ একের পর এক এলাকা দখল করতে থাকে। এ জোটে ছিল মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ), টাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) ও আরাকান আর্মিসহ বেশ কয়েকটি সশস্ত্র জাতিগোষ্ঠী। সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করা গণপ্রতিরোধ বাহিনী পিপলস ডিফেন্স ফোর্সও (পিডিএফ) তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে। ওই সময় শান রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ লাসিও, কুটকাই, নাওংকিও সব জায়গায় পতন ঘটে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ঘাঁটির। এর আগেই পতন ঘটেছিল, মনে হচ্ছিল, সামরিক জান্তা হয়তো দ্রুত ভেঙে পড়বে, তিন বছরের পুরনো অভ্যুত্থানের অবসান ঘটবে।

তবে সে চিত্র বদলে দিয়েছে চীনের কৌশল। সীমান্তজুড়ে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব টিকিয়ে রাখতে বেইজিং নতুন এক কৌশল নেয়। এ কৌশলের ফলে ধীরে ধীরে থেমে যায় মিয়ানমারের প্রতিরোধ আন্দোলনের অগ্রগতি। ‘অপারেশন ১০২৭’-এর দ্বিতীয় ধাপ যখন পুরো শক্তিতে এগোচ্ছে, তখন চীন জানায় ‘মিয়ানমারের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান’। বেইজিং পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, যদি লড়াই বন্ধ না হয় তাহলে তারা সীমান্তপথে অর্থ, সরঞ্জাম ও জ্বালানির প্রবাহ বন্ধ করবে।

ফল হয় দ্রুত। লাশিও দখলের পর অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয় এমএনডিএএ। তারা ঘোষণা দেয়, তারা পশ্চিমা রাষ্ট্র বা নির্বাসিত জাতীয় ঐক্য সরকারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবে না। গত এপ্রিলে চীনের মধ্যস্থতায় তারা শহরটি বিনা যুদ্ধে সেনাবাহিনীর হাতে ফিরিয়ে দেয়। জুলাইয়ে টিএনএলএও চীনের চাপের মুখে নাওংকিও থেকে সরে আসে। এরপর আগস্টে মোগোক ও মংমিত—দুটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর চীনা ‘শান্তি চুক্তি’র অংশ হিসেবে ফেরত যায় জান্তার হাতে।

লাশিও, কুটকাই ও নাওংকিও থেকে প্রতিরোধ বাহিনীর পিছু হটার পর উত্তর শান রাজ্যে জান্তা সেনাবাহিনী পুনর্গঠনের সময় পায়। চীনের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতির ফলে ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের কার্যক্রম অনেকটা থেমে যায়, আর জান্তা পুনর্দখল করে নেয় সীমান্তপথের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহর। কৌশলগতভাবে এটি বেইজিংয়ের জন্যও লাভের ছিল, কারণ এ করিডোর দিয়েই চীন-মিয়ানমার বাণিজ্যের বড় অংশ পরিচালিত হয়। যুদ্ধবিরতির সুবাদে সেনারা পুনর্গঠিত হয়ে সৈন্য ও সরঞ্জাম সরিয়ে নেয় দেশের অন্য ফ্রন্টে। বিশেষ করে মন্ডল, রাখাইন, কাচিন ও মাগওয়ে অঞ্চলে। সেখানে বিদ্রোহীদের শক্ত ঘাঁটি দুর্বল করতে শুরু হয় নতুন হামলা।

এ অবস্থায় রাখাইন রাজ্যে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। আরাকান আর্মি (এএ) জানায়, সম্প্রতি উত্তর শানে যুদ্ধবিরতির সুযোগে জান্তা রাখাইনে বিমান ও নৌবাহিনীর হামলা ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। রাথেদাং, পননাগিউন, পোকতাউ, কিয়াউকফিউ ও সিত্তে এলাকাজুড়ে চলছে বোমাবর্ষণ ও আর্টিলারি হামলা। যার বেশির ভাগ লক্ষ্য ছিল বেসামরিক এলাকা। আরাকান আর্মির দাবি, এসব হামলায় ১২ জনেরও বেশি নিহত হয়েছে। ১৯টি গ্রামের ১২ হাজারের বেশি বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্যত্র আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে। আরাকান আর্মি বলছে, উত্তর শানে সাময়িক বিরতি তৈরি হলেও রাখাইন এখন নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। রাজধানী সিত্তে ও চীনা বিনিয়োগনির্ভর কিয়াউকফিউ বন্দরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে আরাকান আর্মি। আর জান্তা সেই অগ্রযাত্রা ঠেকাতে রাখাইনকে রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।

চীনের এ হস্তক্ষেপকে প্রতিরোধ বাহিনীর অনেক নেতা সরাসরি ‘বলপ্রয়োগী কূটনীতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, বেইজিং শান্তির নাম করে বাস্তবে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের টিকে থাকা নিশ্চিত করছে। কারণ সেনা সরকার টিকে থাকলেই সীমান্ত বাণিজ্য, বিরল খনিজ, গ্যাস পাইপলাইন ও বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পগুলো নির্বিঘ্নে চালানো সম্ভব। যদিও চীন বলছে তারা শুধুই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। মিয়ানমারে শান্তি প্রতিষ্ঠাই তাদের লক্ষ্য।

তবে পরিস্থিতি আগে ভিন্ন ছিল। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর প্রথম দিকে বেইজিং মিন অং হ্লাইংয়ের সরকারকে স্বীকৃতি না দিয়ে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেছিল। কিন্তু যখন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বাড়ল, তখন তারা ধীরে ধীরে অবস্থান বদলায়। মিয়ানমারের খনিজ, কাঠ, গ্যাস ও বন্দর প্রকল্পে অনায়াস প্রবেশাধিকার পেতে হলে যে সরকারই থাকুক, তাকে সঙ্গ দিতে হবে—এ নীতি এখন চীনের কূটনীতির ভিত্তি। অর্থনৈতিক হিসাবেও চীনের লাভ বিপুল। উত্তর মিয়ানমারের কাচিন ও শান রাজ্যে বিরল খনিজ—বিশেষত ল্যান্থানাম, নিওডিমিয়াম ও টারবিয়াম খনন এখন বেইজিং সমর্থিত কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। জান্তা সেনাবাহিনী তাদের খনিজ উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছে কূটনীতিক ও সামরিক সহায়তা পাওয়ার শর্তে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর দখলে থাকা এলাকাগুলোতেও চীন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে, যাতে সেখানে বিদ্রোহীরা টিকতে না পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের এ কৌশল এখন পুরো প্রতিরোধ আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। ওয়াহ স্টেট আর্মি—যা একসময় বিপ্লবীদের অস্ত্র ও অর্থ দিত, তারা এখন চীনের প্রভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক কৌশলবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মিয়ানমারের সশস্ত্র প্রতিরোধ এখন এমন এক অবস্থায় এসে ঠেকেছে, যাকে তারা বলছে ‘ওয়ার টু নোহয়্যার’ অর্থাৎ যুদ্ধ চলছে, কিন্তু সুস্পষ্ট বিজয়ের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। আইআইএসএস মনে করে, অপারেশন ১০২৭ ছিল জান্তাবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য, কিন্তু সেই অগ্রগতি টেকসই হয়নি। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে—অসংগঠিত নেতৃত্ব, সমন্বয়ের অভাব এবং চীনের কূটনৈতিক চাপ। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, চীনের মধ্যস্থতায় যখন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তখন অনেক জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় মনোযোগ দেয়, ফলে যৌথ নেতৃত্ব ভেঙে যায়। পাশাপাশি অস্ত্র, তহবিল ও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় প্রতিরোধযোদ্ধারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে পারছে না। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে চীনের ভূমিকাই এখন প্রধান ভারসাম্য-নির্ধারক শক্তি; যার ফলে প্রতিরোধ আন্দোলন ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ছে এবং সামরিক জান্তা আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

বার্মিজ সভ্যতার সূচনাবিন্দু ধরা হয় বাগান সাম্রাজ্যকে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগে বাগান সাম্রাজ্যের রাজা নারাথিহাপাতে মঙ্গোলদের আক্রমণের মুখে রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ইতিহাস তাকে ‘তাইওক প্রেই মিন’ অর্থাৎ চীনা আক্রমণে পালানো রাজা নামে স্মরণ করে। তার সেই পরাজয় শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতার নয়, বরং বাগান সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হিসেবে দেখা হয়। মিয়ানমারের ইতিহাসে এটি এক প্রতীকী মুহূর্ত—যখন এক রাজা বিদেশী প্রভাবের সামনে আত্মসমর্পণ করে জাতির পতন ঘটান। আজকের মিয়ানমার যেন সেই ইতিহাসের উল্টো প্রতিফলন দেখছে। যদিও পরিস্থিতি পাল্টেছে। এবার কোনো রাজা পালিয়ে যাচ্ছে না, বরং সামরিক জান্তার প্রধান মিন অং হ্লাইং চীনের পছন্দে কিংবা কৌশল, কূটনৈতিক ছায়া ও অর্থনৈতিক সহায়তায় রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে আছেন। ওই সময় ইউয়ান সাম্রাজ্যের আক্রমণে পতিত হয়েছিল মিয়ানমার; এখন চীনের কূটনৈতিক আশ্রয়ে টিকে আছেন মিন অং হ্লাইং।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: চীন, মিয়ানমা
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন