‘চেঙ্গী সেতুতে’ বদলে যাবে তিন উপজেলার চিত্র

fec-image

এক ‘চেঙ্গী সেতুতে’ বদলে যাবে রাঙ্গামাটির তিন উপজেলার চিত্র। ১৯৬০ সালে প্রমত্তা কর্ণফুলী নদীতে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য বাধ দেওয়ার ফলে সৃষ্টি হয় সুবিশাল কৃত্রিম হ্রদ। তখন রাঙ্গামাটির বিস্তীর্ণ এলাকা পানি তলিয়ে সৃষ্টি হয় কাপ্তাই হ্রদের। মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষে এই হ্রদ সৃষ্টি হলেও বিস্তীর্ণ এলাকা পানি ডুবে যাওয়ায় বিপাকে পড়ে উদ্বাস্তু মানুষেরা উঁচু পাহাড়ি এলাকায় বসতি গড়ে তোলেন। হ্রদ সৃষ্টির পর থেকেই জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় চেঙ্গী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবি স্থানীয়দের। অবশেষে চেঙ্গী নদীর ওপর নির্মিত এই কাঙ্ক্ষিত ‘চেঙ্গী সেতুর’ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে আজ।

বুধবার (১২ জানুয়ারি) সকাল ১০টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সেতুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির পর সরাসরি রাঙ্গামাটি সদর-নানিয়ারচর-লংগদু-বাঘাইছড়ি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ১৯৯৩ সালে নানিয়ারচর অংশে চেঙ্গী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এরপর ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নানিয়ারচরের চেঙ্গী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। মন্ত্রীর ঘোষণার দুই বছর পর ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সেতু নির্মাণ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে ২০ ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন ব্যাটেলিয়ান (ইসিবি)। সেতু নির্মাণের কার্যাদেশ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মনিকো লিমিটেড। চেঙ্গী নদীর ওপর নির্মিত এই সেতুটির দৈর্ঘ্য ৫০০ মিটার ও প্রস্থ ১০ দশমিক ২ মিটার। এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘতম সেতু। সেতুর নির্মাণ ব্যয় খরচ প্রায় ১২০ কোটি টাকা। এছাড়া সেতুর দুই পাশে দুই কিলোমিটার সড়ক সংযোগ নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। তবে এই ১০০ কোটি টাকার মধ্যে ৪৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে ভূমি অধিগ্রহণের কাজে।

সেতু নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মনিকো লিমিটেডের প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার পাল জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হওয়া এই সেতুটির কাজ শেষ সম্পন্ন হয়েছে বছরখানেক আগেই। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পরপরই স্থানীয়দের যাতায়াতের সুবির্ধাতে সেতুটি খুলে দেওয়া হয়েছে। বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করবেন। তবে স্থানীয়ভাবে চেঙ্গী নদীর ওপর নির্মিত এই সেতুটি চেঙ্গী সেতু হিসেবে পরিচিতি পেলেও এর আনুষ্ঠানিক নাম কী রাখা হয়েছে তা জানাতে পারেননি এই প্রকৌশলী।

নানিয়ারচর উপজেলার বাসিন্দা ও রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী উৎস দেবনাথ জানান, চেঙ্গী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। অবশেষে আমাদের কাক্সিক্ষত সেই দাবি বাস্তবায়ন হয়েছে। সেতুর নির্মাণের আগে আমরা নৌ-পথে বেশি ভোগান্তি পেতাম। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর খেয়াঘাট পার হতে অনেক ভোগান্তি পেতে হতো। খাট পারাপার বন্ধ হয়ে পড়ার কারণে মাঝিদের ডেকে এনে রাতে খাট পার হতে হতো। এছাড়া বাজারের অপর পাড়ের মানুষ অসুস্থ রোগী, মৌসুমি ফল, শাক-সবজি পরিবহনে অনেক ভোগান্তি পেতেন।

নানিয়ারচর উপজেলাকে বলা হয়ে থাকে আনারসের রাজধানী। দেশের উৎপাদিত আনারসের বেশিরভাগই উৎপাদন হয়ে থাকে রাঙ্গামাটির এই প্রত্যন্ত উপজেলায়। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা ঝিল্লোল মজুমদার জানান, সেতুর নির্মাণের ফলে নানিয়ারচর উপজেলার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সমৃদ্ধ হওয়ায় স্থানীয় কৃষিজ পণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

এদিকে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত সেতুটি নানিয়ারচর উপজেলায় চেঙ্গী নদীর ওপর নির্মিত হলেও এর সুফল পাবেন নানিয়ারচর-লংগদু ও বাঘাইছড়ি উপজেলার মানুষ। এর জন্য নানিয়ারচর থেকে লংগদু উপজেলায় যাতায়াতের ১৮ কিলোমিটার পাহাড়ি সড়ক নির্মাণ করা গেলে লংগদু উপজেলার সঙ্গে জেলা সদরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ নির্মাণ হবে। এছাড়া বাঘাইছড়ি উপজেলার মানুষও দীঘিনালা-লংগদু হয়ে সড়ক যোগে রাঙ্গামাটি সদরে আসতেন পারবেন। এতে করে খাগড়াছড়ি সদরে যেতে হবে না। এদিকে যেমন সড়ক দূরত্ব কমবে অন্যদিকে বাঁচবে সময়। তবে এই সুফল পাওয়া যাবে ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সড়কটি নির্মাণের পর থেকেই।

বাঘাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দীন বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাঘাইছড়ির সঙ্গে রাঙ্গামাটির সরাসরি সড়ক যোগাযোগ। নানিয়ারচর সেতুটি নির্মাণের ফলে আমরা এই লক্ষে আরেকধাপ অগ্রসর হলাম। বাঘাইছড়ির মানুষের এখন সড়কযোগে খাগড়াছড়ি হয়ে রাঙ্গামাটিতে আসা-যাওয়া করতে হয়। কিন্তু বাঘাইছড়ি থেকে লংগদু উপজেলা যাওয়ার রাস্তাটির কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে।

নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান প্রগতি চাকমা জানান, একটি সেতুর মাধ্যমে আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণ হতে চলেছে। আমরা এখন খুব সহজেই জেলা সদরে নৌ-পথ ছাড়াই যাতায়াত করতে পারব। এছাড়া এই উপজেলায় উৎপাদিত পণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণে ভোগান্তি কমে আসবে। আস্তে আস্তে এর সুফল পেতে শুরু করবে পাশ্ববর্তী লংগদু ও বাঘাইছড়ি উপজেলার মানুষ।

নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিউলি রহমান তিন্নী জানান, বুধবার নানিয়ারচরবাসীর বহুল প্রত্যাশিত এই সেতুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। উদ্বোধন উপলক্ষে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন সেতুর তত্ত্বাবধানকারী সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন ব্যাটেলিয়ান। এখনো সেতুটির নামকরণ করা হয়নি। ইউএনও বলেন, উদ্বোধনের দিন বুধবার নানিয়ারচরের সাপ্তাহিক হাঁট হওয়াতে সাপ্তাহিক হাঁট এই সপ্তাহে বৃহস্পতিবার বসবে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × four =

আরও পড়ুন