পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে মিথ্যা ও একপেশে প্রচারণা এবং কিছু কথা

fec-image

ফেসবুকে ব্লগার পাইচিং মং মারমা লিখিত সুদীর্ঘ (মিথ্যা) তথ্যবহুল একটি লেখা পড়লাম, যা আরেকজন মানবতার ধ্বজাধারী স্বঘোষিত নাস্তিক ব্লগার আসাদ নুরের ফেসবুক আইডিতে প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমান হাল জামানার স্বল্প সময়ে স্বল্প পুঁজিতে বিখ্যাত হয়ে ওঠার অন্যতম একটি রাস্তা হলো নিজেকে নাস্তিক ঘোষণা করা, আর ইসলামের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করার মাধ্যমে পশ্চিমাদের এবং এদেশের কিছু আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগা তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের বাহবা পাওয়া। যেটা ব্লগার আসাদ নুর খুব ভালোমতো বুঝতে পেরেছে এবং সে সেই পথেই হেঁটেছে।

যাক, আজকের এই লিখনীটি ব্লগার আসাদ নুরকে নিয়ে নয়, বরং ব্লগার পাইচিংমং মারমা যে সকল তথ্য তুলে ধরেছে সে সকল তথ্যগুলোকে একটু বিশ্লেষণ করা এবং এর মধ্যে সত্যতা কতটুকু আছে তা তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা মাত্র।

শুরুতেই ব্লগার পাইচিং মং মারমা নিজেকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। আর তাদেরকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জওয়ানরা ধর্ষণ করছে বলে অভিযোগ করেছে। এর স্বপক্ষে কাপেং ফাউন্ডেশন নামে একটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের কিছু স্বপ্নে পাওয়া তথ্য প্রচার এবং প্রকাশ করেছে। প্রথমত ১৫শ’ শতাব্দী থেকে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণে বার্মা হতে অভিবাসী হিসেবে এদেশে আগমনকারী এসকল ক্ষুদ্র্র নৃ-গোষ্ঠী জনগণ কি হিসাবে নিজেদের ‘আদিবাসী’ দাবি করে এ বিষয়টি আমার বোধগম্য নয়। বিশেষ করে জাতিসংঘ প্রদত্ত এবং ILO Convention অনুযায়ী, আদিবাসীর আভিধানিক যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে সেটা মিলিয়ে দেখলে খুব সহজে প্রমাণিত হয় যে, এসকল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনগণ কোনোভাবেই এ দেশের আদিবাসী নয়, যা কিনা বান্দরবানের প্রয়াত বোমাং সার্কেল চিফ একটি জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের কাছে পরিষ্কার ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। মূলত রাজনৈতিক ফায়দা লুটার জন্যই এই ‘আদিবাসী’ ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। বিশেষ করে ২০০৭ সালের UN Declaration on the Rights of Indigenous Peoples অধ্যাদেশটি পাশ হওয়ার পর থেকেই হঠাৎ করে উপজাতি বুদ্ধিজীবী সমাজ নিজেদের আদিবাসী দাবি করতে থাকে। আর তাদের এই দাবির নেপথ্যে কাজ করছেন রাজাকার ত্রিদিব রায়ের সুযোগ্য (কুখ্যাত) সন্তান দেবাশীষ রায়। এখানে উল্লেখ্য যে, তথাকথিত কাপেং ফাউন্ডেশনের অন্যতম উদ্যোক্তাও তিনি এবং তার ছোট স্ত্রী ইয়েন ইয়েন।



বলা বাহুল্য, এই তথাকথিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবতাবিরোধী অপরাধকারী সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন পিসিজেএসএস। তবে এ সংগঠনটি ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৩৪৬ জন পাহাড়ি নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রকাশ করলেও পাহাড়ি সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএস-ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীদের দ্বারা নির্যাতিত-নিপীড়িত ও ধর্ষিত তাদের স্বজাতির নারী যেমন মিতালী চাকমা, বিলাইছড়ির আয়না চাকমা, খাগড়াছড়ির দীঘিনালার দীপা ত্রিপুরা এবং রামগড়ের দীপ্তি ত্রিপুরা-সহ উপজাতীয় সন্ত্রাসী কর্তৃক বাঙালি নারীদের ধর্ষণের বিষয়টি বেমালুম উপেক্ষা করে গেছে। অথচ যারা পাহাড়ে বাস করে তারা সবাই জানে যে, উপজাতি এ সকল সন্ত্রাসী সংগঠন স্বজাতি নারীদের উপর কী ধরনের স্টিম রোলার চালিয়ে থাকে শুধুমাত্র বাঙালি ছেলের সাথে বন্ধুত্ব এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু কথা বলার জন্য। এক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাদেরকে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়। তবে কাপেং ফাউন্ডেশন বা তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজ এ সকল নিপীড়িত লাঞ্চিত নারীদের মানবাধিকার বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়, কেননা এতে কোনো রাজনৈতিক ফায়দা লোটা সম্ভব নয়।

ব্লগার পাইচিংমং পার্বত্য চট্টগ্রামকে সেনা শাসিত এলাকা হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে তিনি এটা বলেননি যে, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে চারটি উপজাতির সন্ত্রাসী সংগঠনের হাতে হাজার হাজার অবৈধ অস্ত্র রয়েছে এবং শান্তিচুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে সশস্ত্র সংগঠন লালন করছে আর চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে এক অরাজকতাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছে। তার নিশ্চয়ই জানার বাকি নেই যে, এসকল সশস্ত্র সংগঠনগুলো পাহাড়ি দরিদ্র নিরীহ জনগণকে বন্দুকের নলের ভয় দেখিয়ে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে। এখন এসব সন্ত্রাসীদেরকে দমনে সরকার যদি সেনাবাহিনী মোতায়েন করে তবে কি রাষ্ট্র কোনো ভুল করেছে? অথচ শান্তিচুক্তির অন্যতম একটি ধারা ছিল যে, শান্তিবাহিনীর সকল সদস্য তাদের অস্ত্র সমর্পণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে। কিন্তু তা না করে এখনো তারা সশস্ত্র সংগঠন লালন করছে।

ব্লগার পাইচিংমং ১৯৯২ থেকে ১৯৯৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি গণহত্যার বিষয়ে উপস্থাপন করেছেন, যার জন্য তিনি নিরাপত্তাবাহিনী এবং সেই সাথে স্থানীয় বাঙালিদেরকে দায়ী করেছেন, যদিও উল্লেখিত গণহত্যায় বাঙালীরাই আক্রান্ত হয়েছিল। তবে সেই সাথে তিনি যদি উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠন শান্তি বাহিনী কর্তৃক বাঙালিদের উপর সংঘটিত ১৯৮৪ সালের ভূষণছড়া গণহত্যা, ১৯৮০ সালের কাউখালী গণহত্যা, ১৯৮৬ সালের পানছড়ি ও দীঘিনালার গণহত্যা এবং ১৯৯৬ সালের পাকুয়াখালী গণহত্যার বিষয়টির অবতারণা করতেন তবে লেখাটি বস্তুনিষ্ঠ হতো। কিন্তু তিনি পক্ষপাতমূলকভাবে এসকল গণহত্যার কথা বেমালুম চেপে গেছেন। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয় সন্ত্রাসীগোষ্ঠী কর্তৃক প্রতিনিয়ত স্বজাতির নারীরা ধর্ষণের শিকার হলেও তিনি ১৯৭৩ সালে জনৈক সেনা কর্মকর্তার ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রত্যেক উপজাতি মহিলার গর্ভে একটি করে মুসলিম বাঙালি সন্তান জন্ম নিবে’ অপ্রমাণিত বক্তব্য উদ্ধৃত করে সহমর্মিতা আদায়ের প্রচেষ্টা করেছেন। তবে সেটা যদি সত্যি হয়ে থাকত তাহলে আজ এ দীর্ঘ ৪৭ বছরের পার্বত্য চট্টগ্রামে পথে-ঘাটে হাজার হাজার জারজ সন্তান দেখতে পাওয়া যেত। আমি জানি না, তিনি এ ধরনের বাঙালি ওরসজাত উপজাতীয় সন্তান দেখতে পেয়েছেন কিনা?

এছাড়া তার লেখনীতে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের সেনাবাহিনী কর্তৃক জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে যদি সত্য হয়ে থাকত তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের জাতিগোষ্ঠীর জনগণ দেখা যেত না। তবে বাস্তবতা হলো পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে কারিতাস, ওয়ার্ল্ড ভিশন, সনে ইন্টারন্যাশনাল, কমিউনিটি এডভান্সমেন্ট ফোরাম এবং ব্যাপ্টিস্ট চার্চ অভ বাংলাদেশ সহ বেশ কিছু এনজিও এখানকার দারিদ্র উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্তের সুযোগ নিয়ে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তকরণের কার্যক্রম পরিচালিত করছে। কিন্তু পাইচিংমং মারমা এবং তার বিজ্ঞ বন্ধুরা এ বিষয়ে একদম নিশ্চুপ। জানি না এর পিছনে কোনো গোপন কাহিনী অন্তর্নিহিত আছে কিনা। গত ৩০ বছরে অর্থাৎ ১৯৯১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারীদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ১৩৪.৪০ ভাগ। এক্ষেত্রে এসকল

এনজিওদের লক্ষ্যবস্তু হলো ক্ষয়িষ্ণু কিছু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী যথা বোম, চাক, লুসাই ও পাংখো নৃ-গোষ্ঠী, যাদের মোটামুটি সকলেই খৃষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, গত ১ জানুয়ারি ২০১৮ সাল হতে এ পর্যন্ত ৮৫৩ জন উপজাতীয় ব্যক্তিবর্গ এসকল এনজিওদের ফাঁদে পা দিয়ে নিজস্ব ধর্ম-সংস্কৃতি বিসর্জন দিয়ে খৃষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। সরকারি হিসাব মতে, শুধুমাত্র বান্দরবান জেলায় ১৩০৯৯৭ জন খ্রিস্টান ধর্মের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বসবাস করছে এবং দু’দশক আগে এ জেলায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও এখন তারা তৃতীয় স্থানে চলে এসেছে। কিন্তু এ সকল বিষয়ে উপজাতীয় বুদ্ধিজীবী সমাজ এবং তাদের দোসররা একদম মুখে কুলুপ এঁটে আছে।

আমার এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি, জাতি-গোষ্ঠী বা ধর্মকে হেয় প্রতিপন্ন করা নয়, বরং সঠিক চিত্রটি সকলের সামনে তুলে ধরা। একটি প্রতিবেদন যখন শুধুমাত্র মিথ্যার উপর ভিত্তি করে লেখা হয়, তখন সেটা শুধু প্রোপাগান্ডায় হয়। যা শুধু সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ায় এবং সমাজে কোনো কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসে না। আশা করব, আমরা যারা ফেসবুকে বা ব্লগে লেখালেখি করি তারা সর্বক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে সঠিক চিত্র তুলে ধরার প্রচেষ্টা চালাবো। এসব একপেশে বা পক্ষপাতদুষ্ট কোনো বিষয় উপস্থাপন করব না। আশা করি, এ বিষয়ে সকলেই সচেতন হবেন। অবশ্য একজন অন্ধ ব্যক্তিকে সঠিক পথের দিশা দেখানো যায়, কিন্তু যে চক্ষু থাকতেও অন্ধের মতো আচরণ করে অর্থাৎ অন্তরচক্ষু বন্ধ তাকে পথ দেখানো সম্ভব নয়। আর আমার এই উপদেশও তাদের জন্য নয়। সকলে ভালো থাকুন।

লেখক: খাগড়াছড়ি থেকে

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven + nine =

আরও পড়ুন