বাংলাদেশের আদিবাসী

fec-image

বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্রবন্ধ

৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। জাতিসংঘ ১৯৯৩ সাল থেকে আদিবাসী দিবস পালন আরম্ভ করে। এরপর থেকে প্রতিবছর ৯ আগস্ট আদিবাসী দিবস হিসাবে পালিত হয়। বাংলাদেশে এবার সরকারিভাবে আদিবাসী দিবস পালন করা হলো না। আমি মনে করি এই সিদ্ধান্তটি গ্রহণ খুবই সমীচীন হয়েছে। কারণ বাংলাদেশে প্রকৃত প্রস্তাবে কোন আদিবাসী নেই। ‘আদিবাসী’ শব্দটি হিন্দি ও বাংলায় ব্যবহার করা হচ্ছে ইংরেজির Aborigine শব্দের প্রতিশব্দ হিসাবে। Chamber’s সংকলিত বিখ্যাত ইংরেজি অভিধান Aborigines এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে- The Original or native inhabitants of a country. অর্থাৎ আদিবাসী বলতে বোঝায় কোন একটা দেশে আদিকাল থেকে বসবাসকারী জনসমষ্টিকে।  দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে অস্ট্রেলিয়ার কালো মানুষদের। এরা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী। সাদা মানুষ যাওয়ার আগে এই কাল মানুষরা সেখানে বাস করত। একইভাবে পশ্চিম গোলার্ধে বিভিন্ন রেড ইন্ডিয়ান গোষ্ঠির মানুষকে বলা যেতে পারে আদিবাসী। কারণ, সেখানে তারা বাস করছে ইউরোপ থেকে সাদা মানুষ যাবার অনেক আগে থেকে।

কিন্তু সর্বত্র এত সহজভাবে আদি বাসিন্দা কারা সেটা ঠিক করা যায় না। ইউরোপের আদি বাসিন্দা কারা সেটা নৃতাত্বিকরা বলতে পারেন না। একই ভাবে বলা সহজ নয় দক্ষিণ এশিয়ার আদি বাসিন্দা কারা। একটা অঞ্চলের অনগ্রসর মানুষ সে দেশের আদিবাসী এরকম ধরে নেয়া খুবই ভুল। কারণ, একই দেশে একই মানবধারার মানুষের এক অংশ গড়েছে সভ্যতা। কিন্তু তাদের মত মানুষেরই আর এক অংশ থেকে গেছে বনে জঙ্গলে। থাকতে চেয়েছে গেছে আদিম জীবনধারা আঁকড়ে। এই উপমহাদেশে এটা ঘটেছে। ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিক রিজলে সাঁওতালদের বলেছেন দ্রাবিড় মানবধারাভুক্ত। সাঁওতালরা বনে থেকে গিয়েছে। কিন্তু দ্রাবিড়দের  আর একাংশ, যেমন তামিলরা  গড়ে তুলেছে সভ্যতা। তামিলরা কোনোভাবেই এই উপমহাদেশে আগন্তুক জাতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। তামিল এবং সাঁওতালদের মাথার আকৃতি একই রকম লম্বা। গায়ের রং কালো। চুল মসৃণ ও  তরঙ্গাকৃতি। এরা নিগ্রোদের মতো নয়। নিগ্রোদের চুল পশমের মতো পাক খাওয়া। মাথা লম্বা। ঠোঁট পুরুউল্টানো। এবং মুখমন্ডল অগ্রপ্রসারিত (prognathic face) ।

বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে এরকম মানুষ নজরে পড়ে না। তবে কারো কারো মতে সুন্দর বনের বিশেষ মেছো সম্প্রদায় এবং যশোর অঞ্চলের বাঁশপোড়দের (বাঁশ দিয়ে ঝুড়ি চাটাই বোনে যারা) মধ্যে এরকম মানুষ মাঝে মাঝে দেখতে পাওয়া যায়। তবে এরা সংখ্যায় অতি নগন্য। নিগ্ররা কৃষ্ণকায়। কিন্তু এদের চেহারা নিগ্রদের অনুরূপ নয়। এরা হলো অনিগ্রো কালো মানুষ। রিজলে এর মতে এই উপমহাদেশের মানুষের মধ্যে প্রধানত তিনটি মানবধারা থাকতে দেখা যায়।

এদের একটি হল সাদা, একটি হল পীতাভো আর একটি হল কালো। কিন্তু এই কাল মানুষরা নিগ্রো মানব শাখাভুক্ত নয়। সাদা, হলুদ এবং অনিগ্র কালো মানুষের সংমিশ্রণ ঘটেছে এই উপমহাদেশে। তবে কারা এই উপমহাদেশের আদি বাসিন্দা সেটা ঠিক করা সম্ভব নয়। যারা কোন সভ্যতা গড়ে তুলতে পারেনি, থেকেছে আরণ্যক জীবনযাত্রা আঁকড়ে, তারা এই উপমহাদেশের আদিবাসী এরকম বলতে যাওয়া ভুল। কারণ, তাদের আর একাংশ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে সভ্যতা বা নগর জীবন।

১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে পশ্চিম বাংলার বর্ধমান জেলার উত্তরভাগে অবস্থিত পণ্ডু রাজার ঢিবি নামক স্থান খনন করে তাম্র-প্রস্তর যুগের সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। তাম্র প্রস্তর যুগ বলতে বোঝায়, মানব সভ্যতার এমন একটি পর্যায়, যখন মানুষ যথেষ্ট পরিমাণে প্রস্তর অস্ত্র ব্যবহার করেছে। আর সেই সঙ্গে শুরু করেছে তামার মতো ধাতু দ্রব্যের ব্যবহার। পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে তামার তৈরি বড়শি। যার থেকে প্রমাণিত হয় এখানে যারা বাস করত, তারা তামার বড়শি দিয়ে মাছ ধরত। পাণ্ডু রাজার ঢিবির খুব কাছে অজয় নদীর ধারে অবস্থিত বীরভূম জেলার মহিষাদল নামক জায়গায় মাটি খুঁড়ে একটি মৃৎ পাত্র পাওয়া গেছে। যার মধ্যে পাওয়া গিয়েছে কিছু কয়লা হয়ে যাওয়া ধান। রেডিও কার্বন-১৪ পদ্ধতিতে এসব ধানের বয়স নির্ণীত হয়েছে ১৩৮০ থেকে ৮৫৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে। পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে আবিষ্কৃত বিভিন্ন জিনিস এবং মহিষাদলে পাওয়া ধানকে ধরা চলে একই সভ্যতার অংশ। কারণ এই দুই স্থানে যে মৃৎপাত্র আবিষ্কৃত হয়েছে তা হল অবিকল এক। মৃৎপাত্রে আঁকা কালো নকশাও একই ধরনের। যারা এই সভ্যতা গড়ে তুলেছিল তারা মৃতদেহ দাহ করতো না। সমাধিস্থ করত।

পাণ্ডু রাজার ঢিবি অঞ্চলে তাম্র প্রস্তর যুগের ১৩টি মানব সমাধি আবিষ্কৃত হয়েছে। নৃতত্ত্বে মানুষকে মাথার আকৃতি অনুসারে মানুষকে তিনভাগে ভাগ করা হয়: লম্বা মাথা, মাঝারি মাথা ও গোল মাথা। লম্বা মাথার মানুষ বলতে বোঝায় এমন সব মানুষকে যাদের মাথার প্রস্থ দৈর্ঘ্যের শতকরা ৭৫.৯ ভাগ এর কাছাকাছি অথবা তার কম। মাঝারি মাথার মানুষ বলতে বুঝায় যাদের মাথার প্রস্থ হল দৈর্ঘ্যের শতকরা ৭৬ থেকে ৮০ .৯ ভাগের মধ্যে। আর গোল মাথার মানুষ বলতে বোঝায় যাদের মাথার প্রস্থ ও দৈর্ঘ্য শতকরা অনুপাত হল ৮১ বা তার বেশি। মাটি খুঁড়ে পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে যে সব মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছে তারা হল মাঝারি মাথার।

এতকাল নৃতাত্তিকরা যে গবেষণা করেছেন, তা থেকে বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে দেখা যায় মাঝারি মাথার মানুষের প্রাধান্য থাকতে। অর্থাৎ নৃতাত্তিক দিক থেকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাযুজ্য আছে পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে সেই অতীতে বসবাসকারী মানুষের। পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে বসবাসকারী মানুষ মাছ ধরতো। খাদ্যশস্য হিসাবে আবাদ করত ধান। অর্থাৎ তাদের ছিল ভাত মাছের জীবন।

এখনো বাংলাভাষী মানুষের বস্তুগত সংস্কৃতির ভিত্তি হল ভাত ও মাছ। বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বেঁচে থাকে ভাত-মাছ খেয়ে। বর্তমান বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে তাম্র প্রস্তর যুগের কোন সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়নি। কিন্তু হবার সম্ভাবনা যথেষ্টই আছে। বাংলাদেশের সীমান্তের খুব কাছে পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা থানায় তাম্র প্রস্তর যুগের সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। মনে করা যায় যে, দক্ষিণ পশ্চিম দিক থেকে এক সময়ে বাংলাদেশে এসেছিল তাম্র প্রস্তর যুগের অনেক মানুষ; যারা উপনিবেষ্টিত হয়েছিল এই দেশে। যাদের ধরা যেতে পারে এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা। আর এক কথায় আদিবাসী। সাধারণভাবে বাংলাভাষী মানুষের মাথার আকৃতি হলো মাঝারি থেকে গোল।  উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মানুষের মতো তাদের মাথার আকৃতি লম্বা নয়। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মানুষের মাথার আকৃতি লম্বা। কিন্তু উত্তর ভারতের মানুষের মাথার মধ্যভাগ হতে দেখা যায় উঁচু। কিন্তু দক্ষিণ ভারতের মানুষের মাথা লম্বা হলেও তাদের মাথার মধ্যভাগ উঁচু হতে দেখা যায় না। অর্থাৎ উত্তর দক্ষিণ ভারতের মানবধারা এদিক থেকে হলেও ভিন্ন।

বাংলাদেশের মানুষ উচ্চতায় মাঝারি। তাদের মুখে সাধারণত দাড়ি-গোঁফের প্রাচুর্য থাকতে দেখা যায়। তাদের অধিকাংশের চোখ আয়ত। গায়ের রং শ্যামলা। তাদের অধিকাংশের গন্ডের হাঁড় উচু নয়। তাদের মুখমণ্ডল দেখে তাই মনে হয় না সমতল। কিন্তু বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের মধ্যে আছে মঙ্গোলীয় মানবধারার প্রভাব। তাদের অনেকের গালের হাড় উঁচু। অক্ষি কোটর থেকে কপাল এর কাছে নাকের উচ্চতা বেশি নয়। তাই তাদের মুখমণ্ডল দেখে অনেক সমতল মনে হয়। এটা মঙ্গোলীয় মানব ধারার বৈশিষ্ট্য। এছাড়া মঙ্গোলীয় মানবধারাভুক্ত মানুষের চোখের উপর পাতায় থাকে বিশেষ ধরনের ভাঁজ। যে কারণে তাদের চোখ দেখে মনে হয় ছোট। মঙ্গোলীয় মানবধারাভুক্ত মানুষের মুখে দাড়ি গোঁফের পরিমাণ সাধারণত হয় যথেষ্ট কম। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের অনেকের মধ্যে এইসব বৈশিষ্ট্য থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলমানদের মধ্যে।

ইসলাম একটি প্রচারশীল ধর্ম। এর উদ্ভব হয়েছিল সেমিটিক মানবধারাভুক্ত মানুষের মধ্যে। সেমিটিক মানবধারার মানুষের গায়ের রং লালচে সাদা। চুলের রং কালো। মুখের আদল উপবৃত্তাকার। নাকের উপরিভাগ কতকটা ধনুকের মত বাঁকা। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এরকম মানুষ বিশেষ চোখে পড়ে না। অর্থাৎ আমরা সেমিটিক মানবধারাভুক্ত নই। আমরা ধর্মে মুসলমান। ইসলাম ধর্ম যে শুধু বাংলাদেশের মানুষ গ্রহণ করেছে এমন নয়। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মানুষ গ্রহণ করেছে ইসলাম। যারা হলো মঙ্গোলীয় মানবধারাভুক্ত। বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া মিলে এখন হল পৃথিবীতে সবচেয়ে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল। বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ মুসলমানই সেমিটিক মানবধারাভুক্ত নন। মুসলমান বলতে কোন বিশেষ মানবধারাভুক্ত মানুষকে বুঝায় না।

ধর্ম এবং মানবধারা সমর্থক নয়। ভাষা ও মানবধারাকেও এক করে দেখা যায় না। আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি। অনেকের মতে, বাংলা হলো আর্য গোষ্ঠীর ভাষা। কিন্তু বাংলা ভাষায় ক্রিয়াপদ ছাড়াও বাক্য গঠন করা চলে। যা আর্য পরিবারের অন্য ভাষায় যায় না।আর্য বা ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারভুক্ত ভাষায় যারা কথা বলে তারা সকলে এক মানবধারাভুক্ত নয়। যেমন ইউরোপে যারা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় কথা বলে তাদের মধ্যে কম করে দেখা যায় তিনটি মানবধারা। যথা-নর্দিক(Nordic), আলপাইন(Alpine) এবং মেডিটেরিয়ান(Mediterranean)। রুশ ভাষাও ইন্দোইউরোপিয়ান পরিবারভুক্ত। কিন্তু রুশরা প্রধানত পড়ে পূর্ব-বাল্টিক(East Baltic) মানব ধারায়। তবে এরা সবাই হল বৃহৎ ককেশীয় মানবশাখাভুক্ত। ইংরেজ আমলে লোক গণনার বিবরণী ট্রাইব শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ট্রাইব বলতে বোঝানো হয় এমন লোক সমষ্টি যারা সংখ্যায় বেশি নয়। যাদের আছে একটি নিজস্ব ভাষা। যারা বাস করে সাধারণত দুর্গম বন ও পাহাড়ি অঞ্চলে। যারা নিজেদের মধ্যে অনুভব করে বিশেষ আবেগগত একতা। এবং মনে করে তাদের মধ্যে আছে উদ্ভবগত ঐক্য। অর্থাৎ এদের আদি পূর্বপুরুষ হলো এক। এদের ধর্ম বিশ্বাস হলো একই।

ইংরেজি ট্রাইব কথাটার বাংলা করা হয় উপজাতি। উপজাতি বলতে বোঝানো হয়, এরা মূল জাতি নয়। অন্য মূল জাতির মধ্যে এদের বাস। যারা এদের তুলনায় অনেক অগ্রসর। ইংরেজ আমলে সাঁওতালদের একটি উপজাতি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে অনেক সাঁওতালের বাস। কিন্তু তারা এই অঞ্চলের আদিবাসী নয়। তাদের এই অঞ্চলে নিয়ে আসে ইংরেজ নীলকর সাহেবরা; নীল চাষে সাহায্য হবে ভেবে। সেটা উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের কথা। সাঁওতালরা অধিকাংশ বাস করেছে সাবেক বিহার প্রদেশের ছোটনাগপুর বিভাগে এবং সাঁওতাল পরগনা জেলায়। যা ছিল সাবেক বিহার প্রদেশের ভাগলপুর বিভাগের একটি জেলা। কিন্তু বর্তমানে সাবেক ছোটনাগপুর বিভাগ এবং সাঁওতাল পরগনা জেলাকে নিয়ে গঠন করা হয়েছে ভারতের ঝাড়খন্ড প্রদেশ। ঝাড়খন্ড প্রদেশ সাঁওতাল ছাড়া আরও উপজাতি আছে। যেমন ওঁরাও, মুন্ডা, হো। কিন্তু এই নতুন ঝাড়খন্ড প্রদেশের সরকারি ভাষা করা হয়েছে হিন্দি; কোন উপজাতির ভাষাকে নয়। অথচ বাংলাদেশে দাবি করা হচ্ছে সরকারিভাবে সাঁওতালি ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের। সাঁওতালরা বাংলাদেশে দলে দলে খ্রিস্টান হচ্ছে। তারা ঝুঁকে পড়ছে ইউরোপীয় সংস্কৃতির দিকে। অথচ সেই একই সঙ্গে দাবি করা হচ্ছে সাঁওতালি সংস্কৃতি সংরক্ষণের।

২০০৭ সালে বাংলাদেশের এশিয়াটিক সোসাইটি ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠী’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছে। এরকম বই এশিয়াটিক সোসাইটির পক্ষ থেকে কেন প্রকাশ করা হয়েছে তা আমার বোধগম্য নয়। কারণ, বইটি পড়ে মনে হতে পারে বাংলাদেশে আছে অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী। যা আসলে আদৌ সত্য নয়। বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলায় যে আরাকান (রাখাইন) বাস করে, তাদের এই বইতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আদিবাসী। অথচ এই অঞ্চলে এদের পূর্বপুরুষেরা এসে উপনীত হয়েছে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে। অথবা উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে। এর আগে এরা এই অঞ্চলে ছিল না। মগ বলতে আমরা বাংলা ভাষায় সাধারণভাবে বুঝি আরাকান থেকে বাংলাদেশে আগত মঙ্গোলীয় মানবধারাভুক্ত মানুষকে। কক্সবাজার জেলার মহেশখালী দ্বীপে অনেক মগ বাস করে। এদের পূর্বপুরুষ এই অঞ্চলে আসে উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে।

আরাকান, যাকে এখন বলা হচ্ছে রাখাইন তা দক্ষিণ ব্রহ্মের (মিয়ানমারের) রাজা বোদবপায়া ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে দখল করে। বোদবপায়া সৈন্যরা আরাকানে অনেক অত্যাচার ও লুটপাট করতে থাকে। ফলে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে আরাকান থেকে অনেক মগ পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় কক্সবাজার ও মহেশখালীতে। মগদেরও এশিয়াটিক সোসাইটির এই বইতে বলা হয়েছে আদিবাসী। যা ঐতিহাসিক দিক থেকে আদৌ সত্য নয়। পক্ষান্তরে বলা যায় যে, কক্সবাজার, মহেশখালী, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে যেসব মগ বা  রাখাইন বাস করে তাদের বলা চলে না অনগ্রসর জনগোষ্ঠী। সাংস্কৃতিক দিক থেকে তাদের ধরতে হয় খুবই উন্নত।

বাংলাদেশের জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)গড়েছেন আদিবাসী ফোরাম। যার লক্ষ হচ্ছে তথাকথিত আদিবাসীদের নিয়ে একটি পৃথক রাষ্ট্র গড়ার। কিন্তু বাংলাদেশের সব উপজাতি কোন একটা বিশেষ ভৌগলিক এলাকায় বাস করে না। কথা বলে না কোন একটি মাত্র ভাষায়। তাদের ইতিহাস, ধর্ম বিশ্বাস, অর্থনৈতিক জীবন এক নয়। সর্বোপরি তারা সকলে এক মানবধারাভুক্ত নয়। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান জেলায় মগ (মারমা) এবং চাকমাদের মধ্যে লেগে আছে বিবাদ-বিসংবাদ। সন্তু লারমার এক রাষ্ট্রের ধারণা বাস্তবায়ন তাই সহজসাধ্য নয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশের বাংলাভাষী মানুষ হল এদেশের ভুমিজ সন্তান। তারা যুগ যুগ ধরে বাস করছে এখানে। আজকের পৃথক রাষ্ট্র বাংলাদেশ হলো তাদের সংগ্রামের ফল। এ দেশ রক্ষা করবার জন্য যুদ্ধ করতে হলে অবশ্যই তারা তা করবে। সে মনবল তাদের আছে। তারা সন্তু লারমার মত কারো হুংকারের ভয়ে ভীত হবার নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের মধ্যে বক্তৃতা দিতে গিয়ে শেখ মুজিব তাদের বলেছিলেন বাঙালি হতে। কিন্তু বর্তমানে বলা হচ্ছে যে, সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপজাতীযরা স্বাধীন হবার যোগ্য। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন হবার অর্থ দাঁড়াবে বাংলাদেশের দশ ভাগের এক ভাগ ভূমি চলে যাওয়া। বিরাট প্রাকৃতিক সম্পদ হারানো এবং সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়া। বাংলাদেশের মানুষ সেটা হতে দিতে পারে না। নানা ষড়যন্ত্র চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের অনেক উপজাতি খ্রিস্টান হয়েছে। কিছু বিদেশী খ্রিস্টান মিশনারী নাকি চাচ্ছে পার্বত্য অঞ্চলকে পূর্ব তিমুরের মতো একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্রে পরিণত করতে। সন্তু লারমা কাদের এজেন্ট আমরা জানি না। আমরা জানি না বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কাদের অর্থে চলেছে। বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি এমন অনেক কিছু করছে যা বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূলে হচ্ছে না।আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের একাংশের কার্যকলাপ যেন হয়ে উঠতে চাচ্ছে খুবই স্বদেশ বিরোধী।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে সাঁওতাল নিয়ে বাম রাজনীতি নতুন নয়। ১৯৫০ সালে কমিউনিস্ট ইলা মিত্র ও তার স্বামী রমেন মিত্র চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার (তখন মহকুমা) নাচোল থানায় ঘটান সাঁওতাল বিদ্রোহ। সাঁওতালরা নাচোল থানার তিনজন কনস্টেবল ও দারোগাকে হত্যা করে। জনগণ ক্ষেপে যায় সাঁওতালদের ওপর। তদানীন্তন সরকার নাচোলে সৈন্য পাঠায় সাঁওতাল বিদ্রোহ দমন করতে। রমেন মিত্র দেশ ছেড়ে পালান। কিন্তু তার স্ত্রী ইলা মিত্র ধরা পড়েন সরকারি সৈন্যদের হাতে। তার বিচার হয় রাজশাহী আদালতে। তিনি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেন সাঁওতালরা অশিক্ষিত, বন্য, বর্বর। তিনি দারোগা ও কনস্টেবলকে হত্যা করতে বলেননি। এই হত্যার জন্য সাঁওতালরা কেবল দায়ী। তিনি নন। এখন আবার বামরা সাঁওতালদের নিয়ে রাজনীতি করতে চাচ্ছেন। জানিনা সাঁওতালদের ক্ষেপিয়ে তাদের আবার কোন বিপদের মধ্যে নিয়ে ফেলা হবে।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, নাচোলে সাঁওতাল বিদ্রোহ সম্বন্ধে পরে কমিউনিস্টরা বলেছিল যে, এটা ছিল সংকীর্ণ বাম রাজনৈতিক বিচ্যুতির ফল। বৃহত্তর জনসমাজকে বাদ দিয়ে কোনো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে নির্ভর করে সমাজে বিপ্লব হতে পারে না। আজ সারা পৃথিবীতে কমিউনিস্টরা আর আগের মত রাজনৈতিক শক্তি নয়। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে। রাশিয়ার মানুষ চাচ্ছে উদার বহুদলীয় গণতন্ত্র। সে দেশে কমিউনিস্টরা আর ক্ষমতায় নেই। চীনে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আছে। কিন্তু তারা পরিত্যাগ করেছে কমিউনিস্ট সমাজ দর্শন। হয়ে উঠেছে উগ্র হান চীনা জাতীয়তাবাদী। চীনে এক দলীয় কমিউনিস্ট শাসন আর কতদিন টিকবে আমরা তা জানি না। চীনে বিদ্রোহ করছে উইঘুর মুসলমানরা। বিদ্রোহ করছে তিবক্ষতিরা। তারা মানতে চাচ্ছে না হান চীনা আধিপত্য। তবে চীন, রাশিয়া আমাদের ভাবনার বিষয় নয়। আমাদের ভাবনার বিষয় বাংলাদেশ। যা হোক এবার বাংলাদেশ সরকার সরকারিভাবে আদিবাসী দিবস পালন করল না। এর জন্য তাদের জানাতে হয় মোবারকবাদ ।

♦ এবনে গোলাম সামাদ- প্রখ্যাত অধ্যাপক,  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জনপ্রিয় কলািমিস্ট

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আদিবাসী, এবনে গোলাম সামাদ, বাংলাদেশের আদিবাসী
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten − 9 =

আরও পড়ুন