মিশন হিল ট্র্যাক্টস

fec-image

কমরেড মাহমুদ

নীলগিরি যেতে হবে থানচির পথ ধরে। বান্দরবন সার্কিট হাউস আর জেলা পরিষদ ডাক বাংলোর বিশাল টিলার পাশ ঘেঁষে একেবেকে শহর ছেড়ে বেড়িয়ে গেছে রাস্তাটা। বিশ মিনিটের মাথায় একটি লোহার পুল, তার পাড়েই হাতের ডান পাশে চোখ গেলে আটকে গেল একটি ঝর্নার দিকে। ফেরার পথে ঝর্নার কাছে দাঁড়াবে বলে মিনহাজ ভেবে নিল। পথ পিছনে রেখে আরো দূরের পাহাড়ের হাতছানিতে এগিয়ে চলছে গাড়ি। পথটা যেন প্রিয়ার গলার মালার মত পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে পাহাড় গুলিকে আটকে ধরেছে। কোথাও কোথাও একেবারে খাড়া হয়ে উঠে গেছে আকাশ পানে।

সিটের সাথে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ আছে মিনহাজ। একটি গুরু দায়িত্ব নিয়ে সে এখানে এসেছে। অথচ কিছুই বুঝতে পারছেনা কোথার থেকে সে কাজ শুরু করবে। আজ তিন দিন ধরে সে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। চোখ বন্ধ রেখেই ড্রাইভারকে মিনহাজ জিজ্ঞেস করলো তোমার নাম কি?
উত্তরে ছেলেটি বললো সুমন।

সুমন তুমি ঘনঘন গিয়ার চেঞ্জ করছো কেন? এইসব রাস্তায় ফোর গিয়ারেই পেরুতে হয় অনেক পথ। চোখ বন্ধ রেখেই কথা গুলো বলল মিনহাজ। পঁচিশ বছর বয়সী বাঙ্গালী যুবক সুমন একটু অবাক হয়ে ব্যাক ভিউয়ারের দিকে একবার তাকিয়ে যাত্রীটাকে দেখে নেয়।

পাহাড়ের শরীর খুড়ে রাস্তাটা অসমান হয়ে একেবেকে চলছে কোন এক অজানার পথে। মাঝে মাঝে একেবারে প্রায় ৯০ ডিগ্রী তীক্ষ্ণ বাক। একেবারে মৌন পাহাড়ের বিপুল আড়াল। অন্যপাশে অতলে নেমে যাওয়া ভয়ংকর খাড়ি। চলন্ত গাড়ি থেকে বুঝার উপায় থাকেনা এই খাঁড়ির নীচে শুরু কোথা থেকে। সুমনের গাড়ির গতি দেখেই নিশ্চিত হওয়া যায় এই পথ তাঁর খুব চেনা।

মিনহাজ তাঁকে বললো গাড়িটা একটু আস্তে চালাতে, যাতে দুপাশের সৌন্দর্যকে সে একটু উপলব্ধি করতে পারে। অনুরোধে মনে হয় কাজ হলো, সুমন তাঁর গাড়ির গতি কমিয়ে দিল। মিনহাজ দেখছে পাহাড়ের অপারে পাহাড়, সবুজের ভিতরের সবুজ।

বেশিক্ষণ সে এভাবে দেখতে পেলনা। চিম্বুক পাহাড় গুলোর উপর এক পাহাড়ে মনে হচ্ছে আগুনের ফুলকি উঠছে। অবাক হয়ে মিনহাজ বলে উঠে,  গাড়ি স্টপ… ওখানে আগুন কিসের সুমন?
সুমন একটা ছোট নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে, উঠে মনে হয় কোন বাঙ্গালী পল্লীতে আগুন দিয়েছে।
: বাঙ্গালী পল্লী মানে? কিভাবে বললে এটা বাঙ্গালী পল্লী? মিনহাজ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো।
: স্যার আমি এই এলাকার ছেলে। আমি জানি কোথায় কারা থাকে, উত্তরে জানালো সুমন।
: সুমন আমাদের দ্রুত সেখানে যাওয়া উচিৎ। হয়তো আমারা কোন সাহায্য করতে পারি। দরকার হলে আমি তোমাকে দেরি করানোর জন্য আলাদা টাকা দিবো, বলল মিনহাজ।                                                        : স্যার এই গ্রামের পাশের গ্রামেই আমাদের বাড়ি। আপনি না বললেও আমি আপনাকে এখন চেষ্টা করতাম অন্য কোন গাড়িতে তুলে দেওয়া যায় কিনা। আমার মনে হয় তাঁরা আগুন লাগিয়ে পাশের গ্রামের দিকে এগিয়ে গেছে। এখন আমাদের গ্রামেও আগুন দিতে পারে। স্যার আমাদের আর দেরি না করে এখনি যাওয়া দরকার। এক নিশ্বাসে কথা গুলো বলল সুমন।
: এরা কারা? জিজ্ঞেস করলো মিনহাজ।
: পাহাড়ী আদিবাসী সন্ত্রাসী। এই আদিবাসীরা এক সময় এখানে বসবাসরত বাঙ্গালীদের নিশ্চিন্ন করে দিবে মনে হয়.. উত্তরে বললো সুমন।
: তাঁরা আদিবাসী কিভাবে হলো সুমন? আদিবাসী তো তোমরা, এখানকার বাঙ্গালীরা। এরা এখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।
: কি যে বলেন স্যার। এরা নিজেদের আদিবাসী দাবি করে আমাদের এখান থেকে বের করে দিতে চায়। আমাদেরকে সেটেলার বলে তাঁরা।
: দ্রুত চলো সেখানে, আগে তোমাদের গ্রামের দিকে যাও। এই গ্রামে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, এখন যদি সত্যি তোমাদের গ্রামে হামলা করে তাহলে তাদের বাঁধা দিতে হবে। পরে সময় পেলে তোমাকে আদিবাসী কি আমি বুঝিয়ে বলবো, বললো মিনহাজ।

গাড়ি ছুটে চলছে অন্য এক বাক ধরে। আসলেই সুমন ছেলেটা ভাল গাড়ি চালানো শিখেছে। এমন ভয়ংকর রাস্তা দিয়ে ঝড়ের বেগে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে।
: স্যার ঐ যে আমাদের গ্রাম, ঢুকে পড়েছে তাঁরা আমাদের গ্রামে। বলল সুমন।
মিনহাজ দূর দেখেই লক্ষ করলো একটু ধোঁয়ার আভা। যেভাবেই হোক এই গ্রামে আগুনে পুড়ে যাওয়ার আগেই পৌঁছাতে হবে। মনে মনে আল্লাহর সাহায্য চাইলো মিনহাজ। এই তো চলে এসেছে প্রায়, আর একটু।

মিনহাজরা যখন পৌঁছে ততক্ষনে দুষ্কৃতিকারীরা এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। চারিদকে আগুন আর আগুন। বাঙ্গালী পরিবার গুলো এক সাথে চেষ্টা করছে হাতে হাতে আগুন নেভাতে। শিশুদের কান্নার শব্দ এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে পৌঁছে যাচ্ছে। আগুন নেভানোর মাঝে সবাই অবাক হয়ে দেখতে পায় একজন যুবক একটি বাসার চালার উপর দাঁড়িয়ে একটি টিন খুলে ফেলে সেখান থেকে টেনে একটি শিশুকে বের করে আনছে। এই বাসার চারিদিকে আগুন লেগে যাওয়ায় দরজা দিয়ে কারো ঢোকা সম্ভব ছিলনা। মাঝে মাঝে আগুণের ফুলকি টিন ভেদ করেও উঠে আসছে। শিশুটির পরে একজন মহিলাকেও অনেক কষ্টে বের করে আনে। মা শিশু দুজনেই দগ্ধ হলেও বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। সবাই ছুটে আসে শিশু উদ্ধার করা যুবকের কাছে। জানলো এই যুবকের নাম মিনহাজ। সুমন সংক্ষেপে তাদের এখানে আসার ঘটনা বলে মিনহাজকে পরিচয় করিয়ে দিল।

পাশের বাঙ্গালী পল্লীটা থেকেও মিনহাজ একবার ঘুরে এসেছে। সব তছনছ করে দিয়েছে এলাকা ধরে। আগুনে পুড়ে ৭ জন মারা গেছে প্রথম গ্রামটায়, এর মাঝে ৫ জনই শিশু। দিনে দুপুরে এমন ঘটনা কেউ ঘটাতে পারে কেউ চিন্তাও করেনি। আগে থেকে কেউ বুঝতে না পারায় এই গ্রামে ক্ষয় ক্ষতি বেশি হয়েছে। কেউ বাঁধা দিতে আসতে পারেনি, কারন তারা ছিল সশস্ত্র। ড্রাইভার সুমনের গ্রামে কম ক্ষতি হয়েছে। তারা সতর্ক হওয়ায় দুষ্কৃতিকারীরা বেশিক্ষণ ধ্বংসযজ্ঞ না চালিয়ে সরে পড়েছে।

সারাদিন এ গ্রাম সে গ্রামে দৌড়াদৌড়ি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে মিনহাজ। রাতের বেলা শরীরটাও খুব খারাপ লাগছে। ফিলিস্তিনের নির্মমতার সাথে এই নির্মমতার কোন পার্থক্য সে করতে পারছেনা। কেন এমন কাজ তারা করলো তাঁর কোন সদুত্তর কেউ দিতে পারে না।

কেউ বলে কিছুদিন আগে মোটা অংকের চাঁদা চেয়েছিল উপজাতি সন্ত্রাসীরা, আমরা দিতে পারিনি, হয়তো একারণে এমন করে থাকতে পারে। কেউ বলে আমাদের এই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করার জন্যে করেছে এই কাজ।

সকালে মিনহাজ সুমনকে দিয়ে কিছু জাতীয় আর আঞ্চলিক পত্রিকা কিনে আনায়। জাতীয় পত্রিকাগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সে এই খবর কোথাও দেখতে পায় না..!! দেশের মাঝে এতবড় একটা ম্যাসাকার হয়ে গেল অথচ এটা খবরে এলো না!!!! ভাবতেই পারেনা মিনহাজ….!!

স্থানীয় পত্রিকার ভিতরে একটাতে এই গ্রামের খবরটা দেখতে পায় খুব ছোট করে। মনে হচ্ছে এই যায়গাটা খালি থেকে যাওয়ায় তাঁরা খবরটা ছেপেছে, নচেৎ তারাও দিতো না। কিন্তু সব থেকে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এখানে খবরটা এসেছে একেবারে ভিন্নভাবে। ভিতরের দিকে নিউজটাতে এসেছে বাঙ্গালি পল্লীতে অগ্নিকাণ্ড, রান্নাঘর থেকে আগুনের উপত্তি। মিনহাজের কপালে একটি বিরক্তির ভাঁজ পড়ে, সে একেবারে ভাষা হারিয়ে ফেলে।

: কি হয়েছে- সুমন জিজ্ঞেস করলে মিনহাজ তাঁর দিকে খবরটি এগিয়ে দেয়।

একটি বাঁকা হাসি দিয়ে সুমন পত্রিকা থেকে চোখ ফিরিয়ে আনে।

: আপনি এটা দেখে অবাক হয়েছেন?
: অবাক হবো না? এমন জলজ্যান্ত মিথ্যা খবর আমাদের দেশী পত্রিকাতে কিভাবে সম্ভব? পাল্টা জিজ্ঞেস করে মিনহাজ।
: আমি অবাক হই না। আমি ছোট কাল থেকেই এইসব দেখে আসছি। কারণ সকল জাতীয় পত্রিকার সাংবাদিক বেশিরভাগ উপজাতি, আর আন্তর্জাতিক পত্রিকার শতভাগ উপজাতি। এটা আজো কেউ বদলাতে পারেনি।
এক দম নিয়ে আবারো শুরু করে সুমন।

: কোন বাঙ্গালির সম্ভাবনা দেখা দিলে সে কিছুদিন পরে হারিয়ে যায়। তাই এখন আর কেউ সাংবাদিক হবার চেষ্টাও করে না জীবনের ভয়ে। তাই আমাদের এখানকার কোন খবর দেশবাসী জানতে পারে না। কোন পত্রিকায় আমাদের কান্নার কথা আসেনা। আমরা এখন কান্না করি শুধু নিজেদের মনকে শান্ত করতে, কান্নাকাটি শেষ হলে আবার যার যার কাজে ফিরে যাই, নতুন করে প্রস্তুতি নিতে থাকি নতুন কোন কান্নার জন্যে।

মিনহাজ দাঁতে দাঁত চেপে কিছুক্ষণ বসে থাকে। চুপচাপ কি যেন ভাবে কিছুক্ষণ। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তার করণীয় কি? এখানে আসার আগে সে জানতো না কিভাবে কাজ শুরু করবে, কিন্তু আল্লাহ্‌ তাকে সেই পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। সে কাজের একটা উৎস খুঁজে পেয়েছে। এবার সে পাল্টা আঘাতের জন্য মনে মনে তৈরি হতে থাকে।

(চলবে)

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen + 10 =

আরও পড়ুন