রাঙামাটিতে জেএসএস’র সমাবেশে যোগ দিচ্ছে ইউপিডিএফ : পাল্টে যাচ্ছে পার্বত্য রাজনীতি

পার্বত্য অঞ্চলে চলা নব্বই দিনের যুদ্ধ বিরতি শেষ: চুক্তির মেয়াদ বাড়তে পারে আরো তিন মাস: ঐক্যের প্রচেষ্টা চলছে জোরেসোরে

জেএসএস ইউপিডিএফ

আরিফুল হক মাহবুব, কাউখালী (রাঙ্গামাটি):

অভিন্ন দাবীতে আন্দোলনরত পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন ইউপিডিএফ ও জেএসএস’র মধ্যকার অনানুষ্ঠানিক নব্বই দিনের যুদ্ধ বিরতির মেয়াদ শেষ হয়েছে ৩০ নভেম্বর। নতুন করে এ যুদ্ধ বিরতির মেয়াদ আরো তিন মাস বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সংগঠন দু’টির উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্যরা। তবে আপাতত সংঘাতের পথ পরিহার করে যুগপত আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরী করতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দু’দলের নেতারা। বিশেষ করে আগামী পৌরসভা নির্বাচনে এই সমঝোতা কাজে লাগাতে চায় দুই দলই।

কিন্তু এখনও পর্যন্ত এক পক্ষ অন্য পক্ষকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারতে পারছে না। বিশেষ করে দখলাধীন এলাকা ও চাঁদার স্পট ভাগাভাগি নিয়ে দুই দলের মধ্যে সমঝোতায় পোঁছাতে না পারা এর প্রধান কারণ করে জানা গেছে। তবে দুই পক্ষের একত্রীকরণের বিষয়টি যে জোরালোভাবেই চলছে এই প্রথম পার্বত্যনিউজের মাধ্যমে মিডিয়ার কাছে স্বীকার করলেন জনসংহতি সমিতি কাউখালী উপজেলা শাখার সভাপতি সুভাস চাকমা।

এই বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলের মধ্যেই বুধবার  ২ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটিতে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)’র ডাকা শান্তি চুক্তির ১৮তম বর্ষপূর্তি সমাবেশে বিপুলভাবে যোগ দিতে যাচ্ছে দীর্ঘ সময় ধরে জেএসএস’র সাথে সংঘাত হানাহানিতে লিপ্ত থাকা প্রসিত বিকাশ খিসার ইউপিডিএফ। এমন খবর পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

এ বিষয়ে সংগঠন দু’টির উচ্চ পর্যায়ের নেতারা মুখ খুলতে না চাইলেও তাদের কথাবার্তায় ঐক্যের সুর পরিলক্ষিত হচ্ছে। সংগঠন দু’টির ঐক্যে পাল্টে যেতে পারে পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক মেরুকরণ। তবে পর্দার আড়ালে চলা রহস্যে ঘেরা তাদের এমন গোপন চুক্তিতে আশ্বস্ত হতে পারছে না সাধারণ মানুষ। ফলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা পিছু ছাড়ছে না তাদের।

সম্প্রতি পার্বত্য অঞ্চল জুড়ে যৌথবাহিনীর কম্বিং অপারেশনের দরুণ কোনঠাসা হয়ে পড়া দু’টি আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ-জেএসএস’র ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত নিরসনে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নব্বই দিনের গোপন শান্তিচুক্তিতে উপনীত হয়। আগষ্টের শেষ দিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সংগঠন দু’টির উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে বিশ্বস্ত একাধিক সূত্র প্রতিবেদককে নিশ্চিত করে। যার মেয়াদ শেষ হয় ৩০ নভেম্বর।

অস্ত্র বিরতির মেয়াদ নতুন করে বৃদ্ধি করা না হলেও ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যপারে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয় বলে জানা যায়। তার সূত্র ধরে সন্তু লারমার অসহযোগ আন্দোলনে ইউপিডিএফ’র সমর্থন প্রত্যাশা করা হয়।

 তারই অংশ হিসাবে প্রাথমিক ধাপ উত্তীর্ণ করতে ২ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটিতে অনুষ্ঠিত শান্তিচুক্তির ১৮ বছর পূর্তি উপলক্ষে ডাকা জনসংহতির সামাবেশে সর্বাত্মক অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে প্রসিত বিকাশ খিসার ইউপিডিএফ। দু’দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন তথ্য পার্বত্যনিউজ প্রতিনিধিকে নিশ্চিত করেছে। অপরদিকে একই দিনে রাঙ্গামাটিতে শান্তিচুক্তির ১৮ বছর পূর্তি উপলক্ষে পূর্ব ঘোষিত সামাবেশের আয়োজন করেছে রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামীলীগ। এই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভীর যোগ দানের কথা রয়েছে। 

রাঙ্গামাটির সমাবেশ সফল করতে কাউখালী জুড়ে জনসংহতি সমিতির নেতা কর্মীদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মত। গত আঠারো বছরে উপজেলা সদরে জনসংহতি সমিতি প্রকাশ্যে কোন কার্যক্রম চালাতে পারেনি। এবারই প্রথম জেএসএস প্রকাশ্যে কাউখালী সদরে প্রচার প্রচারণা চালায়। পুরো কার্যক্রমে ইউপিডিএফ’র মৌন সমর্থন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সমাবেশে কাউখালী থেকে বিশ হাজার লোকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন জেএসএস নেতারা। রাঙামাটির অন্যান্য উপজেলা ও তিন পার্বত্য জেলা থেকেও একইভাবে লোক আনার প্রস্তুতি নিয়েছে জেএসএস। ফলে একই দিনে দু’টি বড় সমাবেশ ঘিরে পুরো পার্বত্য অঞ্চল জুড়ে আতঙ্ক ও এক ধরণের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।

সংগঠন দু’টির একত্রীকরণের বিষয়ে কাজ চলছে বলে স্বীকার করেছেন জনসংহতি সমিতি কাউখালী উপজেলা শাখার সভাপতি সুভাস চাকমা। তিনি জানান, বড় ধরণের বিপদ থেকে রক্ষা পেতে হলে সংগঠন দু’টিকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া গতি নেই। তিনি জানান, সংঘাত নিরসনে চলা বৈঠক শুধু দেশের মাটিতে নই, প্রয়োজনে আমিরাকা ও লন্ডনে বসেও হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।

সূত্রে জানা গেছে, সমঝোতার আলোচনায় জেএসএস থেকে ইউপিডিএফকে প্রতীকিভাবে হলেও কিছু অস্ত্র জমা দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। এ নিয়ে ইউপিডিএফ’র মধ্যে মতভিন্নতা সৃষ্টি হয়। ইউপিডিএফ’র একটি গ্রুপ এতে রাজী হলেও তারা জেএসএস’র মতো সরকারের হাতে প্রতীকি  অস্ত্র সমর্পনের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু জেএসএস তাতে রাজী নয়। জেএসএস দাবী করে অস্ত্র তাদের কাছে সমর্পন করতে হবে। কিন্তু এ প্রস্তাবে ইউপিডিএফ’র কেউ রাজী হয়নি।

সুভাস জানান, এক্ষেত্রে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ব্যাপারটা মূখ্য বিষয়। এখনো কেউ কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না। তিনি জানান, ঐক্যের ক্ষেত্রে এই মূহুর্তে সবচেয়ে বড় বাঁধা হচ্ছে ইউপিডিএফ’র অস্ত্র জমা দেবে কিনা? যদি দেয় তাহলে কার কাছে জমা দেবে। সরকারের কাছে, না কি জনসংহতি সমিতির কাছে। এ নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে।

তাছাড়া জনসংহতি সমিতি কর্তৃক পার্বত্য অঞ্চলে ১৩টি ভাষার লোকদেরকে দেশে বিদেশে একটি ভাষার (চাকমা) ভাষী হিসেবে উল্লেখ করার কারণেও ঐক্যের ক্ষেত্রে বড় বাঁধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে ইউপিডিএফ’কে কোন ক্রমেই অস্ত্র-শস্ত্র জমা দেয়ার বিষয়ে রাজি করানো যাচ্ছে না। ফলে ঐক্যের বিষয়ে সব দিক থেকে অগ্রসর হওয়া গেলেও বড় একটি জায়গায় এসে ভেস্তে যেতে পারে সব উদ্যোগ এমনটাই আশংকা করছেন পাহাড়ের সাধারণ মানুষ।

ইউপিডিএফ’র প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক কেন্দ্রীয় মূখপত্র নিরন চাকমা সংগঠন দু’টির ঐক্যের বিষয়টি অস্বীকার করলেও শান্তি চুক্তি উপলক্ষে তারই স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে প্রসিত বিকাশ খীসা বিবৃতি দিয়েছেন। ‘পার্বত্য চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন, শান্তি প্রতিষ্ঠা নয় হিসেবে উল্লেখ করে খীসা বলেন, জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের দাবি। বুধবার রাঙ্গামাটিতে অনুষ্ঠিত হওয়া শান্তিচুক্তির বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে সর্বসাধরনের অংশগ্রহণে ইউপিডিএফ’র পক্ষ থেকে কোন বিধিনিষেধ নেই বলেও জানিয়েছে নিরন চাকমা।

ইউপিডিএফ-জেএসএস’র ঐক্যের গুঞ্জনে পার্বত্যনিউজের কাছে মিস্ত্র প্রতিক্রিয় ব্যক্ত করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক এমপি ও উন্নয়নের বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া। তিনি জানান, ইউপিডিএফ-জেএসএস’র ঐক্যে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসবে এমনটি ভাবার কোন কারণে নেই। নতুন করে নতুন উদ্যমে অস্থিরতা বেড়ে যাবে। এটা সরকারের উপর, রাষ্ট্রের উপর এবং ভূখন্ডের জন্য হুমকি হয়ে দাড়াতে পারে। কোনঠাসা হয়ে পড়তে পারে জাতীয় রাজনীতি।

তিনি জানান, আওয়ামীলীগ-বিএনপির রাজনৈতিক ইস্যুতে এক হতে পারবে না ঠিক, কিন্তু পার্বত্য অঞ্চলে জাতীয় ইস্যুতে নুন্যতম কতগুলি বিষয়ে এক হতে না পারলে বড়ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীকে। সরকারের উচিৎ দেশের অন্যান্য স্থানের মত যৌথ বাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলকে অস্ত্রমুক্ত করা। সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা।

এদিকে কাউখালী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও প্রবীন আওয়ামীলীগ নেতা কালা মিয়া জানান তাদের ঐক্যে পার্বত্য অঞ্চলে কোনক্রমেই শান্তি ফিরে আসবেনা। তিনি জানান, শান্তি তখনই ফিরে আসবে, যখন তারা অস্ত্র-শস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র থেকে যাবে, আর আমরা নিরস্ত্র হয়ে তাদের সাথে লড়াই করে যাবো এমনটা হলে শান্তি ফিরে আসার কোন সুযোগ নেই। তারা যদি স্বেচ্ছায় নিরস্ত্র না হয়, সরকারের উচিৎ হবে সারা দেশের মত যৌথবাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চল থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ব্যবস্থা করা।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + 9 =

আরও পড়ুন