মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান কেন?

fec-image

আমি আমার পুর্বের লেখায় বলেছিলাম মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা সমস্যার সৃষ্টি করেছে অং সান সুচি সরকারকে দুর্বল করে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরতে চায়। হলোও তাই। কেন সেনাবাহিনী এতো তাড়াতাড়ি ক্ষমতা গ্ৰহণ করলো ব্যখ্যার দাবি রাখে। অত্যাচার করে একটি গণহত্যার মাধ্যমে রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের বের করে দেয় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এর পরের ঘটনা সবার‌ জানা।

গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা রুজু করার পরে তা মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যায়। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে সেনাবাহিনীর পক্ষে অবস্থান নেন। অবশেষে মিয়ানমার সেনাবাহিনী Made a monkey of her. কেন? কারণ সেনাবাহিনী দেখছে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায়ে যে বিষয়গুলি সামনে এসেছে তা হলোঃ ১। জেনোসাইড। ২। রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা বলে আখ্যায়িত করা। ৩। সামরিক বাহিনীর ভায়োলেন্সের শিকার রোহিঙ্গারা।

এই সব অপরাধের জন্য ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে যদি মিয়ানমারের বেসামরিক সরকার পশ্চিমা‌ শক্তির কাছে নতি স্বীকার করে অপরাধী জেনারেলদের তাদের হাতে তুলে দেয়। International Court of Justice at The Hague has ordered Burma to “take all measures within its power” to protect Rohingya Muslims from genocide. The court issued the ruling Thursday, calling the 600,000 Rohingya remaining in Burma, also known as Myanmar, quote, “extremely vulnerable” to military violence.Jan 27, 2020.

মিয়ানমার সেনাবাহিনী সন্দিহান হয়ে পড়ে যে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে অং সান সুচি যদি সেনাবাহিনীকে চীরতরে মিয়ানমারে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠানের সবধরনের ভবিষ্যত সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করতে জেনারেলের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের জন্য তুলে দেয় তবে সেনাবাহিনীর ম্যাংগো এ্যান্ড গানিব্যাগ উভয় যাবে। সেই ভয় থেকে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নির্বাচনে বিজয়ী অং সান সুচিকেই সম্ভবত চীরতরে ক্ষমতার বলয়ের বাইরে নিক্ষেপ করে আপাতত নিজেদেরকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করলো জেনারেলরা।

এখন সময় বলবে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ আসলে কি চায়? এবং কোন পথে অগ্রসর হয়? তবে রোহিঙ্গা সমস্যার আশু সমাধানের সব পথ বোধকরি রুদ্ধ হয়ে গেলো আপাতত। এই অভ্যত্থানে কে লাভবান হলো? আমার ধারনা এর মূল বেনিফিসিয়ারি হলো চীন। মিয়ানমার এখন চীনের প্রটেকশনে বাঁচতে চাইবে পশ্চিমা বিশ্বের সেঙ্কশনের হাত থেকে। চীন সব সময় চেয়েছে বঙ্গপোসাগরে তাদের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে চীনের প্রতি নির্ভরশীল করে চীন তার সেই ইচ্ছাকে পরিপূর্ণতা দিলো এমন ধারনা করি। এমন আঞ্চলিক জিও স্ট্রাটেজিক উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ভারত যে থ্রেটেন্ড ফিল করবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এদিকে দক্ষীণ চীন সাগরের দক্ষিন পূর্ব ও দক্ষিণ পশ্চিমের দেশগুলোতে নতুন সমিকরণ হয়তো লক্ষ্য করা যাবে আমেরিকার নতুন প্রশাসনের ছত্রছায়ায়।

এদিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান কি হওয়া উচিৎ সেবিষয়ে সিদ্ধান্তের আসার পূর্ব পর্যন্ত একটি নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখা সমীচিন মনে করি। মিয়ানমারের পূর্বের দেশ থাইল্যান্ডে বেসামরিক পোশাকে সামরিক সরকার ক্ষমতায়। মিয়ানমারের পশ্চিম সীমান্তে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের অভ্যুত্থানের অভিঘাত তরঙ্গকে গভীর পর্যবেক্ষণে রেখে তা এবজর্ব করতে হবে। যে রোহিঙ্গাদের নিয়ে এতো কাঠখড় পুড়ছে তারা এখন নির্যাতিত হয়ে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একধরনের যুদ্ধপ্রবন হয়ে পড়লো। কারণ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ক্ষমতায় টিকে থাকার চালের ঘুঁটি রোহিঙ্গাদের সাথে এখন খোদ বাংলাদেশও তাতে অন্তর্ভুক্ত হলো বলে মনে হচ্ছে।

তবে এই অভ্যুত্থানের সাথে যে বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসবে সেগুলো হলোঃ ১। মিয়ানমারের উপরে পশ্চিমা অর্থনৈতিক সেঙ্কশন। ২। রোহিঙ্গাদের নিয়ে জেনোসিইড সংক্রান্ত আলোচনা। ৩। দক্ষিণ চীন সাগর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। এ নিয়ে দক্ষিণ চীন সাগরে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে আশ্চর্য হবোনা?

 

লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ রাইফেলস

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 − 3 =

আরও পড়ুন