কাপ্তাই বনে শোভা পাচ্ছে শতাধিক শতবর্ষী ‘মা’ গাছ

fec-image

বনখেকো ও পাচারকারীদের লোলুপ দৃষ্টিসহ নানা প্রতিকূলতার মাঝেও পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের কাপ্তাই বন রেঞ্জে শতাধিক ‘মাদার ট্রি’ (মা গাছ) সন্ধান মিলেছে। এরমধ্যে অনেকগুলো গাছের আয়ুষ্কাল  প্রায় ১০০ বছর। মাদার ট্রি বলতে ৪০ থেকে ১০০ বছর বয়সী বনের সবচেয়ে পুরোনো এবং বড় গাছগুলোকে বোঝায়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় ‘মাদার ট্রি’ ভূমিকা অপরিসীম। মাদার ট্রি হলো বনের প্রাণ।

বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কাপ্তাই বন রেঞ্জ এলাকায় টিকে থাকা মাদার ট্রি গুলো হলো-গর্জন, পীতরাজ, ছাতিয়ান, শিমুল, চন্দুল, রং-গামার, অশ্বথ, সুরুজ, বান্দরহোলা, চিকরাশি, বাটনা,  গুটগুটিয়া, রক্তন, লোহাকাঠ, পুতিজাম, হুক্কানালি, উরিআম, জগডুমুর, ভাদি, চাপালিশ উল্লেখযোগ্য।

কাপ্তাই বন রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক স্বাধীন বলেন, অনেকের ধারণা কাপ্তাই রেঞ্জে মাদার ট্রি হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে আশার আলো হচ্ছে, রেঞ্জের আওতাধীন বনের বিভিন্ন অংশে সার্ভে করে অন্তত ১০০টি শত বছরের পুরনো মাদার ট্রি’র সন্ধান পাওয়া গেছে। কাপ্তাই বন রেঞ্জের সীতাপাহাড় ছাড়াও এই মাদার ট্রি দেখা পাওয়া গেছে রামপাহাড়সহ কাপ্তাই রেঞ্জের গহীন অরণ্যে। যে গাছগুলো একেকটির বয়স ৫০-১০০ বছরের অধিক। সুঠাম দেহী, ডালপালা সমহারে বেষ্টিত ও সুস্থবীজ উৎপাদনকারী হিসেবে বেশ পরিচিত এসব ‘মাদার ট্রি’।

এ বন কর্মকর্তা আরও বলেন, বর্তমানে কাপ্তাই বন রেঞ্জে সংরক্ষণ করে রাখার মতো অনেকগুলো পরিবেশগত গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির মাদার ট্রি বেঁচে রয়েছে। এসব মাদার ট্রি থেকে বীজ সংগ্রহ করে পুরো কাপ্তাই উপজেলাকে সবুজে ভরিয়ে দেওয়া সম্ভব।

রেঞ্জ কর্মকর্তা ওমর ফারুক স্বাধীন জানান, ফরেস্ট বিভাগের লোকজন বনে গিয়ে ‘মাদার টি’্র সুরক্ষায় দেখভাল করছে। যেখানে সার্বক্ষণিক নির্দেশনা ও তত্বাবধান করে যাচ্ছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এসএম সাজ্জাদ হোসেন।

তিনি বলেন, এসব গাছ টিকে থাকলে বন টিকে থাকবে। এসব গাছের সুরক্ষায় বনবিভাগ নিয়মিত টহল জোরদার করে গাছগুলো পরিচর্যা করে যাচ্ছে।  শত বছরের গাছগুলো রক্ষা করার জন্য বনবিভাগের পাশাপাশি সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। বন উজাড় কিংবা বনের গাছ নিধন থেকে অসাধু মানুষদের সরে আসতে হবে। মাদার ট্রি না বাঁচলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। তাই বন সুরক্ষায় সকলকে একযোগে কাজ করে যেতে হবে যোগ করেন তিনি।

জানা গেছে, মাদার ট্রি কেবল একটি বড় গাছ নয়, এটি বনের ইকোসিস্টেমের কেন্দ্রবিন্দু। এর প্রধান কাজ হচ্ছে পুষ্টি ও তথ্য আদান-প্রদান করা। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, মাটির নিচে ছত্রাকের এক ধরনের নেটওয়ার্ক থাকে। একে বলা হয় ‘কাঠের প্রসস্থ ওয়েব’। মাদার ট্রি এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বনের ছোট ও দুর্বল চারা গাছগুলোকে চিনি, জল ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাঠায়। সে সাথে গভীর অরণ্যে যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছানো কঠিন, সেখানে মাদার ট্রি তার বিশাল পত্রপল্লবের ফাঁক দিয়ে আলোর ব্যবস্থা করে এবং নিজের শিকড় থেকে পুষ্টি পাঠিয়ে ছোট চারাগুলোকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।

যখন কোনো গাছ পোকা বা রোগে আক্রান্ত হয়, তখন মাদার ট্রি সেই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্য গাছগুলোকে রাসায়নিক সংকেত পাঠিয়ে সতর্ক করে দেয়, যাতে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে পারে। তাছাড়া মাদার ট্রি প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখে, যা পুরো এলাকার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। একটি মাদার ট্রি মারা গেলে বা কেটে ফেলা হলে কেবল একটি গাছ নষ্ট হয় না; বরং পুরো বনের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: কাপ্তাই, মা গাছ, রাঙামাটি
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন