ফিচার : বছরে আয় ১৫ লাখ টাকা

চাকরি ছেড়ে কৃষিতে সফল উদ্যেক্তা প্রুনুমং

fec-image

প্রুনুমং মারমা ৪২। পেশা ছিলেন এনজিও (ইউএনডিপি) কর্মী । তবে জীবনকে নতুনভাবে দেখার ভাবনা থেকে বছর তিনেক আগে তিনি কৃষিকাজে মন দেন। চাকরি ছেড়ে গড়ে তোলেন পেয়ারা, বরই( ভারত ও বল সুন্দরী) মালটা ও কমলা বাগান। দুই বছর পর শুরু করেন বিদেশি ফল ড্রাগনের বিশাল এক বাগান। সেই বাগান থেকে তার আয় এখন মাসে চার-পাঁচ লাখ টাকা আর বছরে আয় করেন প্রায় ১৫ লাখ টাকা। চার বছর পর তার এই সফলতার মুখ দেখেছেন বলে জানিয়েছেন এই সফল উদ্যোক্তা।

প্রুনু মং মারমা গ্রামের বাড়ি সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নে কুহালং হেডম্যান পাড়া গ্রামে। মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্ম তাঁর। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনিই সবার ছোট। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর বিভিন্ন এনজিও ও কনষ্ট্রাকশন ফার্মে চাকরি করেও কোনখানে মন টিকেনি তার। চাকরি ছেড়ে কৃষিকে নিজের সাধনার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন। বর্তমানে তিনি একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা। নিজ গ্রামের পাশে জমিতে আড়াই একরের জায়গায় শুরু করেছিলেন বরই ও পেয়ারা বাগান। সেগুলো ছাড়াও ড্রাগন, কমলা ও মালটা চাষ করেন প্রুমং নু মারমা। বর্তমানে তাঁর ৫ একর মিশ্রণ ফলের বাগানে নিয়মিত ১০–১৫ জন মানুষ কাজ করেন।

এই সফল উদ্যেক্তা পড়ালেখা শেষ করে শুরুতেই ইউএনডিপি নামে এক এনজিওতে চাকরি শুরু করেন। চাকরি পাশাপাশি একজন সফল উদ্যেক্তা হওয়ার স্বপ্ন বুনেন। প্রতিদিন ইউটিউবের ভিডিও দেখে সফল উদ্যেক্তার হওয়ার গল্প অনুসরণ করতে থাকেন। কোন পদ্ধতিতে বিভিন্ন ফল চাষ করা হয়, সেগুলো অভিজ্ঞতা নিতে পাড়ি দিয়েছিলেন মুন্সিগঞ্জ, ঝিনাইদ ও চুয়াডাঙ্গাসহ বেশ কয়েকটি জেলায়। সেখানকার সফল উদ্যেক্তার কৃষকের জমিতে চাষাবাদ বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেন।

পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে প্রথমে ২০২২ সালের দিকে নিজের আড়াই একর জমিতে শুরু করেন বরই (বল সুন্দরী), মালটা, কমলা ও পেয়ারা ফলের বাগান। ২০২৪ সালে এসে আরো আড়াই একর জমিতে শুরু করেন বিদেশী ড্রাগন ফলের চাষ। বর্তমানে তার পাঁচ একর মিশ্র ফলের বাগান থেকে বছরের আয় হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা।

বান্দরবান শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে কুহালং ইউনিয়নের ভাঙ্গামুড়া সড়কের পাশে দেখা মিলেছে প্রুনুমং মারমরে। বর্তমানে তার এই ফলের বাগানে ৭হাজার ৫০০টি ড্রাগন ফলের গাছ, ৪৫০টি বরই গাছ (ভারত ও বল সুন্দরী), ৭০০টি পেয়ারা, কমলাও পেয়ারা মিলে ২০০টি গাছ রয়েছে।

গত বছরে ড্রাগন ফল বিক্রি করে আয় করেছিলেন ৩ লাখ টাকা, একইভাবে কমলা, মালটা বরই বিক্রি করে আয় করেছেন ৪ লাখ টাকার। চলতি বছরের ড্রাগন ফল ১ টন ছিড়েছেন। সেটি বাজারের বিক্রি পর এবারে ড্রাগন ফল থেকে আয়ের টার্গেট ৬ লক্ষ টাকা আর অন্যান্য মিশ্র ফল থেকে ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা আয় হবে বলে বিশ্বাস করেন তিনি।

ভাঙ্গামুড়া বাসিন্দা হ্লামংপ্রু মারমা বলেন, এই এলাকায় অধিকাংশ মানুষ চাষাবাদ করে জীবন নির্বাহ করছে। কেউ শসা ,সিম, বেগুন এগুলো ছাড়া ফলের দিকে কম আগ্রহী হয়েছেন। এখন প্রুনুমং চাকরি ছেড়ে উদ্যেক্তা হয়ে মাসে যে আয় করছেন তরুণরাও তাকে দেখে অনুসরণ করছে। চাকরি পিছনে না ছুটে একজন সফল উদ্যেক্তা খুবই প্রশংসনীয়।

পাঁচ একর বাগানের দেখাশোনা আর প্রতিনিয়ত পরিচর্যা করেন উশৈহ্লা মারমা। তিনি বলেন, আমি মিশ্র ফলের বাগান দেখাশোনা করছি তিন বছর। বাগান পরিষ্কার থেকে শুরু করে প্রতিটি ফল গাছের পরিচর্যা করছি। প্রতিদিন আমার পারিশ্রমিক ৮শত টাকা করে পাচ্ছি। বাগানের ফল ফর্মালিন মুক্ত ,স্বাদেও মিষ্টি। শুধু ড্রাগন নয়, পেয়ারা, বল সুন্দরী, মালতা, কমলাও একই। চাহিদা থাকায় প্রতিদিন বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে যাচ্ছি।

সম্প্রতি ভাঙ্গামুড়া এলাকায় গড়ে তোলা মিশ্র ফলের বাগানে কথা হয় প্রুনু মং মারমা সঙ্গে। ড্রাগন, পেয়ারা, বল সুন্দরী (বরই), কমলা ও মালটা মিশ্র ওই ফলের বাগান ঘুরে দেখানোর সময় তিনি বলেন, পড়ালেখা শেষ করে বিভিন্ন এনজিও এবং কন্ট্রাকশনে চাকরি করেছেন দীর্ঘ বছর ধরে’ কিন্তু কোনখানে তার মনের প্রশান্তি পায়নি।

চাকরি ছেড়ে ২০২২ সালে এসে উদ্যেক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখি। প্রথমে ইউটিউব দেখে শুরু করেছিলাম বড়ই আর পেয়ারা ফলের চাষ। সেখান থেকে লাখখানেক টাকা আয় হতে শুরু করে। এরপর শুরু করি ড্রাগন ফলের বাগান। এক বছরের মাথায় ড্রাগন থেকেও ৩ লাখ টাকা আয় করি।

এখন আমার ৫ একর জমিতে ড্রাগন, বরই (বল সুন্দরী),মালতা, কমলা ও পেয়ারা ফলের বাগান আছে। শুরুতেই কিছুটা আর্থিক সমস্যা হলেও মৌসুমে ফল থেকে কয়েক লক্ষ টাকা পাচ্ছি। বর্তমানে আমার বছরের আয় প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা।

সফল উদ্যেক্তা প্রুনু মং মারমা তরুণ উদ্দেশ্যে বলেন, চাকরি পিছনে না ছুটে অল্প পুঁজির মাধ্যমে শুরু করলে একজন সফল উদ্যেক্তা হওয়া যায়। বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব দিকে নজর দিচ্ছে পাশাপাশি কৃষি বিভাগ থেকে প্রণোদনা দিচ্ছে। তাই বেকার তরুণ যারা রয়েছেন অল্প পুঁজিতে কৃষি বা যেকোনো কিছু উদ্যেগ দিলে সেটিতে সফল হওয়া যায়। এতে দেশের বেকারত্ব দূর হবে বলে মনে করেন এই উদ্যেক্তা।

বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগে উপ-পরিচালক এস এম শাহনেওয়াজ বলেন, চাকরি ছেড়ে প্রুনু মং মারমা তরুণ উদ্যেক্তা সফলতা পেয়েছেন বলে খবর পেয়ে তার বাগান পরিদর্শন করা হয়েছে। নিজ জমিতে ফল করেছেন। সেখান থেকে তিনি মাসে কয়েক লাখ টাকা আয় করছেন তরুণ উদ্যেক্তা। আর কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় যা দরকার সবকিছু দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, তার সফলতার জন্য যদি আমাদের এখানে আবেদন করে তাহলে এই বছর সফল উদ্যেক্তা হিসেবে তাকে পুরষ্কার তুলে দেয়া হবে। আর যারা বাণিজ্যিকভাবে কৃষি কাজ করতে চায়, আমরা তাদের উদ্বুদ্ধ করি। আর তরুণ ও বেকাররা কৃষিকাজে আগ্রহী হলে প্রান্তিক পর্যায়ে অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে আশা এ কৃষি কর্মকর্তার।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ফিচার
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন