রাঙামাটিতে কারফিউ জারী করা হয়েছে
স্টাফ রিপোর্টার:
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় রাঙামাটি শহরে কারফিউ জারি করা হয়েছে। আগামী কাল সকাল ৮টা পর্যন্ত এই কারফিউ বলবৎ থাকবে। রোববার রাত ৭টা থেকে আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত গোটা শহরে জারি করা কারফিউ বলবৎ থাকবে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আবারও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. শামসুল আরেফিন। শহরে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এর আগে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে রাঙামাটি শহরের বিভিন্নস্থানে বাঙালীদের ঘরবাড়িতে আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগ করেছে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। এর আগে আজ বিকাল ৫টার দিকে জেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়ক মিটিং চলাকালে রাঙামাটিতে নতুন করে বাঙালীদের উপর হামলা শুরু করে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। হামলায় গুলি ও মার্বেল ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ২০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ১৪৪ ধারা রক্ষায় শহরে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকলেও পাহাড়ীরা তারা ভঙ্গ করেই এই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যায় শহরের ভেদভেদী এলাকায় ৪টি দোকানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। শহরের উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন বিকেলে বিশেষ আইন-শৃঙ্খলা সভা আহবান করে। সভা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে বনরূপা বাজার এলাকা থেকে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। এসময় বনরূপায় দুস্কৃতকারীরা আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সহ সাধারণ মানুষের উপর গুলি ছোড়ে এবং ইটপাটকেল, গুলতি, মার্বেল ও তীর নিক্ষেপ করে। পুলিশও বেশ কয়েক রাউন্ড শর্ট গানের গুলি ছোড়ে ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এসময় বাজারের বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুঠপাট চালায় পাহাড়ী দুর্বৃত্তরা। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে শহরের কলেজ গেইট, আমানতবাগ, বিজয়স্বরণী, তবলছড়ি, কাঠালতলী ও ভেদভেদী এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ গিয়ে সংঘর্ষকারীদের ধাওয়া দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার বিকালে বনরূপা বাজারের ভিতরে উপজাতীয়রা বাঙ্গালী ব্যবসায়ীদের উপর চড়াও হয়। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে বনরূপা এলাকার বাঙ্গালীরাও তাদের উপর চড়াও হয়। এ সময় উভয় পক্ষের মাঝে সংঘর্ষ বেধে যায়। এসময় পুলিশ বাঙালীদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করলেও পাহাড়ী এলাকায় প্রবেশ করার সাহস পায়নি। কিন্তু পরিস্থিতি আরো অবনতি হলে প্রশাসন কারফিউ জারি করে। শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিয়ে শহরে টহল দিচ্ছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং উত্তেজনা প্রশমনে রোববার বিকাল ৪টায় বিশেষ আইন-শৃঙ্খলা সভা আহবান করে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মো. শামসুল আরেফিনের সভাপতিত্বে সভায় রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার, মহিলা সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমাসহ সামরিক, বেসামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের নেতা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সৃষ্ট ঘটনা এড়াতে এবং ভবিষ্যতে যাতে ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, সহনশীল হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সব সম্প্রদায়ের মানুষকে একযোগে এগিয়ে আসার আহবান জানানো হয়। পাশাপাশি এলাকায় এলাকায় শান্তি সমাবেশ ও শান্তি র্যালির আয়োজনসহ শান্তি-শৃঙ্খলা কমিটি গঠনের প্রস্তাব তোলা হয়। আইন শৃংখলা সভা চলাকালীন সময়ে পরিস্থিতি হঠাৎ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠায় তা সামাল দিতে সভা থেকে প্রস্তাব করা শহরে কারফিউ জারি করে জেলা প্রশাসন।তার আগে বনরুপা সহিংস ঘটনায় ব্যবহার করা হয়েছে ধারা তীর,মারবেল ,গুলতি ও গুলি । বিকাল সাড়ে ৪টায় প্রশাসনের সামনে বনরুপা বাজার ভিতর থেকে সরাসরি ফায়ার করা হয়। পরে তবলছড়ি থানার সামনে বাড়ী ঘরে হামলা,ভেদভেদীতে ঘরে আগুন ও রিজার্ভবাজার কালিন্দিপুর প্রচুর লোকজন জড়ো হয়ে হামলার প্রস্তুতি নিলে জেলা প্রশাসক কারফিউ জারী করেন। পুরো বিষয়টি জেলাপ্রশাসক সরাসরি মন্ত্রী পরিষদের সচিবকে জানালে পরে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশে কারফিউ জারী করেন।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসক সামসুল আরেফিন জানান, উদ্ভুত পরিস্থিতি নিরসনে এক জরুরি সভায় সেনাবাহিনী-বিজিবি ও পুলিশ বাহিনীকে কঠোর হস্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করার নির্দেশনা প্রদান করেন।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামীকাল জেএসএস সমর্থিত একটি অঙ্গ সংগঠনের সম্মেলন উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলা থেকে ৬ সহস্রাধিক জেএসএস, যুবফ্রন্ট ও পিসিপি সদস্য রাঙামাটি শহরে প্রবেশ করায় তাদের ব্যাপক শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পূর্বেই জানানো হলেও জেলা প্রসাশন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এমনকি ১৪৪ ধারা ভেঙে গতকাল রাত ও আজ সারাদিন পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে বাঙালীদের উপর হামলা চালিয়েছে। তাদের বসতবাড়ি ও দোকানপাটে অগ্নি সংযোগ করেছে। কিন্তু স্থানীয় পুলিশ কাউকেইেআটক করেনি। স্থানীয় বাঙালীদের অভিযোগ পুলিশ ভয়ে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের এলাকায় প্রবেশ করতে ও তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বাধা দিতে না পারলেও বাঙালীরা ঐক্যবদ্ধ হলেই তাদের উপর লাঠিচার্জ করছে।
পার্বত্য নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার আলকাস আল মামুন ভুইয়া পার্বত্যনিউজকে এ ব্যাপারে বলেন, পুলিশ পাহাড়ীদের কিছুই বলছে না। বরং তাদের হামলা থেকে বাঁচতে বাঙালীরা যেখানে আশ্রয় নিচ্ছে সেখানেই লাঠিচার্জ করছে।
উল্লেখ্য, শনিবার কলেজের অস্থায়ী ক্যাম্পাসে পাঠদান কার্যক্রম ভিডিও কনফারেন্সে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সব কার্যক্রম স্থগিত রাখার দাবিতে ওইদিন সড়ক ও নৌপথে রাঙ্গামাটি জেলায় সকাল-সন্ধ্যা অবরোধ কর্মসূচি পালন করে জনসংহতি সমিতির সমর্থনপুষ্ট ছাত্র সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)। অবরোধের সমর্থনে বিভিন্ন এলাকায় পিকেংটিং করেন অবরোধকারীরা। ওই সময় সকালের দিকে অবরোধ ভেঙে পিক-আপ নিয়ে মেডিকেল কলেজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাওয়ার চেষ্টা করেন কলেজ স্থাপন সমর্থক যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শতাধিক নেতাকর্মী। এতে উভয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরে সংঘর্ষ রুপ নেয় পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে। এই সহিংস ঘটনার জন্য পুর্ব কল্পিত ভাবে হাজার হাজার মারবেল তীর গুলতি মজুদ রাখে । যা গতকাল শহরে প্রধান সড়কে বাঙালেিদর ওপর নিক্ষেপ করা এসব পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় ফরেষ্ট মসজিদ ও বেশকিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।





















