সন্তু লারমা ও জেএসএস কেন ভারতের টার্গেটে?


বিগত কয়েক মাস ধরে ভারতে, বিশেষ করে সেভেন সিস্টার্স এর ত্রিপুরা ও মিজোরামে জেএসএসের বিরুদ্ধে ব্যাপক ধরপাকড় চলছে এবং ভারতীয় মিডিয়ায় জেএসএস ও এর সেখানে পলাতক নেতা কর্মীদের নেগেটিভভাবে তুলে ধরে প্রচার করা হচ্ছে।
মিজোরাম ও ত্রিপুরার স্থানীয় বাসিন্দারা জেএসএস-এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, সমাবেশ, মিছিল করছে, কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি দিচ্ছে। অনেক স্থানীয় নেতা সে সকল বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিভিন্ন জায়গায় পোস্টারিং করছে। বিষয়টা আমার কাছে অনেকখানি বিস্ময়কর এবং একই সাথে প্রশ্নবোধক। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামের জেএসএস ও ইউ পি ডি এফ এর সিনিয়র নেতাদের, বিশেষ করে সামরিক নেতাদের অধিকাংশই বহু দশক ধরে সেখানে বসবাস করছে। সেখানে বাড়ি ঘর করে পরিবার-পরিজন নিয়েই বসবাস করছে। এদের বেশিরভাগেরই সেখানে নাগরিকত্ব বা আধার কার্ড রয়েছে। ফলে বিষয়টি অনেকটাই অভাবিত।
ভারতীয় মিডিয়ার অভিযোগ, সেখানে পলাতক পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীরা চোরাচালানের সাথে জড়িত- এটা খুবই স্বাভাবিক এবং নতুন কোন ব্যাপার নয়। সারা পৃথিবীতেই ইনসার্জেন্ট গ্রুপগুলো তাদের অর্থ উপার্জনের অন্যতম উপায় হিসেবে চোরাচালনকে বেছে নেয়। জেএসএস ও ইউপিডিএফ শুরু থেকেই এই কাজটি করে আসছে। তাহলে নতুন করে কেন এ অভিযোগ?
ভারতীয় মিডিয়ায় আরো বলা হচ্ছে, জেএসএস ও সন্তু লারমা সে দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ এবং নর্থইস্ট এর কোন কোন বিদ্রোহীদের সাথে তাদের যোগসাজোস রয়েছে।
আমরা সবাই জানি, ভারতীয় পৃষ্ঠপোষকতা, তাদের প্রশিক্ষণ, সহায়তা, আশ্রয়, প্রশ্রয় এবং সব ধরনের পরামর্শ ও নৈতিক সমর্থনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি ইনসার্জেন্ট গ্রুপ। এক কথায় বলা যেতে পারে, জেএসএসের সাথে ভারতের সম্পর্ক পুত্র ও পিতার মতো। এটা তাদেরই সৃষ্টি এবং এটি এখন আর কোন গোপন বা বিতর্কিত ফায়সালা নয়। তাহলে হঠাৎ করে ভারত
জেএসএসের বিরুদ্ধে এরকম উল্ট পিঠ দেখাতে শুরু করলে কেন?
বিশেষ করে সন্তু লামার দীর্ঘ একমাস ব্যাপী ভারত সফরের পর এই ধরপাকড় শুরু হয়েছে। বিষয়টা যথেষ্ট কৌতূহল উদ্দীপক ও ভাবনারও বটে।
ভারতীয় মিডিয়ায় এবং সুহাস চাকমা, প্যারিস চাকমা সহ বেশ কিছু ইউপিডিএফ সমর্থক ইনফ্লুয়েন্সাররা দাবি করছেন, সন্তু লারমা ও জেএসএসের সাথে পাকিস্তান ও চায়নার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সন্তু লারমা কি আসলেই ভারতের জন্য বিপদজনক কোন পথে ধাবিত হয়েছেন? সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, পাকিস্তান ও চায়নার সাথে সম্পর্ক তৈরির জন্য সন্তু লারমাকে কেন ভারতে যেতে হবে? সন্তু লারমার যে বয়স এবং শারীরিক অবস্থা, তাতে তার পক্ষে নতুন কোন অ্যাডভেঞ্চার শুরু করা কতটা সম্ভব সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ।
এমনও হতে পারে ইউপিডিএফ এর প্রচারণার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ভারত জেএসএসের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে। কিন্তু ভারতের মতো একটি বিশাল রাষ্ট্রের সরকার ও নিরাপত্তা কাঠামো এবং দক্ষতা চিন্তা করলে এটা খুব সরল সমীকরণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কী বিশেষ কারণে ভারত সন্তু লারমা ও জেএসএস এর বিরুদ্ধে এভাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছে? নাকি কোন বিষয়কে ডিফোকাস বা দৃষ্টির আড়াল করার জন্য এই প্রচারণা ও কার্যক্রম ব্যবহার করা হচ্ছে? পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে একজন পর্যবেক্ষক ও গবেষক হিসেবে এই প্রশ্নটি বেশ কিছুদিন ধরে আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু কোন উপসংহার বা উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। দু একজনকে জিজ্ঞাসা করেছি কোন সদুত্তর পাইনি, কেউবা আমলেই নেয়নি বিষয়টা।
হয়তো আমাদের দৃষ্টির আড়ালে কোথাও কিছু রান্না হচ্ছে, আমরা কেবল তার ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু কোথায় রান্না হচ্ছে, কী রান্না হচ্ছে, কেন রান্না করছে, কে রান্না করছে, কার জন্য রান্না করছে, কিভাবে রান্না করছে, লক্ষ্য কী- সে বিষয়ে কোনো কিছুই জানতে পারছি না। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইন্সার্জেন্সিতে নতুন কোন প্রপঞ্চ বা সমীকরণ যুক্ত হচ্ছে কিনা বা পুরাতন সমীকরণ বদলে যাচ্ছে কিনা? সেটা অভ্যন্তরীণভাবে, নাকি আঞ্চলিকভাবে অথবা আন্তর্জাতিকভাবে- সে বিষয়ে উত্তর পাওয়া জরুরি।
এই নতুন প্রপঞ্চ বা সমীকরণের যুক্ত হওয়া বা পুরাতন সমীকরণের বদলে যাওয়া কার পক্ষে বা কিভাবে হচ্ছে সেটা জানাও জরুরি। এখানে অনুঘটক কে এবং লক্ষ্যই বা কি- সেটাও জানতে হবে। রান্না টেবিলে পরিবেশনের পূর্বেই জানতে হবে। আমি নানাভাবে গন্ধ শুঁকে রান্নার ধরণ চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। কিন্তু উপসংহারে পৌঁছাতে পারছি না। অথচ রান্না টেবিলে পরিবেশন হয়ে গেলে হয়তূ অনেক দেরি হয়ে যাবে। তখন হয়তো অনেক কিছুই করার থাকবে না।
লেখক : সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ
















