সরেজমিন বান্দরবানের থানচির রেমাক্রী ইউনিয়ন

প্রত্যন্ত পাহাড়ি পল্লীতে কমিউনিটি ক্লিনিকের অভাব : স্বাস্থ্যসেবায় বঞ্চনা

fec-image

পার্বত্যাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকার একটি অবহেলীত গ্রাম বড় মদক ভিতর পাড়া। গ্রামটির অবস্থান বান্দরবানের থানচি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে দুর্গম রেমাক্রী ইউনিয়নে। মোবাইল নেটওয়ার্ক কিংবা বিদ্যুতের আলো থেকে বঞ্চিত এই গ্রামে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার অভাব এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। স্বাধীনতা পর থেকে এ পর্যন্ত দেশের বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হলেও পার্বত্যাঞ্চলের এ রকম দুর্গম এলাকাগুলোয় স্বাস্থ্যসেবা এখনো অধরা।

সরেজমিনে জানা যায়, কেবল থানচির এই গ্রামই নয়, আশেপাশে আরো ৯০টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ সরকারি কমিনিউটি ক্লিনিকের অভাবে উন্নত স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত। বান্দরবানের সিভিল সার্জন দুর্গম এই পাহাড়ি পল্লীগুলোতে কমিউনিটি ক্লিনিকের চাহিদার কথা স্বীকার করেছেন।

বান্দরবান জেলা পরিষদের কর্মকর্তারা বলছেন, সিভিল সার্জন কার্যলয় থেকে চাহিদাপত্র পাঠালে এ বিষয়ে চিঠি পাঠানো হবে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে দুর্গম পাহাড়ি পল্লীগুলোতে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনে উদ্যোগ নেবেন তারা।

বড় মদক ভিতর পাড়া গ্রামে যেতে নৌ পথে সময় লাগে প্রায় ৫ ঘণ্টা। গ্রামের পাশে বড় মদকের বাজার। গ্রামের প্রায় দেড়শ’ পরিবারে বসবাস ও জনসংখ্যা এক হাজারেরও বেশি। দুর্গম এই প্রত্যন্ত এলাকায় না আছে মোবাইল নেটওয়ার্ক, না আছে বিদ্যুতের আলো। সোলার প্যানেল সিস্টেমের  উপর ভর করেই চলছে গ্রামবাসীর জীবন।

স্থানীয়রা জানান, রেমাক্রী ইউনিয়নের প্রায় ৯০টির বেশি ছোট-বড় পাহাড়ি গ্রাম রয়েছে। বাসিরাম পাড়া, ছোটমদক, বড় মদক, যুগেরাম পাড়া, দলিয়ান পাড়া, ইয়াংরাইংসহ আরো কয়েকটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকায় এখনো স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয়নি।

দুর্গম এলাকা হওয়াতে জটিল রোগে আক্রান্ত মুমূর্ষ রোগীদের শহরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের। আশেপাশে ক্লিনিক না থাকায় দুর্গম পথ পেরিয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে উপজেলা শহরে পৌঁছার আগে নৌ পথেই প্রাণ হারাতে হয় রোগীদের। এমন পরিস্থিতিতে উপজেলা কিংবা জেলা শহরের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে বহু মুমূর্ষ রোগীর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী।

বান্দরবান সিভিল সার্জন কার্যালয় তথ্য অনুসারে, দুর্গম এই থানচি উপজেলায় রেমাক্রী ইউনিয়নের একটি মাত্র কমিনিউটি ক্লিনিক রয়েছে। ছোট মদকে ক্লিনিক থাকলেও সেখানে ডাক্তার সংকটের কারণে এখনো সেবা চালু হয়নি। এছাড়া ওয়ার্ড পর্যায়ে এখনো কমিনিউটি ক্লিনিক চোখে দেখেন নি এই দুর্গম এলাকার বাসিন্দারা।

গ্রামের লোকেরা জানিয়েছেন, দুর্গম অজুহাতে যেখানে এখনো কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন হয়নি। আর এসব গ্রামে প্রতিদিনই চলছে স্বাস্থ্যসেবার জন্য হাহাকার। ফলে দিনের পর দিন স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ। শুধু স্বাস্থ্য সেবা নয়,  মৌলিক অধিকার থেকেও পিছিয়ে রয়েছে এই অঞ্চলের পাহাড়ি পল্লীগুলো। শহরে হাসপাতাল থাকলেও  যাতায়াতে নানা সমস্যা হয় । যার কারণে প্রায় সময় রোগীরা মারা যায় অর্ধেক পথে।

রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদ তথ্য বলছে, বর্তমানে এই ইউনিয়নে মোট ৯০টির অধিক গ্রাম রয়েছে। সবমিলে জনসংখ্যা ১৫ হাজারো অধিক। দুর্গম এলাকা হওয়াতে এখনো পৌছাতে পারেনি কমিনিউটি ক্লিনিক। ফলে বঞ্চিত আছে স্বাস্থ্যসেবা থেকে।

সরেজমিনে থানচি শহর থেকে নৌ পথে তিনঘণ্টা পর দেখা মিলে রেমাক্রী ইউনিয়ন। সেখানে পরিবার পরিকল্পনা অধীনে একটি ছোট ক্লিনিক রয়েছে। আর কোন গ্রামে ক্লিনিক দেখা যায়নি। তাছাড়া শিশুদের ভিটামিন কিংবা প্রতিষেধক ঔষধ দেয়ার কথা থাকলেও ক্লিনিক অভাবে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে  শিশুরাও।

মহিলা ইউপি সদস্য বায়াতি ত্রিপুরা বলেন, আশেপাশে কোন কমিনিউটি ক্লিনিক নাই। যার কারণে রোগী মারা যাচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ক্লিনিক স্থাপন করে দিলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।

বড়মদক ভিতরপাড়া বাসিন্দা অংশৈহ্লা মারমা বলেন, আমরা দুর্গম এলাকায় থাকি। এখানে নেটওয়ার্ক নাই, কারেন্ট নাই। চিকিৎসা নিতে থানচি শহরে যেতে হয়। তাই ১টি ক্লিনিক স্থাপনে দাবি জানাচ্ছি।

রেমাক্রী ইউপি চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা বলেন, আমার ইউনিয়নে ৯০টি গ্রামে প্রায় জনসংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার অধিক। দুর্গমতার কারণে এখনো স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিচ্ছিন্ন।  সরকার ক্লিনিক স্থাপন করে দিলে আমার ইউনিয়নের মানুষ স্বাস্থ্য থেকে বঞ্চিত হবে না বলে আশা রাখি।

বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, দুর্গম ও জনবসতি কম হলেও সেখানে ক্লিনিক চাহিদা রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিনিউটি ক্লিনিক স্থাপন করে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার।

বান্দরবান জেলা পরিষদে মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, যেখানে ক্লিনিক প্রয়োজন সেখানে সিভিল সার্জন কার্যলয় থেকে চাহিদাপত্র পাঠালে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় বরাবর পাঠাব। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে দুর্গম এই পাহাড়ি পল্লীগুলোতে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করার আশ্বাস দেন তিনি।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন