মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ সরকারী সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধা মালু মিয়ার পরিবার
স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ সরকারী কোন সুযোগ-সুবিধার আওতায় আসেনি ‘৭১ এর রনাঙ্গণের বীর সেনানী খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত মালু মিয়ার পরিবার। ফলে মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ সরকারী কোন সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত রয়ে গেছে বীর বিক্রম ও বীর প্রতিক খেতাবপ্রাপ্ত এ মক্তিযোদ্ধার পরিবার। জানা গেছে, এনিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করলেও কোন লাভ হয় নি। ফলে অনেকটা অভাব-অনটনের সাথে লড়াই করে বেঁচে আছে বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত মালু মিয়ার বয়োবৃদ্ধ বিধবা স্ত্রী আমেনা বেগম। সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেলেও মুক্তিযোদ্ধা মালু মিয়ার পরিবার কেন ভাতার আওতায় আসেনি এমন প্রশ্ন মাটিরাঙ্গার সচতেন মহলের।
১৯৭১ এর রনাঙ্গণের এক টকবগে যুবক বীর সেনানী মুক্তিযোদ্ধা মালু মিয়া। জেলার একমাত্র বীর বিক্রম ও বীর প্রতিক খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা মালু মিয়া। যুদ্ধ করে কি পাবেন তা তিনি জানতেন না তবে স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশের জন্য লড়াই করে গেছেন প্রাণপনে। ২০০৯ সালের ১১ আগস্ট অনেকটা বিনা চিকিৎসায় পরলোকগমন করেন এ মুক্তিযোদ্ধা। স্বামীর দু:সহ জীবনের স্মৃতি নিয়ে এখনো খেয়ে-না খেয়ে বেঁচে আছেন মুক্তিযোদ্ধা মালু মিয়ার বিধবা স্ত্রী আমেনা বেগম।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মালু মিয়া ১৯৪৯ সালে তৎকালীন ইপিআর ( ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল) এ যোগদান করেন। তিনি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে দিনাজপুর, হিলি, ফুলবাড়ী এলাকায় বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে বীর প্রতীক খেতাবে ভুষিত হন। এছাড়া ১৯৭৬ সালে অপর একটি অপারেশনে সাহসিকতার স্বীকৃতি স্বরূপ বীর বিক্রম খেতাবে ভুষিত হন। একই ব্যক্তি বীরত্বপূর্ণ কাজের দুটি খেতাবে ভুষিত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে বিরল।
দুটি খেতাবপ্রাপ্ত দেশের একজন বীর সেনানী হলেও অনেকটা অবহেলায় পড়ে আছে তার সমাধিস্থলটি। সেখানে কোন নামফলক পর্যন্ত নেই। কাঠ দিয়ে দেয়া বেড়াটিও প্রায় ভেঙে গেছে। আর তা যেকোন সময় চিহ্নহীন হয়ে হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। দিনমজুর দুই ছেলে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মালু মিয়ার বিধবা স্ত্রী আমেনা বেগমের সংসার। মালু মিয়ার স্ত্রীর কোন ভূমি নেই বলে জানিয়ে তিনি বলেন, বড় ছেলে আমিনুল ইসলামে এক টুকরো জায়গায় বিজিবি‘র করে দেয়া ঘরে কোন রকমে থাকেন তিনি।
বিধবা অমেনা বেগম অভিযোগ করে বলেন, মৃত্যুর আগে মুক্তিযোদ্ধা মালু মিয়ার নামে যে বয়স্কভাতার কার্ডটি ছিল তার মৃত্যুর পর সংশ্লিষ্ট অফিসের আমির হোসেন কার্ডটি অন্য একজনকে দিয়ে দেন। সেসময় কার্ড করে দেয়ার জন্য আমির হোসেনর চাহিদা অনুযায়ী পাঁচ হাজার টাকা দিতে না পারায় অনেক অনুরোধের পরও বিধবা আমেনা বেগমরে নামে কার্ডটি করে দেয়া হয় নি। এবিষয়ে জানতে চাইলে মাটিরাঙ্গা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো: আবুল কাশেম অভিযোগটি খতিয়ে দেখবেন বলে জানান।
৮ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে সংসারের আর্থিক অনটন দূরীকরণের জন্য উক্ত পরিবারকে দুটি রিক্সা প্রদান করা হয় বিজিবি‘র পক্ষ থেকে। বীর মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর আবাসস্থল না থাকায় সেক্টর কমান্ডারের দিক নির্দেশনায় ২৯ বর্ডার ব্যাটালিয়নের সার্বিক তত্ত্বাবধানে দুই রুম বিশিষ্ট টিনসেড ঘর নির্মাণ করা হয়। যেখানে এখন তিনি বসবাস করছেন। এছাড়াও গেল বছরের ১৭ ডিসেম্বর ৪০ বিজিবি‘র পক্ষ থেকে নগদ ১০হাজার টাকা আর্থিক সহয়াতা প্রদান করা হয়।
আলাপকালে মুক্তিযোদ্ধা মালু মিয়ার বিধবা স্ত্রী আমেনা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের জন্য যুদ্ধ করে আমার স্বামী সম্মানটুকুও পায় নি। অথচ মুক্তিযুদ্ধ না করেও অনেকেই আজ সরকারী অনেক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। অনেক রাজাকারও আজ মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়ে বসে আছে। শুধু আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নয় বিভিন্ন জাতীয় দিবসেও স্মরণ করা হয়না মালু মিয়ার পরিবারকে এমন অভিযোগ করেন বিধবা আমেনা বেগম।
এবিষয়ে মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: মনিরুজ্জামান বকাউলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি এখানে যোগদানের পরপরই মাটিরাঙ্গা প্রেস ক্লাবের নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে বীর মুক্তিযোদ্ধা মালু মিয়ার বীরত্বের কথা শুনেছি। আমি মুক্তিযোদ্ধা মালু মিয়ার স্মৃতি রক্ষাসহ তার পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করার চেষ্টা করছি। তিনি খুব শীঘ্রই বীর মুক্তিযোদ্ধা মালু মিয়ার নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কথা জানান।
মাটিরাঙ্গার সচেতন মহল এক মুক্তিযোদ্ধা মালু মিয়ার বীরত্বের কথা জানলেও মুক্তিযোদ্ধা মহল বা প্রশাসন জানেনা এটা স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য। তারা অবিলম্বে মালু মিয়ার নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবী জানান। পাশাপাশি এ পরিবারটিকে পুনর্বাসনেরও দাবী জানান তারা।



















