পার্বত্যনিউজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে

আমার ফোকাস থাকবে পার্বত্য অঞ্চলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা : ওয়াদুদ ভুইয়া

fec-image

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী ওয়াদুদ ভুইয়া। বিজয়ের পর নির্বাচনে জয়ের অনুভূতিসহ খাগড়াছড়ি আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে নিজের পরিকল্পনার তুলে ধরেছেন পার্বত্যনিউজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে। সাক্ষাৎকারে ওয়াদুদ ভুইয়া বলেছেন যে তিনি সকলের সাথে বসে সকলের মতামত নিয়ে শান্তি চুক্তির রিভিউ বা পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন। তাছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন- বিশেষ করে খাগড়াছড়িতে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায় ফোকাস দেবেন। ওয়াদুদ ভুইয়ার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন পার্বত্যনিউজের সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ

পার্বত্যনিউজ : আপনার বিজয়কে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

ওয়াদুদ ভুইয়া : জয়টা আমি আমার জয় মনে করি না। এখানে পাহাড়ি-বাঙালী নির্বিশেষে সকলের ভোটে আমি জয়ী হয়েছি। তাছাড়া সমতলের নির্বাচন থেকে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এই নির্বাচনী লড়াই হয়েছে খাগড়াছড়িতে। যেটা রাঙামাটি ও বান্দরবানেও হয়নি। হয়নি বলতে ওইখানে প্রার্থী ছিল না, জামায়াত বনাম বিএনপি। আমার এখানে জামায়াতকে সেন্ট্রাল থেকে সাপোর্ট দিয়েছে। এলিমেন্ট হিসেবে তারা নানা সমস্যা সৃষ্টি করেছে। এতকিছুর মধ্যেও আমাকে লড়াই করে আসতে হয়েছে। আমি গুড ফিলিংস (ভালো অনুভূতি) অনুভব করছি। অন্যরাও খুশি যে আমি লড়াই করে এসেছি। বাংলাদেশের অন্যান্য জায়াগায় দ্বিমুখী লড়াই ছিল; আমাকে চতুরমুখী লড়াই করে আসতে হয়েছে। এতে করে আমার অনুভূতি ভালো। জনগণ আমাকে গ্রহণ করেছে, ফেলে দেয় নাই।

পার্বত্যনিউজ : আপনি তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তো এবার পার্বত্য চট্টগ্রামে আপনার মূল ফোকাস থাকবে কোন কোন দিকে?

ওয়াদুদ ভুইয়া : আমার ফোকাস থাকবে এই অঞ্চলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। আর যে শান্তি চুক্তি আছে, সকলের সাথে বসে সকলের মতামত নিয়ে এটাকে রিভিউ (পুনর্মূল্যায়ন) করে রিয়েল শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যা করা দরকার ওইদিকে আমার ফোকাস থাকবে। আর দ্বিতীয়ত উন্নয়ন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এগুলোর দিকে আমার ফোকাস থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় করার ও মেডিকেল কলেজ করার ব্যাপারেও ফোকাস থাকবে।

পার্বত্যনিউজ : আপনার দল বিএনপি এবারের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে শান্তি চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের কথা বলা আছে, আবার যারা প্রধান বিরোধীদল হলো জামায়াত তারাও তাদের মেনিফেস্টোতে শান্তি চুক্তি সংস্কারের কথা বলেছে। দুজনের মূলত একই দাবি, একই বক্তব্য; শব্দটা ভিন্ন। এটাকে আপনি কীভাবে বাস্তবায়ন করতে চান বা আপনি কীভাবে দেখেন?

ওয়াদুদ ভুইয়া : এখানে সমঝোতা দরকার পাহাড়ি-বাঙালীদের মধ্যে। বিশেষ করে, পাহাড়িদের যেমন দুইটা গ্রুপ, একটা নিরস্ত্র, একটা সশস্ত্র গ্রুপ। বাঙালীরা একদমই নিরস্ত্র গ্রুপ; নিরস্ত্র জনগণ আর সশস্ত্র জনগণের মানসিকতা যাচাই করে পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি পাহাড়ি ও বাঙালীদের মধ্যে সহাবস্থান, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, সমঝোতা, আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা সৃষ্টি করতে হবে। এটা আমি মনে করি ভালোভাবে নার্সিং করলে শান্তির ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল আসবে।

পার্বত্যনিউজ : শান্তি চুক্তিতে অনেক সংবিধান বিরোধী বিষয় আছে বলে বাঙালিরা দাবি এবং আদালতেও সেটা প্রমাণিত হয়েছে। তো এই দাবিগুলোর কী হবে যদি আপনি দায়িত্ব পান সংস্কারের বা দায়িত্বগুলো যদি আপনার মধ্যে পড়ে?

ওয়াদুদ ভুইয়া : এই মূহূর্তে এটা বলা যাবে না, তবে সেটার একটা পরিকল্পনা আছে। এটা এই মহূর্তে জনসম্মুখে বলা ঠিক হবে না। এখন প্রকাশ করলে প্ল্যানটা আর প্ল্যান আকারে থাকে না।

পার্বত্যনিউজ : পাহাড়ে এই যে অবৈধ অস্ত্র এবং রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস, আপনি এটার সাথেই বেড়ে উঠেছেন, আপনি সবকিছুই জানেন। তো এই সমস্যার সমাধানে আপনি কী করবেন?

ওয়াদুদ ভুইয়া : এইগুলো আমি সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ব্যবস্থা করবো। রাষ্ট্রীয়ভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে করে অস্ত্র উদ্ধার এবং চাঁদাবাজি বন্ধ করা যায়। সরকার নৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিলে, রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিলে এটা কোনো ব্যপার না। অল্প সময়ের মধ্যে অস্ত্র উদ্ধার ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব।

পার্বত্যনিউজ : পাহড়ের আরেকটা সমস্যা হলো ভূমি সমস্যা, আপনি জানেন দীর্ঘদিন ধরে এটা (ডিসপিউটেট) অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে। এই সমস্যা সমাধান হচ্ছে না। তো আপনি যেহেতু খাগড়াছড়ির, এই সমস্যাটা বেশি খাগড়াছড়িতেই। এই সমস্যাটার সমাধানতো আপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে, আপনি এটা কীভাবে এর সমাধান করবেন?

ওয়াদুদ ভুইয়া : হ্যাঁ এটা একটা কঠিন বিষয়, এটা একেবারে আধুনিক সার্ভে করে আমাদের যে ভূমি কমিশন আছে, সেটাকে পরিবর্তন করে এটাকে নিষ্পিত্তির দিকে নেওয়া দরকার, যাতে কারোরই ক্ষতি না হয়। আইনগতভাবে দলিল যার ভূমি তার, এই ভিত্তিতে আগালে ইনশাল্লাহ এটাকেও সমাধান করা সম্ভব।

পার্বত্যনিউজ : কিন্তু পাহাড়ের মানুষের তো জমির দলিল নাই?

ওয়াদুদ ভুইয়া : আছে আছে অনেক আছে, বন্দোবস্ত দলিল আছে। ঐটাও একটা দলিল। আর পাহাড়ের জন্য বন্দোবস্ত দলিলটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

পার্বত্যনিউজ : সেটা শুধু বাঙালিদের যাদেরকে সরকার পুনর্বাসন করেছে। তবে পাহাড়ের প্রথাগত আইনে অনেকেরতো দলিল বা কাগজপত্র নাই। দখল আছে কিন্তু জমির কাগজপত্র বা দলিল নাই।

ওয়াদুদ ভুইয়া : আমার বক্তব্য হলো, অনেকের দলিল আছে, আবার কিছু কিছু জমির দলিল নাই। তারা হয়ত প্রথাগত পদ্ধতিতে জমিটা ভোগ করছে। পাহাড়ে দখল যার এই রকম ভোগ করা বা মালিকানা দাবি করার একটা সুযোগ আছে। তারপরেও এদেরকে একটা নিয়মে আনতে হবে, যদি ওখানে আর কোন বিতর্কিত দাবি না থাকে বা জমি নিয়ে বিতর্ক না থাকে তাহলে প্রথাগত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে তাদের নামে বন্দোবস্ত দিয়ে দিলেই হয়। তাহলে তারা মালিকানা পেয়ে গেলো, যদি কোন বিতর্ক না থাকে কোন দাবি না থাকে। তাহলে এটা রাষ্ট্রের আওতায় আসলো, রাষ্ট্র একটা রাজস্ব পেলো, ওটা সিস্টেমের আওতায় আসলো। এভাবে আমি আপনি ও সে সরকারি জমি দখল করে খেলেও এটা রাষ্ট্রের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠে। অতএব, ওটাকে যদি যারা আছে ভোগ দখলে তাদের একটা গুরুত্ব আছে, আইনগত ভোগ দখলে আছে যারা, যদি বিতর্কিত না হয় সেটা ওদের নামে আইন করে দিলেই হয়। আইনগতভাবে ওদের নামে করে দিলেই হয়। যেগুলো নিয়ে বিতর্ক আছে সেগুলো নিয়ে একটা আলোচনা সাপেক্ষে, তদন্ত সাপেক্ষে কাগজপত্র দেখে সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলেইতো ওকে হয়ে গেলো।

পার্বত্যনিউজ : আপনি ভূমি কমিশন পরিবর্তনের কথা বলছিলেন, কীভাবে পরিবর্তনটা চান?

ওয়াদুদ ভুইয়া : ভূমিকমিশনটা বেসিক্যালি যে কারণে বন্ধ, কাজ করতে পারছে না ওই কারণটাকে প্রথম বন্ধ করতে হবে। সমস্যাটাকে আগে বন্ধ করতে হবে। যারা ভূমি কমিশনকে অচল করে রাখছে তারা কেনো রাখছে, কী জন্য রাখছে সে বিষয়টা বুঝে নিয়ে সেটার সমাধান দিয়ে দরকার হলে আলোচনার ভিত্তিতে আরেকটা কার্যকর কমিশন দরকার। কারণ, এই কমিশনে যতজনই আসছে কেউই কাজ করতে পারে নাই। আর কাউকে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। অথবা কেউ ইচ্ছে করেও কাজ করে নাই।

পার্বত্যনিউজ : পাহাড়ের বাঙালীরা বিশেষ করে যারা পুনর্বাসিত বাঙালী তারা দীর্ঘদিন ধরেই বঞ্চনার কথা বলছে, বৈষম্যের কথা বলছে এবং অনেককেই বরাদ্দকৃত জমি থেকে গুচ্ছ গ্রামে নিয়ে আসা হয়েছে তাদেরকে আর তাদের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া হয় নাই। এই যে বাঙালিদের বৈষম্য, বঞ্চনা এইগুলোকে আপনি কীভাবে সমাধান করবেন?

ওয়াদুদ ভুইয়া : এটা সমাধান করার জন্য আমাদের সরকারিভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। যেহেতু এরশাদ সরকারের সময় এদেরকে নিরাপত্তার খাতিরে শান্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধে সিজ ফায়ার ঘোষণা করে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে এক বছরের কথা বলে স্ব স্ব ভিটা থেকে তুলে আনে। এই এক বছর তাদেরকে রেশন দিয়ে বা সেনা ক্যাম্পের আশেপাশে নিরাপদে রাখার জন্য তথাকথিত গুচ্ছ গ্রাম নাম দিয়ে রাখা হয়। সেই গুচ্ছগ্রাম আজকে প্রায় ৩০ বছর হয়ে গেছে, তো এক বছরের জায়গায় ত্রিশ বছর, এই গুচ্ছগ্রামের অনেকেই তাদের নামীয় জমি হারিয়েছে। সেটা এখন অভয়ারণ্য হয়ে গেছে অথবা কারো নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। সেক্ষেত্রে তাদের কাগজ দেখে দেখে তাদেরকে ঘরবাড়ি করে দিয়ে স্ব স্ব জায়গায় তাদেরকে ফেরত পাঠানো উচিত। তাদের পরিত্যাক্ত জমিগুলোকে আবাদের আওতায় আনা দরকার। তাদের ফেলে আসা ভূমিটা আবার উৎপাদনের জায়গায় আনতে হবে। তাহলে উৎপাদনও বাড়লো, ভূমিটাও ব্যবহার হলো। গুচ্ছগ্রামে মানুষের যে ঘনবসতি সেটা থেকে মানুষ তাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা হবে। তো সবকিছু মিলিয়ে পুরনো যে জায়গা ওরা পেয়েছিলো, ওই জায়গায় ওদেরকে নিতে হবে।

পার্বত্যনিউজ : আপনাকে ধন্যবাদ।
ওয়াদুদ ভুইয়া : আপনাকেও ধন্যবাদ।

শ্রুতিলিখন : মোহাম্মদ নিলয়, সহসম্পাদক, পার্বত্যনিউজ ডেস্ক

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: এমপি, ওয়াদুদ ভুঁইয়া, খাগড়াছড়ি
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন