চকরিয়ায় মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গণে ২ দশকে ১০ হাজার পরিবার বাস্তুহারা

Exif_JPEG_420

চকরিয়া প্রতিনিধি:

কক্সবাজারের চকরিয়ায় খরস্রোতা মাতামুহুরী নদী একসময় জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে আশীর্বাদ হলেও বর্তমানে মরণদশায় পরিণত হয়েছে।

নদীর উজানে বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলার পাহাড় থেকে পাহাড়ে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন ও অপরিকল্পিত পাথর আহরণের ফলে প্রতিবছর বর্ষাকালে বৃষ্টির পানির সঙ্গে নেমে আসা পলি জমে মাতামুহুরী নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

প্রাকৃতিক বৈরী আচরণের ফলে মাতামুহুরী নদী বর্তমানে ভয়াবহ নাব্য সংকটে পড়েছে। এ অবস্থার কারণে নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় প্রতিবছর বর্ষাকালে দুই তীর উপচে লোকালয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ঢলের পানি।

অপরদিকে কয়েকদিন পর লোকালয় থেকে ঢলের পানি নামতে শুরু হলে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে মাতামুহুরী। ওইসময় নদীর দুইতীরে শুরু হয় ভাঙ্গণ।

বছর বছর ভাঙ্গণে তীর এলাকায় বসবাসরত লক্ষাধিক জনসাধারণ চরম আতংকে রয়েছেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, ১৯৯১ সালের পর থেকে শুরু হয়ে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২৭ বছরে নদী ভাঙ্গণের কবলে ভিটে-বাড়ি হারিয়ে অন্তত দশ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়েছেন। এসব পরিবার বেঁচে থাকার তাগিদে ঠাঁই নিয়েছে পাহাড়ি জনপদে।

নদীতে বিলীন হওয়ার পথে রয়েছে পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ শহররক্ষা বাঁধ ও ছিকলঘাটা-কৈয়ারবিল সড়কে ৩৩হাজার কেভির বিদ্যুৎ লাইনের খুঁটি। হুমকিতে আছে তীরবর্তী জনপদের হাজার হাজার জনবসতি, বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।

অভিযোগ উঠেছে, প্রতিবছর ভাঙ্গণ ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোটি কোটি টাকা বরাদ্দে বেসুমার উন্নয়ন কাজ অব্যাহত রাখলেও জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিতে স্থায়ীভাবে টেকসই কোন ধরণের প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

তবে কক্সবাজার ও বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গণ প্রতিরোধে একাধিক টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট উধর্বতন দফতরে ইতোপূর্বে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থবরাদ্দের অভাবে চকরিয়া উপজেলার প্রায় এলাকায় নদী ভাঙ্গণরোধে প্রকল্প নেওয়া যাচ্ছে না।

উপজেলার লক্ষ্যারচর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তাফা কাইছার বলেন, তার ইউনিয়নে মাতামুহুরী নদীর তীর এলাকায় রয়েছে ৬হাজার মানুষের বসবাস। নদী ভাঙ্গণের ফলে জনগণের মাঝে বিরাজ করছে চরম আতংক। শুষ্ক মৌসুম যেমন তেমন বর্ষাকালে বেড়ে যায় আতঙ্কের মাত্রা।

তিনি বলেন, ভাঙ্গণ অব্যাহত থাকলে বর্ষাকালে যে কোন সময় নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে এলাকার শত শত একর ফসলি জমি, ৩৩ হাজার কেভি’র বিদ্যুৎ লাইনের টাওয়ার, খতিবে আজমসহ বেশ কয়েকটি সড়ক, স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানাসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ।

জানা গেছে, ১৯৯১সালে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর উপজেলায় নদীর ভাঙ্গণের মাত্রা বাড়তে শুরু করে। এখনো প্রতিবছর বর্ষাকালে নদীতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে অব্যাহত রয়েছে নদী ভাঙ্গণের ভয়াবহতা। গেল দুই দশকে নদীর এ ভয়াবহতায় উপজেলা ও পৌরসভা এলাকার প্রায় দশ হাজার পরিবার ভিটেবাড়ি হারিয়েছে। এখনো ভাঙ্গণ আতঙ্কে রয়েছে প্রায় লক্ষাধিক জনগণ।

সরেজমিনে জানা গেছে, চকরিয়া পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের কাজির পাড়া, আমানপাড়া, চরপাড়া, ছাবেতপাড়া ৮নং ওয়ার্ডের নামার চিরিঙ্গা, কোচপাড়া, ৯নং ওয়ার্ডের দিগরপানখালী, ৩নং ওয়ার্ডের তরচঘাট, বাটাখালী নাপিতের টোড়া ও উপজেলার কাকারা, সুরাজপুর-মানিকপুর, কৈয়ারবিল, বিএমচর ইউনিয়নের কন্যারকুম , বরইতলী, পূর্ববড় ভেওলা, সাহারবিল, কোণাখালী, ফাঁসিয়াখালী ও চিরিঙ্গা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনপদ ভাঙ্গণের কবলে পড়েছে।

স্থানীয়রা জানান, চলতি বর্ষার আগে তীরবর্তী জনপদের এসব এলাকায় জরুরিভিত্তিতে ভাঙ্গণ প্রতিরোধে টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবস্থা নেয়া নাহলে অবশিষ্ট জনবসতি, জমিজমা ও মসজিদ-মাদ্রাসাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ জনপদের বিভিন্ন সড়ক নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) চকরিয়া উপজেলার চিরিঙ্গা শাখা কর্মকর্তা (এসও) এসএম তারেক বিন সগীর বলেন, মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গণ প্রতিরোধে পাউবো ইতোমধ্যে অনেকগুলো প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করে অর্থবরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট উধর্বতন দফতরে সার সংক্ষেপ প্রেরণ করেছে। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থবরাদ্দ না হওয়ায় সবখানে একসঙ্গে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে সমীক্ষা চালিয়ে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ চকরিয়া পৌরসভার কোচপাড়া, লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের রোস্তম আলী চৌধুরী পাড়া, কোনাখালী ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের দিগরপানখালী পয়েন্টে ভাঙ্গণ ঠেকাতে প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থবরাদ্দ হলে নদীর অন্য পয়েন্টে ভাঙ্গণ রোধে কাজ করা হবে।

ভাঙ্গণের ভয়াবহতা সম্পর্কে নিশ্চিত করেছেন চকরিয়া উপজেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ফজলুল করিম সাঈদী। তিনি বলেন, গত ২৭ বছরে ভাঙ্গণের তা-বে শিকার হয়ে উপজেলার অন্তত দশ হাজার পরিবার ভিটেবাড়ি হারিয়ে গৃহহারা হয়েছে। এখনো ভা ভাঙ্গণ আতঙ্কে রয়েছেন তীরবর্তী জনপদের জনগণ।

তিনি আরও বলেন, আমি সবেমাত্র উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। শপথ গ্রহণের পর মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গণ ঠেকাতে টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবো। একই সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য জাফর আলমের সহযোগিতায় চকরিয়াবাসীর সুরক্ষা নিশ্চিতে যা করা দরকার সবই করবো।

ঘটনাপ্রবাহ: চকরিয়ায় মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গণে ২ দশকে ১০ হাজার পরিবার বাস্তুহারা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen − 8 =

আরও পড়ুন