আদিবাসী ইস্যুতে সরকারী নীতি অমান্য করলেন দুই সচিব

52b5c0722ae70-round-table

স্টাফ রির্পোটার, রাঙামাটি:
আদিবাসী ইস্যুতে সরকারী নীতি মানছে না সরকারেরই উর্দ্ধতন কোনো কোন কর্মকর্তা। এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মহলে ও পাহাড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে আদিবাসী বিষয়ক বৈঠকে যোগ দিয়ে ধৃষ্টতা প্রদর্শন করছেন বলে মত প্রকাশ করেছে পাহাড়ের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। তারা বলেন,  বাংলাদেশে বিএনপি আওয়ামী লীগ দুই সরকারেরই প্রতিষ্ঠিত নীতি হচ্ছে, এ দেশে কোনো আদিবাসী নেই। দেশের মধ্যে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একাধিক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশে অবস্থিত আদিবাসী বিষয়ে কনসার্ন বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে সরকারী নীতি পুর্নবিবেচনার দাবী জানালে বাংলাদেশ সরকার তাদেরকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ আর কোনো আলোচনায় আগ্রহী নয়।

পরবর্তীকালে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের একাধিক মিটিংয়েও সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশ সরকার দেশের মধ্যে আদিবাসী বিষয়ক কোনো অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে গোপন প্রজ্ঞাপন জারী করেছে। এ ছাড়াও রাষ্ট্রীয় ও ব্যাক্তিগত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য আদিবাসী ব্যবহার বারিত করে গোপন সার্কুলার জারী করেছেন। এ ধরণের একাধিক সার্কুলার পার্বত্য নিউজের কাছে রয়েছে।

অথচ এতকিছুর পরও আদিবাসী ইস্যু নিয়ে এক শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তার অতিদরদ ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত মাখামাখিতে দেশে বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়ছে। মুলত সরকারের মাঝে ঘাপটি মেরে থাকা এক শ্রেণির বিদেশী মদদপুষ্ট এজেন্ট ইস্যুটি নিয়ে দেশ ও বিদেশে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছে।

সূত্রমতে, গত ২১ ডিসেম্বর রাজধানীতে অনুষ্ঠিত আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ সংক্রান্ত এক সভায় সরকারের দুইজন সচিব ও এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান যোগ দিয়ে আদিবাসী বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতির বাইরে গিয়ে কথা বলেন। অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ও পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ডের নবদায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব কাজী আখতার হোসেন এবং এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান অংশ নেন। একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই গোলটেবিল বৈঠকে সরকারের দুজন সচিব ছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উপজাতীয় নেতা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেভ দ্য চিলড্রেনের সহায়তায় এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

অথচ সরকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার বিষয়টি এখনও আইন আকারে পাশ করেনি। এমনকি বিষয়টি সম্প্রতি শিক্ষা বিষয়ে সরকারি খসড়া আইনেও আনা হয়নি। জাতীয় শিক্ষানীতিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার বিষয়ে ‘আদিবাসী’ শব্দটি চক্রান্তমূলকভাবে ব্যবহার করা হলেও সংবিধান ও আইনে এই শব্দ পরিহার করা হয়েছে।

তাছাড়া সরকার এ পর্যন্ত তিন তিনবার পরিপত্র জারি করে সরকারি কাগজপত্রে আদিবাসী শব্দবি পরিহার করার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের স্পষ্ট করে নির্দেশ দিয়েছে। তারপর কিভাবে সরকারি উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা আদিবাসী শব্দের ব্যবহার এবং আদিবাসী ই্স্যুতে আলোচনায় অংশ গ্রহণ করায় এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সংগঠনের একাধিক নেতৃবৃন্দ।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাদানের ব্যাপারে তাদের কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি সেখানে আদিবাসী শব্দের ব্যবহারে।

মতপ্রকাশ কারীরা জানান, ইইউসহ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের কয়েকটি সম্প্রদায়কে আদিবাসী হিসেবে পরিচিত করানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। বাংলাদেশের কোথাও আদিবাসী নেই বলে একাধিকবার আন্তর্জাতিক মহলে প্রমাণিত হবার পরও এই মহলটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী ইস্যুতে কাজ করছে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। তারা গত প্রায় দেড়দশক ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আদিবাসী শব্দের প্রয়োগের জন্য সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মীদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করে আসছে। এই মহলটি প্রথমে সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝে আদিবাসী প্রীতি তৈরীর জন্য নিয়মিতভাবে তাদের নানা উপটৌকন দিয়ে হাত করে। পরে হঠাৎ করে মিডিয়ায় এই শব্দের প্রয়োগ শুরু করে।

এক পর্যায়ে সরকারের এ বিষয়ে বোধদয় হলে ২০০৫ সালে মন্ত্রণালয় থেকে এই শব্দ পরিহারের জন্য নির্দেশনা জারি করা হয়। পরে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় স্পেশাল এসিস্ট্যান্স থাকার সময়, পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে ২০০৮ সালে এই দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। যদিও তিনি নিজেই বাংলাদেশে আদিবাসী আন্দোলনের প্রবক্তা। বর্তমান সরকারের প্রথম দিকে আবারো বিষয়টি নিয়ে একশ্রেণীর কর্মকর্তার অতিতৎপরতা দেখে ২০১১ সালে এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তারপরও কর্মকর্তাদের মাথা থেকে আদিবাসী ভূত সরে না যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে মহলটি।

 

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আদিবাসী, উপজাতি
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 + eight =

আরও পড়ুন