টেকনাফে অনুপ্রবেশের দায়ে আটক রোহিঙ্গাদের আদালতে সোপর্দ


মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের জেরে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের দায়ে আটক হওয়া ৫২ জনকে কক্সবাজার আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। বিজিবি বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের দায়ে মামলা করার পর পুলিশ এই পদক্ষেপ গ্রহণ করে। মঙ্গলবার আটক এসব রোহিঙ্গাদের টেকনাফ থানা থেকে কক্সবাজার আদালতে আনা হয়।
এছাড়া মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে টেকনাফে গুলিবিদ্ধ শিশু আশংকাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে সীমান্ত দিয়ে চলমান সংঘাতের রেশ এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও আতঙ্কের সৃষ্টি করছে। টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তে ওপারের গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি আরাকান আর্মির ছোড়া গুলিতে একটি শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। এছাড়া, সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে এক বাংলাদেশি জেলের পা বিচ্ছিন্ন হওয়া ও অপর এক ব্যক্তির পায়ে গুলি লাগার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। মঙ্গলবার বেলা ১১ টারদিকেও মিয়ানমার অভ্যন্তরে বোমার শব্দ এপারে ভেসে আসে।
সীমান্তবর্তী বাসিন্দারা বলছেন, ওপার থেকে আসা অনাকাঙ্ক্ষিত গোলাগুলি এবং মাইনের আঘাতে তারা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। প্রতিনিয়ত প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তাদের দৈনন্দিন কাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে। সীমান্তে বিজিবির টহল জোরদার করা হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ কমছে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সীমান্তবাসীদের সতর্ক অবস্থানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
হেয়াইক্যং তেচ্ছিব্রীজ এলাকার বাসিন্দা ছৈয়দ আলম জানান, খুবই আতংকে বাড়িতে সময় কাটায়। কখন মিয়ানমারের দিক থেকে গুলি বা মর্টারশেল এসে বাড়িতে পড়ে এই ভয়ে থাকি সারাক্ষণ। আমরা নাফ নদীতে মাছ, কাকড়া শিকার করে জিবীকা নির্বাহ করি। এখন মাইন পুঁতে রাখায় ভয়ে যেতে পারছিনা। আমরা সরকার ও বিজিবির হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
অপরদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের রেশ ধরে টেকনাফ সীমান্তে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নাফ নদী ও সীমান্ত ঘেঁষা চিংড়ি ঘেরগুলোতে আরাকান আর্মির সদস্যদের মাইন পুঁতে রাখার খবরে স্থানীয় জেলে ও লবন শ্রমিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাণভয়ে জেলে ও শ্রমিকরা কাজে যেতে না পারায় পরিবারগুলো এখন উপার্জনের পথ হারিয়ে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত রেখা বরাবর এবং নাফ নদীর তীরবর্তী অনেক পয়েন্টে মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি মাইন বিস্ফোরণে বাংলাদেশি জেলের পা বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনায় এই আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ওপার থেকে আরাকান আর্মির সদস্যদের ক্রমাগত গুলিবর্ষণ।
ভুক্তভোগী জেলেরা জানান, নাফ নদী ও সংলগ্ন ঘেরগুলোই তাদের জীবন-জীবিকার একমাত্র উৎস। কিন্তু এখন সেখানে পা রাখা মানেই মৃত্যুর মুখে পড়া। কয়েকদিন ধরে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় ঘরে খাবার নেই, অথচ জীবন বাঁচাতে কাজেও যেতে পারছেন না। কোনো কোনো জেলে পরিবার অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে, যা নিয়ে সীমান্ত জনপদে তীব্র জনরোষ তৈরি হচ্ছে।
সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের দাবি, অবিলম্বে সীমান্ত এলাকা থেকে মাইন অপসারণ ও জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি ও প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় এই ক্ষোভ বড় ধরনের অসন্তোষে রূপ নিতে পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সীমান্তবাসীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হলেও জীবিকার সংকটে থাকা এসব মানুষের চোখে-মুখে এখন কেবলই অনিশ্চয়তা।
টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. সাইফুল ইসলাম জানান, রোববার টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আটক ৫৭ রোহিঙ্গাকে বিজিবি আটক করে থানায় হস্তান্তর করে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই করে নাফ নদীতে মাছ আহরণকারি ২ বাংলাদেশি নাগরিক সহ নিরীহ ৪ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া অপর ৫৩ জনের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশ আইনে বিজিবির উখিয়া ৬৪ ব্যাটালিয়নের সদস্য নায়েক ছরওয়ারুল মোস্তফা বাদী হয়ে রোববার রাতে টেকনাফ থানায় মামলা দায়ের করেন। এদের মধ্যে একজন গুরুতর আহত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে মামলার এজাহারভূক্ত ৫২ জনকে কক্সবাজার আদালত হাজির করা হয়েছে।

















