দুর্গম কুরুকপাতা কেবল নামেই ইউনিয়ন, নাগরিক সুবিধা এখনো অধরা

fec-image

‎বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভৌগোলিক দুর্গমতা এবং নাগরিকদের প্রশাসনিক সেবার সুবিধার্থে ২০১৪ সালে ২টি ইউনিয়নকে বিভক্ত করে ৪টি ইউনিয়ন গঠন করা হয়। যার একটি হচ্ছে কুরুকপাতা ইউনিয়ন। তবে যেসব নাগরিক সুযোগ-সুবিধার জন্য কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করা হয় এক যুগ পরেও তা অধরাই রয়ে গেছে।

‎আগে যে কোনো প্রশাসনিক প্রয়োজনে তাদের উপজেলা সদরে আসতে হত। এখন নতুন ইউনিয়ন গঠনের পরেও তাদের সেখানেই আসতে হয়। কারণ কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের কোনো ভবন নেই।

‎দীর্ঘ এক যুগ ধরে উপজেলা সদর এলাকায় একটি পাকা ঘর ভাড়া নিয়ে কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী দুর্গম কুরুকপাতার পুরো ইউনিয়ন এখনও সম্পূর্ণ মোবাইল নেটওয়ার্কবিহীন। পৌঁছায়নি বিদ্যুৎ সংযোগও।

‎আলীকদম উপজেলা সদরে পানবাজার এলাকায় কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়। ভাড়া নেওয়া ঘরে ডিজিটাল ব্যানার টাঙ্গিয়ে পরিষদের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ইউনিয়নটি পুরোপুরি ম্রো অধ্যুষিত এলাকা। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের কিছু বসতি থাকলেও সংখ্যা খুবই কম। তার বাইরে এই ইউনিয়নে তৈনখালের দোছড়ি এলাকায় তঞ্চঙ্গ্যা ও চাকমারাও বসবাস করেন।

‎বান্দরবানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল হল সাঙ্গু ও মাতামুহুরী। এর মধ্যে মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনাঞ্চল পড়েছে এই কুরুকপাতা ইউনিয়নে। ১৮৮১ সালে ব্রিটিশ শাসনের সময় তৈরি করা এই বনাঞ্চলের আয়তন এক লাখ ২ হাজার একর।

‎যাতায়াতে খরচ অন্তত ২ হাজার টাকা, আলীকদম উপজেলা সদর থেকে কুরুকপাতা-পোয়ামুহুরী সীমান্ত সংযোগ সড়ক যেখানে এসে শেষ হয়েছে, তার নাম দরিপাড়া। দরিপাড়া থেকে আরও এক ঘণ্টা হাঁটার পথ সেন্দুপাড়া। ৩৫ বছর বয়সী চিংতুই ম্রো এই সেন্দু পাড়ার বাসিন্দা।

‎কুরুকপাতা বাজার পাড়া এলাকা, এখানে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ছেলের জন্মনিবন্ধন করানোর জন্য তাকে যেতে হয়েছে উপজেলা সদরের কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে।

‎সেই ভোগান্তির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা থাকি একেবারে দুর্গম এলাকায়। নিজ পাড়া থেকে পাহাড় ডিঙিয়ে, খাল-ঝিরি পার হয়ে প্রথমে আসতে হয়েছে দরি পাড়ায়। সেখান থেকে ভাড়ার মোটরসাইকেলে চেপে যেতে হয় উপজেলা সদরে। একবারের ভাড়া এক হাজার টাকা; আসা-যাওয়ায় খরচ হয় দুই হাজার টাকা।”

‎তিনি বলেন, “কম দামে ছোট মাছ অথবা সবজি দিয়ে খেলে একবেলা ভাতের দাম আসে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। আর জরুরি কোনো কাজের প্রয়োজনে এক পরিবারে দুই সদস্য উপজেলা সদরে গেলে মোট খরচ হয় চার হাজার-সাড়ে চার হাজার টাকা।”

‎রুমতুই ম্রো বলেন, “আমার তিনজন ছেলেমেয়ের সবারই জন্মনিবন্ধন করতে হয়েছে অনেক টাকা খরচ করে। আমাদের চাইতে অনেকেই আরও ভেতরে পাড়ায় থাকে। তাদের অবস্থা আরও খারাপ।”

‎বেশি ভোগান্তি জন্মনিবন্ধনে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের এক পাড়াপ্রধান ইয়াংরিং কারবারী বলেন, “আমার পাড়ার বেশিরভাগ মানুষ জন্মনিবন্ধন করার ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে করতে পারে না। তারা সবসময় যার যার জুমচাষের কাজে ব্যস্ত থাকে।

‎“একদিকে তারা অসচেতন। অন্যদিকে এত টাকা খরচ করে তাদের উপজেলা সদরে আসার সুযোগ নেই। তারা নিজেদের পরিচয়পত্র এবং ছেলেমেয়ের নাম-বয়স তথ্য দিয়ে মেম্বারকে খুঁজে নিয়ে তার হাতে তুলে দেয়। পরে এ রকম কয়েকটা জমা হলে মেম্বারই ইউনিয়ন পরিষদের এসে জন্মনিবন্ধন করায়। কেউ ঠিক সময়ের মধ্যে জন্মনিবন্ধন করতে পারে না। যারা জন্মনিবন্ধন করাবে তারা টাকা তুলে মেম্বারের হাতে তুলে দেয়।

‎স্থানীয় একজন উদ্যোক্তা বলেন, “আসলে যে যার সুবিধামত উপজেলা সদরে গিয়ে জন্মনিবন্ধন করানোর সুযোগ নেই। এলাকাবাসী অনেকে ফোন করে (পাহাড়ে চূঁড়ায় কিছু কিছু নির্দিষ্ট স্থানে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়) অথবা খুঁজে নিয়ে তার মাধ্যমে সন্তানের জন্মনিবন্ধন করায়। বেশ কিছু আবেদন জমানোর পর একসঙ্গে উপজেলা সদরে গিয়ে করানো হয়।” কিন্তু সেখানে গিয়ে অতিরিক্ত ফি নেওয়াসহ অনেক সমস্যা পোহাতে হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, “আমি একজন উদ্যোক্তা। কোন জায়গায় কত খরচ হয় আমার জানা আছে। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে নিবন্ধন করলে নির্ধারিত ফি ৫০ টাকা নেওয়ার কথা। সেখানে নিচ্ছে ২০০ টাকা করে।

‎এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদে গেলে একবার বলা হয়, সার্ভার কাজ করে না। আরেকবার বলা হয়, চেয়ারম্যান মিটিংয়ে ব্যস্ত। ঠিক সময়ে কাজ হয় না তখন। এক দিনের জায়গায় দুদিন লেগে যায়। খরচও বাড়তি লাগে। তিনি বলেন, “আবার অনেক সময় আবেদনপত্র জমা দেওয়ার পর তারা হারিয়ে ফেলে। তখন নতুন করে জন্মনিবন্ধনের আবেদন করতে হয়। এখনও আমার মাধ্যমে দেওয়া ৪৫টার মত জন্মনিবন্ধন পেন্ডিং আছে। কখন হয় ঠিক নাই। তবে শুধু জন্মনিবন্ধন নয়; পরিষদের আরও বিভিন্ন কাজের প্রয়োজনে হাজার টাকা খরচ করে এভাবে সামলাতে হয় স্থানীয়দের।

বিনামূল্যে ৩০ কেজি চালের খরচ ১৩০০ টাকা!
‎সামাজিক নিরাপত্তা খাতের অংশ হিসেবে দুস্থ, অসহায় ও দরিদ্র পরিবারদের জন্য সরকারের কিছু খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি রয়েছে। কিন্তু বিনামূল্যের এসব সুবিধা নিতে হাজারের বেশি টাকা খরচ করতে হয় ইউনিয়নের বাসিন্দাদের। যার কারণে সরকারে এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তার মধ্যে ভিজিডির আওতায় কার্ডধারীদের বিনামূল্যে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়।

তবে দরি পাড়া ও সেন্দু পাড়ার কয়েকজন নারী বলেন, ভিজিডির চালগুলো কুরুকপাতা বাজার এলাকায় দেওয়া হয়। ৩০ কেজি চাল নিতে সেখানে যাওয়ার জন্য মোটরসাইকেলের ভাড়ায় আসা-যাওয়ার খরচ হয় এক হাজার টাকা। দুপুরে একবেলা ভাতের দাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। ইউনিয়ন পরিষদে জমা দিতে হয় ১০০ টাকা। চাল উঠানোর খরচ দিতে হয় ৪০ টাকা। মানে বিনামূল্যে দেওয়া ৩০ কেজির চালের জন্য ১৩৪০ টাকা খরচ করতে হয়।

‎এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুরুকপাতা ইউপি চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, কুরুকপাতা বাজার এলাকা পয়েন্ট ছাড়াও ভিজিডি চাল বিতরণের জন্য কালিয়াছড়া, দোছড়ি ও পোয়ামহুরী পয়েন্টে গিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। “পরে পোয়ামুহরী এলাকায় খাদ্য মজুদ রাখার মত উপযুক্ত জায়গা না পাওয়ায় সেখানে ভিজিডি চাল পাঠানো যায়নি। উপকারভোগীদের বলেছিলাম, যারা কার্ডধারী তারা যেন ইউএনও বরাবরে একটা আবেদন করে যাতে পোয়ামুহুরী এলাকায় গিয়ে ভিজিডি চাল বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়।”

‎তিনি বলেন,আর ইউনিয়ন পরিষদ যে ১০০ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়, সেটা সঠিক নয়। মূলত কুরুকপাতা বাজার এলাকায় চাল দেওয়ার সময় গ্রাম পুলিশের সহযোগিতা নেওয়া লাগে। শ্রমিকও নিতে হয়। একজন শ্রমিক ৮০০-৯০০ টাকার নিচে কাজ করতে চায় না। এগুলো মেইনটেইন করার জন্য ২০-২৫ টাকার মত করে সামান্য কিছু নেওয়া হয়। তবে অনেক এলাকায় নিজে না গিয়ে উপকারভোগীরা নিজেদের কার্ড সংগ্রহ করে কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিছু খরচ তাদেরকে দিয়ে এসব চাল নিয়ে আসা হয় বলেও জানা গেছে।

‎একটাই কমিউনিটি ক্লিনিক, তাও স্বাস্থ্যকর্মী নেই, কুরুকপাতা ইউপি চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, এলাকাগুলো মূলত ম্যালেরিয়া প্রবণ এলাকা। কিন্তু কাছাকাছি এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলে ছোটোখাটো অসুখের জন্য স্থানীয়দের অনেক টাকা খরচ হয়। তিনি বলেন, “৬ নম্বর ওয়ার্ডের একটি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী নেই। এখন শূন্যপদ রয়েছে। জ্বর, ম্যালেরিয়া এবং ডায়রিয়া সংক্রান্ত ব্যাপারে বেসরকারি সংস্থার স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু বড় কোনো অসুবিধা হলে এলাকার সবাই বাধ্য হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। তবে এতে খরচ ও ভোগান্তি অনেক।”

লাওলি ম্রো নামে দরি পাড়ার এক বাসিন্দা বলেন, পোয়ামুহুরী বাজারে ফার্মেসি দোকান রয়েছে। সাপ্তাহিক বাজারে আসলে অনেকেই প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ওষুধপত্র নিয়ে যায়। এগুলো দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসাগুলো সামলায় তারা। প্রতিবছর বর্ষার আগে অনেক এলাকায় ডায়রিয়া হয়। তখন চিকিৎসার অভাবে মারাও যায় কেউ কেউ।”

‎শিক্ষায় যোগাযোগ বিছিন্নতার সমস্যাঃ-যোগাযোগ বিছিন্নতাই এখানকার শিশুদের শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকার প্রধান সমস্যা বলে জানিয়েছেন কুরুকপাতা বাজার পাড়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুসামা।

‎তিনি বলেন,আমাদের স্কুলে মোট ১১৭ শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের কত পাহাড়, কত ঝিরি পার হয়ে স্কুলে আসতে দেখি। এ কারণে আমাদের স্কুলটা আবাসিক পদ্ধতির।”লেখাপড়ার মান ভালো করার জন্য অভিভাবক এবং স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের উদ্যোগে এটা করা হয়েছে। কোনো সরকারিভাবে না। আবাসিক সিস্টেমে ৭০ জন ছেলেমেয়ে রয়েছে। বাবুর্চি রয়েছে দুজন। আমরা পাঁচজন শিক্ষক রুটিন করে তাদের দেখভাল করে থাকি।

‎তবে তার জন্য শিক্ষকরা বাড়তি কোনো সুবিধা নেন না জানিয়ে তিনি বলেন, “মানবিক বিষয় বিবেচনা করে পড়াই আমরা। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার মান ভালো। কিন্তু যোগাযোগ বিছিন্নতাই প্রধান সমস্যা। তবে আবাসিক হওয়ায় অনেক দূর-দূরান্ত থেকে এসে ছেলেমেয়ে পড়তে পারে। সরকারি সহযোগিতা পেলে ছেলেমেয়েদের জন্য আমরা জায়গাও দিতে পারতাম না। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কজনিত সমস্যার কারণে কোনো মাল্টিমিডিয়ার ক্লাস করানো সম্ভব হয় না জানিয়ে প্রধান শিক্ষক আবু সাফা বলেন, “মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের ভাল আগ্রহ রয়েছে। উৎসাহ আছে। কিন্তু নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেটজনিত কারণে তাদেরকে ক্লাস করানো যাচ্ছে না। “২০২৩ সালে কম্পিউটার ও দুইটা সোলার দেওয়া হয়েছিল। কোভিডে স্কুল বন্ধের সময় ব্যবহার না করার কারণে সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। পরে শিক্ষকরা টাকা তুলে ঠিক করেছিলাম। পরে আবার নষ্ট হয়ে যায়।”

একজন ইউপি সদস্য যেভাবে নাগরিক সেবা দেন,কুরুকপাতা বাজার পাড়ায় দীর্ঘদিন ব্যবসা করেছেন লেংক্লাম ম্রো। ঘর তৈরি এবং ইঞ্জিনবোট চালিত বিভিন্ন স্টেশনারি জিনিসপত্র রয়েছে তার দোকানে। পাশাপাশি তিনি কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। সাপ্তাহিক বাজারের দিনে আদা-হলুদ সংগ্রহ করে উপজেলা সদরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেন তিনি। একইসঙ্গে সেরে আসেন ইউনিয়ন পরিষদের কাজ।

‎ইউপি সদস্য লেংক্লাং ম্রো বলেন, “আমার ওয়ার্ডে ১৪টি পাড়া রয়েছে। সবগুলো দূরে দূরে। একেবারে তৈন খালের আগায়। কোনো সালিশ-বিচার থাকলে কিংবা যে কোনো জরুরি প্রয়োজন হলে এলাকায় যাই। তবে এলাকার লোকজনও সবসময় বাজারে আসে। প্রতি সপ্তাহে একবার করে সবার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। তাদের কোনো প্রয়োজন থাকলে বাজার দিনে এসে কাজ দিয়ে যায়। পরে উপজেলা সদরে গিয়ে করি। অফিসের কাজে উপজেলায় এলে সপ্তাহে তিন-চার দিন থাকি।

‎এলাকার দুর্গম অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, “একসময় নদীপথ হয়ে উপজেলা সদরে যেতাম। দুই ঘণ্টার কিছু বেশি সময় লাগত। শুষ্ক মৌসুমে হলে পানি কম হওয়ায় চার ঘণ্টা লাগত। কিন্তু খরচ একই। এখন সীমান্ত সংযোগ সড়ক হয়েছে বেশি দিন হয়নি। এখন মোটরসাইকেলে করে আসা- যাওয়া ১ হাজার টাকা খরচ হয়। এক ঘণ্টার মত সময় লাগে।”

‎ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে এসব মেনে নিয়ে এভাবে কাজ করতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “কিছু করার নেই। এখানে অফিস চালানোর মত বিদ্যুৎ নাই। জেনারেটর নাই। এখন বেশির ভাগ কাজ তো অনলাইনে করতে হয়। অথচ এখানে এখনও মোবাইল নেটওয়ার্ক পর্যন্ত নাই। সে কারণে একটা ফটোকপি করতেও উপজেলা সদরে যাওয়া লাগে।”

‎বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওর্য়াকই প্রধান সমস্যা
‎কুরুকপাতা ইউপির চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী কুরুকপাতা ইউনিয়নে ১৫ হাজার জনসংখ্যা রয়েছে। তবে আমাদের হিসাবে আরও বেশি হবে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১১টি। কমিউনিটি ক্লিনিক আছে মাত্র একটা।

‎ইউনিয়ন পরিষদের ভবন নির্মাণের জটিলতা নিয়ে তিনি বলেন, “ভবনের ব্যাপারে একটা নিয়ম রয়েছে, ভবন নির্মাণ করতে হলে প্রথমে ৬০ শতক জমি দান করার জন্য একজন দাতা লাগবে। শুরুতেই বায়নামা ও রেজিস্ট্রেশন করতে তাকে লাখ-দুই লাখ টাকা দিতে হবে। সেখানে ৬০ শতক জমি দান করার মতও কেউ নেই।

জায়গা কিনেও যদি করি এক শতকের দাম এক লাখ করে ৬০ লক্ষ টাকা আসবে। এত টাকা ইউনিয়ন পরিষদেও নাই।

‎তাহলে এসব ভোগান্তি কিভাবে সমাধান করা যায় এমন প্রশ্নের জবাবে এ জনপ্রতিনিধি বলেন, “সব সমস্যার সমাধান বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কের মধ্যে। এসব থাকলে কুরুকপাতা বাজারে একটা ভাড়া নিয়ে হলেও অফিস চালানো যেত। এসব কিছুর জন্য তো ফোর জি নেটওয়ার্ক লাগবে। তিনি বলেন, “মোবাইল কোম্পানি রবি, গ্রামীণ, টেলিটক এবং বাংলালিংক প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জায়গা পরিদর্শনও করে গেছে। কিন্তু এলাকার কোথাও বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ ছাড়া সোলার দিয়ে তারা কোনো মোবাইল টাওয়ার বসাতে চায় না।

‎বিষয়ে দীর্ঘদিন পাহাড়ে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে সাংবাদিক ফরিদুল আলম সুমন বলেন, “দূরত্ব ও দুর্গমতার কারণে পার্বত্য এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়। একটি ইউনিয়নে ১৫ হাজার মানুষের সরকারি সেবা পেতে এত দূরে উপজেলা সদরে আসা অসম্ভব। এই মানুষগুলোর চরম ভোগান্তি হচ্ছে। খরচও প্রচুর হচ্ছে।

‎“সেই তুলনায় ইউনিয়ন পরিষদের অফিসে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা এবং স্টার লিংকের ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার খুব বেশি ব্যয়বহুল নয়। সরকার যদি দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টারে ব্যালট পাঠিয়ে ভোট সংগ্রহ করতে পারে। তাহলে বিশেষ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেটও দিতে পারার কথা।”

‎ভবন নির্মাণে জায়গা পেলে বরাদ্দও দ্রুত হবে,এ বিষয়ে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, কুরুকপাতা ইউনিয়নে ভবন নির্মাণ বিষয়ে কাজ শুরু হচ্ছে। আলীকদমের চারটা ইউনিয়নের তিনটাতেই কোনো স্থায়ী ভবন নাই। শুধু চৈক্ষ্য ইউনিয়নেই স্থায়ী ভবন আছে।

‎তিনি বলেন, “ভূমি অফিসকে জায়গা দেখতে বলেছি। উপযুক্ত জায়গা পেলে স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হবে। দ্রুত প্রস্তাব পাঠাতে পারলে তারাও দ্রুত বরাদ্দ পাঠানোর কথা বলেছে। তবে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছানো এখনও খুবই চ্যালেঞ্জিং।”

‎স্থানীয়দের অন্য ভোগান্তি নিয়ে তিনি বলেন, বিষয় গুলো আমরা নিজেরাই দেখেছি। ভিজিডি চাল বিতরণের জন্য কালিয়াছড়া, দোছড়ি ও পোয়ামুহুরী পয়েন্টে গিয়ে দেওয়ার জন্য চেয়ারম্যানকে বলা আছে। বাড়তি খরচ লাগলে কিছু খরচ এখান থেকে দেওয়ার কথাও বলেছি। তাদের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে এবার ভিজিডি চাল পোয়ামুহুরী এলাকায় গিয়ে বিতরণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আলীকদম
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন