পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আনন্দে ভাসছে পর্যটন জেলা কক্সবাজারবাসী

fec-image

একটি সেতুর অভাবে দেশের ১৯টি জেলার মানুষ অবারিত সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত ছিল। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অর্থনৈতিক মন্দাভাব লেগেই থাকত। এত বছর বড় কোনো শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। পর্যটন খাতও বেশ পিছিয়ে। জীবন-জীবিকার তাগিদে ঢাকামুখী স্রোত ছিল মানুষের। পদ্মা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ উপকূলের কৃষি, পর্যটন ও শিল্প বিকাশের অবারিত সম্ভাবনা দেখছেন এ অঞ্চলের মানুষ। যোগাযোগের ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় সুফল মিলবে সামগ্রিক অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায়। ১৯ জেলাকে যুক্ত করছে পদ্মা সেতু। দেশের ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরো একটি মাইলফলক সম্ভাবনা।

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পদ্মা নদীর উপর নির্মিত ‘পদ্মা সেতু’ উদ্বোধন হচ্ছে আগামী ২৫ জুন। কাঙ্খিত এই সেতু নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই। কক্সবাজারে রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি, পর্যটন ব্যবসায়ী, পরিবহন ব্যবসায়ী, নারী ও সুশীল সমাজ কী ভাবছেন? তা তুলে ধরেছেন আমাদের কক্সবাজারের নিজস্ব প্রতিদেবক।

জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী একজন দক্ষ কারিগর। তার যোগ্য নেতৃত্বে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। এই যাত্রার সফল বাস্তবায়ন পদ্মা সেতু। বাঙালি জাতির সাহস রয়েছে, এখানে আবার প্রমাণিত। শেখ হাসিনা যতদিন বেঁচে থাকবে উন্নয়ন, অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন পদ্মা সেতু, যার সফল কারিগর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যেটা বাংলাদেশের মানুষ হয়তো ১০০ বছর পরে ভাবতো সেটি প্রধানমন্ত্রী বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। বিশ্বব্যাংকসহ দাতাসংস্থাগুলো যখন মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন শেখ হাসিনার দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তেই পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন হয়েছে। পদ্মা সেতু করে কালের সাক্ষী হয়ে রইলেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার উন্নত কারিগর শেখ হাসিনা। আগামী ২০৪১ সালে পৃথিবীর উন্নত, সুখী-সমৃদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় রূপ নেবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।

বিএনপির কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক ও কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শিল্পপতি লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, পদ্মা সেতুর প্রয়োজন ছিল। তবে নির্মাণ ব্যয় বেশি হয়ে গেছে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন পদ্মা সেতুর সমীক্ষায় যে ব্যয় (দশ হাজার কোটি) এর হিসাব ধরা হয়েছিল তার থেকে এখন প্রায় তিনগুণ বেশি। তিনি আরও বলেন, কর্ণফুলী, যমুনা, লালনসহ অনেক সেতু নির্মাণ করেছে বিএনপি। সরকারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া দেশের উন্নয়ন করা। তবে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, জনগণের টাকার যাতে অপচয় না হয়।

কক্সবাজার পৌরসভার প্যানেল মেয়র-২ (ভারপ্রাপ্ত মেয়র) মো. হেলাল উদ্দীন কবির বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণ করে অসাধ্যকে সাধন করেছেন। যেখানে বিশ্ব ব্যাংক অর্থায়ন করবে না বলেছে, সেখানে মাথা নত না করে বিশ্বের দরবারে মাথা উছু করে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এ দেশের জনগণের অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ করব।’ সেটি করে দেখিয়েছে। আজকে বাংলাদেশ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ হিসেবে বিশ্বের দরবারে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। ২৫ জুন উদ্বোধনের অপেক্ষায়। দেশবাসীর সাথে কক্সবাজার জেলা এবং পৌরবাসীও স্বপ্নের সেতু দেখবে উৎসবমুখর পরিবেশে। জননেতা হেলালের মতে, পদ্মা সেতুর কারণে পর্যটকরা কক্সবাজারে নির্ভয়ে বিচ দেখতে আসবে এবং ব্যবসায়ীরা অনেক উপকৃত হবে।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, পদ্মা সেতু আমাদের বিশাল অর্জন। যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। জাতি হিসেবে আমাদের সক্ষমতার একটি বহিঃপ্রকাশ এই পদ্মা সেতু।

কক্সবাজার পৌর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্যানেল মেয়র শাহেনা আক্তার পাখি বলেন, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের স্বপ্নের সেতু। এটি ১৬ কোটি মানুষের জীবনের উপর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলবে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি এই সেতু দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখবে।

কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের জন্য অনন্য সাধারণ একটি অর্জন। এটি আরও একবার বাংলাদেশের মাথা উঁচু করল বিশ্বের দরবারে। এখন এই অভূতপূর্ব অর্জনের বিরূপ প্রভাবগুলো দক্ষ ব্যবস্থাপনায় সামাল দিতে না পারলে সৃষ্টি হতে পারে ভয়াবহ যানজট কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত নদী ভাঙ্গন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অসম সাহসী পদক্ষের এই অর্জন এক কথায় অতুলনীয় ও অবর্ণনীয়।

জাহাজ মালিক সমিতি (স্কোয়াব) সভাপতি তোফায়েল আহমেদ বলেন, নিঃসন্দেহে পদ্মাসেতু দক্ষিণ বঙ্গের ১৬টি জেলাসহ বাংলাদেশের আপামর জনগণের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। বর্তমান সরকারের বিশাল উন্নয়নের কর্মযজ্ঞের মধ্যে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নই সর্বোচ্চ অর্জন।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম নেওয়াজ বলেন, পদ্মা সেতু বাঙালি জাতির স্বপ্ন। এটি একটি চ্যালেঞ্জের নাম। সেই লালিত স্বপ্ন আর চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পদ্মা সেতুর সাথে সেসব জেলার সম্পর্ক সেসব এলাকার পর্যটকরা কক্সবাজার আসবে অনায়াসে। পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা গর্বিত।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল-পরিবর্তন। দেশের ইতিহাসে আলোচিত মেগাপকল্প হচ্ছে পদ্মাসেতু। বহু তর্কবিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত মাথা তুলে দাঁড়িয়ে গেল স্বপ্নের সেতুটি। যার মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের সাথে সড়ক পথে সেতুবন্ধন হল।

এইচএম নজরুল বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর ধরে উত্তরবঙ্গের মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল পদ্মা নদী পার হয়ে জীবন যাপন করলেও এখন সেটি অতীত হয়ে যাবে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঢাকার সাথে সময়ও কমে আসবে। এতে ঢাকায় চাকুরিরত বহু মানুষ প্রতিদিন আসা-যাওয়ার মাধ্যমে চাকুরি করার সুযোগ পাবে। ঢাকার উপর ভাড়া বাসার চাপ কমতে পারে। তবে টোল আদায়ে আরেকটু নমনীয় ভাব নেওয়া দরকার ছিল মন্তব্য করেন নাগরিক সমাজের এই নেতা। তার মতে, টোল বাড়তি থাকলে উত্তরবঙ্গ থেকে আসা নানা কৃষি পণ্যের দাম বাড়বে, এটি নিশ্চিত বলা যায়।

কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, পদ্মা সেতুর সুবাদে মৎস্য খাতে জড়িতরা প্রচুর উপকৃত হবে। দ্রুত মাছ সরবরাহ করতে পারবে। তাজা মাছ পাবে ভোক্তারা। শুধু সেতু সংলগ্ন এলাকাবাসী নয়, দেশের অন্যান্য এলাকার মানুষ সুফল ভোগ করবে। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মাইলফলক ভূমিকা রাখবে।

কক্সবাজার বাস পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মিয়াজি বলেন, পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক ও রেল যোগাযোগের মাধ্যম পদ্মা সেতু। এই সেতুটির ওপর দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করবে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব অংশের পরিবহন সংযোগ স্থাপিত হবে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় দেখবে নতুন আলোর মুখ। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করে পরিবহন সেক্টরে আসবে উন্নয়ন। পদ্মা সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে পরিবহন খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে মনে করেন তিনি।

উল্লেখ্য, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের পদ্মা নদীর উপর নির্মিত একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। এর মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের সাথে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা যুক্ত হয়। দুই স্তর বিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাসের এই সেতুর উপরের স্তরে চার লেনের সড়ক পথ এবং নিচের স্তরে একটি একক রেলপথ রয়েছে। পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর অববাহিকায় ৪২টি পিলার ও ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১টি স্প্যানের মাধ্যমে মূল অবকাঠামো তৈরি করা হয়। সেতুটির দৈর্ঘ্য ৬.১৫০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ১৮.১০ মিটার।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: উদ্বোধন, কক্সবাজার, পদ্মা সেতু
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen − 6 =

আরও পড়ুন