পার্বত্যাঞ্চলের বাঙালিরা যেন নিজভূমিতেই পরবাসী

fec-image

স্বাধীন রাষ্ট্রের সর্বত্রই দেওয়ানী আইন-কানুন একই রকম হওয়ার কথা। অথচ দেশের পার্বত্য অঞ্চলের তিন জেলায় ভূমি ব্যবস্থাপনায় বিরাজ করছে ভিন্ন আইন। ‘পার্বত্য বিশেষ অ্যাক্টের’ মারপ্যাঁচে এখানকার ভূমি ব্যবস্থাপনা, কেনাবেচা ও বরাদ্দসহ সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন উপজাতি নেতারা। এক সম্প্রদায় হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা জমির কাগজপত্র নিয়েই বসবাস করলেও সেখানে ভূমি সংক্রান্ত সব কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা সবই উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর হাতে। আগামীকাল ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তির ২২ বছর পূর্ণ হলেও এখন পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি জটিলতা নিরসন হয়নি।

সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে পার্বত্য অঞ্চলে উপজাতি নেতা বা কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থে ‘ইচ্ছাকৃত’ জটিলতা সৃষ্টি করে রেখেছেন।

পার্বত্য অঞ্চল ঘুরে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, নিরসন বা সুষম বন্টন প্রক্রিয়ায় পার্বত্য বাঙালিদের কোনো প্রতিনিধিও রাখা হয়নি। এর ফলে পাহাড়ি ভূমির মালিকানা বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছাচারিতার যথেষ্ট আশঙ্কা দেখছেন পাহাড়ের বাঙালিরা। কেননা, পার্বত্য ভূমি জটিলতা নিরসনে গঠিত কমিশনের সব সদস্যই উপজাতি। একজনও পার্বত্য বাঙালি প্রতিনিধি নেই। একজন সাবেক বিচারপতিকে প্রধান করে গঠিত ওই পার্বত্য ভূমি কমিশন এ বিষয়ে কাজ করছে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াটির গতিও অন্তত মন্থর বলে জানা যায়।

এ অবস্থার মাঝেই অনেক আগে থেকেই পার্বত্য বাঙালিদের ৮০ শতাংশ বাসিন্দা কাগজপত্রসহ জমিতে বসবাস করলেও বেশিরভাগ উপজাতি বাসিন্দারই সে রকম কাগজপত্রও নেই। তারপরও বাঙালিদের জমিই দখল করা হচ্ছে হরহামেশায়। এর ফলে পার্বত্য অঞ্চলে নিজ ভূমে যেন পরবাসের মতো জীবনযাপন করছেন শান্তিপ্রিয় বাঙালিরা।

বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পার্বত্য বাঙালি নেতা কাজী মো. মুজিবুর রহমান বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের জন্য গঠিত ল্যান্ড কমিশন সংস্কার করা দরকার। এই কমিশনে কোনো বাঙালি প্রতিনিধি নেই। এর ফলে বাঙালিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি বাঙালিদের জন্য আরও বড় ফাঁদ বা বিপদের কারণ হচ্ছে এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কারই আপিলের সুযোগ নেই। তাহলে বিষয়টি কোথায় দাঁড়াতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

মুজিবুর রহমান বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে শুধু ভূমি নয়, উপজাতিদের সঙ্গে বাঙালিদের জাতীয় রাজনীতি, নাগরিক সেবা ও অধিকারসহ নানা ক্ষেত্রে ব্যাপক অসঙ্গতি ও বৈষম্য রয়েছে। এখানে উপজাতিরা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন সেই একই স্থানে বসবাস করেও বাঙালিরা তার কিছুই পাচ্ছেন না। উপজাতিরা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও শুল্কমুক্ত সুবিধা পান, বাঙালিরা পান না। পার্বত্য বাঙালিরা পরিচয়পত্র থেকে শুরু করে জমি লিজ নিতে গেলেও দায়িত্বে থাকা উপজাতি নেতা বা কর্তাব্যক্তিরা তা দিচ্ছেন না। বাঙালিদের যেতে হচ্ছে জেলা প্রশাসকের কাছে।

সেখানেও পুরো প্রশাসন উপজাতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তা ছাড়াও পার্বত্য অঞ্চলে যেসব ডিসি বা অন্যান্য প্রশাসনের কর্মকর্তারা দায়িত্বে আসেন তারা এটি ‘শাস্তিমূলক’ পদায়ন মনে করে কোনোরকম সময় পার করে চলে যান। পার্বত্য অঞ্চলে একমাত্র সেনাবাহিনী ছাড়া রাষ্ট্রের প্রতি ভালোবাসা থেকে সেভাবে কেউই তাদের দায়িত্ব পালন করে না। সিভিল প্রশাসনের এ ক্ষেত্রে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে গেলে কিছু সমস্যায় পড়তেও হয়। এ কারণে শান্তিচুক্তির কিছু ধারা পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।

বান্দরবন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা বলেন, এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা ভূমি জটিলতা। এটা নিয়ে পার্বত্য ভূমি কমিশন কাজ করছে। এরই মধ্যে সম্প্রতি একটি কমিশনের বৈঠকও হয়েছে। ভূমি জটিলতা নিরসনে বাঙালি ও উপজাতি উভয় পক্ষকেই একটু ছাড় দিতে হবে। আমি আশাবাদী এ সমস্যার সমাধান হবে।

বান্দরবান জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, জমি নিয়ে এখানেই প্রায় সংঘাত হচ্ছে। বাঙালিদের সঙ্গে উপজাতিদের মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধে বিভিন্ন সময়ে মামলা ও জিডি হচ্ছে। এ নিয়ে অনেক মামলাও হয়েছে। এ বিষয়ে পার্বত্য ভূমি কমিশন কাজ করছে বলে জেনেছি।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ দাউদুল ইসলাম বলেন, পার্বত্য ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন হলে এখানে পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র কৃষি শিল্পের ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব হবে। ইতোমধ্যেই এখানে কফি, কাজু বাদাম, আম, ড্রাগন, চা, কমলাসহ নানা ধরনের কৃষি ফল-ফলাদি উৎপাদিত হচ্ছে। এগুলো শিল্প প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে যথাযথ বাজারজাত করা হলে কেবল পার্বত্য অঞ্চলের নয় গোটা দেশের চেহারায় পাল্টে যেতে পারে।

জানা গেছে, ২০১১ সালের আদম শুমারি অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় এককভাবে বাঙালি প্রায় ৪৯ শতাংশ, বাকি সব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মিলে ৫১ শতাংশ উপজাতি। এই উপজাতিদের মধ্যে রয়েছে চাকমা প্রায় ২৬, মারমা প্রায় ১২, ত্রিপুরা ৭, মুরং ২ এবং তনচংঙ্গ্যা ও অন্যান্য মিলে প্রায় ৪ শতাংশ। এককভাবে বাঙালি প্রধান হলেও শুধু পার্বত্য শব্দের কারণে এখানে উপজাতিরা সব সুযোগ-সুবিধায় ব্যাপক এগিয়ে। ক্ষমতা প্রয়োগে এবং বাস্তবায়নেও তারা অনেক ধাপ এগিয়ে বলে জানান পাহাড়ে বসবাসকারী নিরীহ বাঙালিরা।

জানা যায়, খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার ৫ নম্বর বাবুছড়া ইউনিয়নের সোনামিয়া টিলার বাঙালিদের গুচ্ছগ্রামগুলো তৎকালীন শান্তিবাহিনীর অপতৎপতার কারণে ১৯৮৬ সালে স্থানান্তর করা হয়। কালের পরিক্রমায় বাঙালিদের ফেলে যাওয়া অধিকাংশ জমি উপজাতীয়রা দখল করে নেয়। ২০১৬-২০১৭ সাল পর্যন্ত সোনামিয়া টিলার ৮১২টি বাঙালি পরিবারের সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত খাসভূমি দখল করে নেয় পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ (প্রসিত) এর মদদপুষ্ট উপজাতিরা।

এ ছাড়া খাগড়াছড়ির রামগড়ের গরুকাটা এলাকায় হিন্দু বাঙালি জগদীশ চন্দ্র নাথের তিন একর পাহাড়ি জমিতে স্কুল ঘর ও গুইমারা উপজেলার কুকিছড়ায় সেনাবাহিনীর প্রত্যাহারকৃত ক্যাম্পের পরিত্যক্ত জমিতে বৌদ্ধ মন্দির স্থাপনের মাধ্যমে দখলের অপচেষ্টা চালিয়েছে ইউপিডিএফ। জমি দখল নিয়ে নিয়ে মুখ খুললে পরিবারসহ হত্যা হুমকি দেওয়া হয় জগদীশ চন্দ্রকে।

অতঃপর ভয়ঙ্কর আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গত বছরের ৪ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নিরীহ জগদীশ। স্থানীয় বাসিন্দা ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে শুধু জগদীশের জমি কিংবা সেনাবাহিনীর প্রত্যাহারকৃত ক্যাম্পের পরিত্যক্ত জমিই নয়, এমন অসংখ্য নিরীহ পাহাড়ি বাঙালি মালিকানা পাহাড়ি ভূমি ধর্মীয় উপসানালয় কিংবা স্কুল, ভাবনা কেন্দ্র, কিয়াংঘরসহ নানা নামে কৌশলে দখল করছে উপজাতীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীরা। এসব নিয়ে প্রতিবাদ তো দূরের কথা সামান্য মুখ খুললেই হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ নানা নৃশংসতার শিকার হতে হচ্ছে বাঙালিদের। ফলে জীবনের মায়ায় বাপ-দাদার পাহাড়ি ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্রে চলে যাচ্ছেন বাঙালিরা। অন্যদিকে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নামে সরকারি ও আন্তর্জাতিক নানা সুযোগ ও সহানুভূতি নিয়ে কৌশলে বাঙালিদের বিতাড়িত করছে তারা। ইতোমধ্যেই রামগড়ের গরুকাটা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা সাতক্ষীরার অন্তত ছয়টি পরিবারকে নির্যাতন করে বিতাড়িত করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা।

স্থানীয় সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি কৌশলে পার্বত্য এলাকার এই ভূমি দখলে তৎপরতা চালাচ্ছে উপজাতীয় সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ (মূল) এবং জেএসএস (মূল)।

অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯৮ সালে সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস, সন্তু লারমা) সঙ্গে শান্তিচুক্তির পর যেসব এলাকা থেকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে তার অধিকাংশই ইউপিডিএফ (প্রসীত বা মূল) ও জেএসএসের ইন্ধনে নানা কৌশলে অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে। আর এই দখলের মুখ্য হাতিয়ার হিসেবে সেখানে স্থাপন করা হচ্ছে উপজাতীয়দের নানা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা স্কুল ঘর।

সূত্র: সময়ের আলো

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 + 8 =

আরও পড়ুন