পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলামাইজেশনের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানরাই সবচেয়ে সোচ্চার : মেহেদী হাসান পলাশ


পার্বত্য গবেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক মেহেদী হাসান পলাশ বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলামাইজেশনের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানরাই সবচেয়ে সোচ্চার।
সম্প্রতি নেত্রনিউজ নামের একটি গণমাধ্যমের এ বিষয়ক একটি প্রতিবেদন নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক তোলপাড় হলে ৫ মে বিষয়টি নিয়ে প্রামাণ্য তথ্য ও যুক্তি সহকারে ফেইসবুক পোস্ট দেন মেহেদী হাসান পলাশ। পোস্টে তিনি বলেন যে, ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান সম্প্রদায়ই মূলত ইসলামাইজেশনের বিরুদ্ধে কাজ করছে।
মেহেদী হাসান পলাশ তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, ‘যে গণমাধ্যমটি এই রিপোর্টিং করার জন্য ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করেছে, অনুসন্ধান করেছে, তারা এই প্রকাশ্য সত্যটি খুঁজে পায়নি, দেখেনি বা দেখতে চাইনি। না হলে যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে অন্তত তাদেরকেও একটি প্রশ্ন করতে পারত যে, ইসলামের পাশাপাশি আপনাদের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠিত ক্রিশ্চিয়ান ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে? কেন হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে? যদি গণমাধ্যমটি এই মর্মে রিপোর্ট করত যে, মুরং সম্প্রদায় তাদের আদি ধর্ম হারিয়ে ফেলছে, ধর্মান্তরিত হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মে। এ নিয়ে আমার কোন বক্তব্য থাকত না বরং সেটি লজিক্যাল হত। সেটি সমর্থনযোগ্য হতো। তা না করে তারা প্রিয় ৯০% ধর্মান্তরিত ক্রিশ্চিয়ানদের সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখাচ্ছে, কীভাবে মুরং সম্প্রদায়ের লোকজন এক থেকে দুই পার্সেন্ট মুসলিম হচ্ছে। এটা কতটা বায়াসড রিপোর্টিং তা আর বলার প্রয়োজন আছে কি?’
মেহেদী হাসান পলাশ কয়েক বছর আগে ঢাকায় একটি সেমিনারে মুরং সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলামাইজেশনের বিরুদ্ধে দেয়া বক্তব্য’র প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ;পাহাড়ের ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীরা খুব দ্রুত ইসলামাইজেশন হচ্ছে, সেটা নিয়ে নানা যুক্তি ও তথ্য তুলে ধরলেন। তার বক্তব্য শেষে আমি দাঁড়িয়ে তাকে প্রশ্ন করলাম, আপনার নাম কি? তিনি নামটি বললেন। নামের একটি অংশে ক্রিস্টিয়ান শব্দ যুক্ত ছিল। আমি বললাম, আপনার ধর্ম কি? তিনি বললেন, খ্রিস্টান। আমি বললাম, মুরং সম্প্রদায়ের আদি ধর্ম কি? তিনি বললেন, ক্রামাধর্ম। আমি বললাম, আপনার কাছে সর্বশেষ প্রশ্ন, মুরং সম্প্রদায়ের কত শতাংশ লোক খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে? তিনি বললেন, ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। আমি তখন তাকে প্রশ্ন করলাম, আপনার মুরং সম্প্রদায়ের ৯০ শতাংশ লোক আদি বা ক্রামাধর্ম থেকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। সেটা নিয়ে আপনার কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু একই সম্প্রদায়ের এক থেকে দুই শতাংশ লোক মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে, সেটা নিয়ে আপনার এতো উদ্বেগ। আপনার পূর্বপুরুষ বা আপনি নিজেও খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। সেটা নিয়ে আপনার কোনো বক্তব্য নেই। এ দিয়ে প্রমাণিত হয় যে, আপনি খ্রিস্টানিটি ভার্সেস ইসলাম এই জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলছেন।’
পোস্টে তিনি আরো উল্লেখ করেন, ‘প্রকৃতপক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলামাইজেশনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানরা। বৌদ্ধ সম্প্রদায় এ নিয়ে এত বেশি কথা বলে না। কারণ তারাও এই ক্রিশ্চিয়ানাইজেশনের শিকার। কয়েক বছর আগেও চাক সম্প্রদায়ের লোকেরা ক্রিশ্চিয়ানাইজেশন এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ এবং প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পর্যন্ত দিয়েছিল। চাকরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তবে মিশনারীদের তৎপরতায় বিপুল পরিমাণ চাক বর্তমানে ক্রিস্টিয়ান ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে। বাংলাদেশের ট্রাইবাল সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মান্তরিত হবার যে প্রবণতা তা প্রধানত ক্রিশ্চিয়ানাইজেশনের প্রতি। এভাবেই খিয়াং, বম, পাংখো, লুসাই, গারো সম্প্রদায় শতভাগ ক্রিস্টিয়ানাইজেশন হয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে কোন আলাপ নেই কোথাও।’
তিনি বলেন, ‘১৪৩০ সালের কাছাকাছি সময়ে মিয়ানমারের আরাকানে খুমি সম্প্রদায়ের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে পালিয়ে মুরং বা ম্রো সম্প্রদায় বান্দরবনের লামা, আলিকদম সহ বিভিন্ন উপজেলায় এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন শুরু করে। শুরুতে এই জনগোষ্ঠী সর্বপ্রাণ ধর্ম বা প্রকৃতি পূজারী ছিল। পরবর্তীকালে এদের অনেকে বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। ১৯৮০ সালের দিকে তারা ক্রামা ধর্ম নামে একটি নিজস্ব ধর্মে সৃষ্টি করে এবং এই ধর্ম মুরং সম্প্রদায় গ্রহণ করে। তবে বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ মুরং খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে গেছে। খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হলেও সাংস্কৃতিকভাবে তারা মুরংদের কিছু উৎসব যেমন, গো হত্যা উৎসব- এ জাতীয় উৎসবগুলো পালন করে এবং এগুলো পালনে বাধা দেয় না লোকাল খ্রিস্টান মিশনারীরা। এটা অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রেও সত্য। অন্যান্য সম্প্রদায়ের যারা খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে, তারা খ্রিস্টান ধর্ম পালনের পাশাপাশি তাদের নিজস্ব ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উৎসব পালন করে। যেমন বিজু উৎসব, ফুল পূজা, পানি খেলা ইত্যাদি। এমনকি নাম পর্যন্ত পরিবর্তন করে না। এতে লোকাল মিশনারিগুলো বাধা দেয় না। এটা একটা তাদের কৌশলগত কারণ।’
মেহেদী হাসান পলাশ তথ্য তুলে ধরে পোস্টে উল্লেখ করেন, ‘একটি জনগোষ্ঠী তাদের আদি ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ খ্রিস্টান হয়ে গেছে। সেগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। মিডিয়ায় কোনো রিপোর্ট নেই। কিন্তু এক থেকে দুই শতাংশ মুসলিম হয়েছে, সেটা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্সড একটি গণমাধ্যম বিশাল রিপোর্ট করেছে। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। পাহাড়ে ব্যাপকভাবে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে, সেটা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। কিন্তু কিছু মানুষ মুসলিম হলে সেটা নিয়ে আলোচনা, গবেষণা, রিপোর্টিং এগুলো সবসময়ই ঘটে থাকে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, পাহাড়ে ইসলামাইজেশন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান সম্প্রদায়। এই ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান সম্প্রদায়ই মূলত ইসলামাইজেশনের বিরুদ্ধে।’

















