পার্বত্য চট্টগ্রামে গ্রাম আদালত ও প্রথাগত বিচার এক নয়

fec-image

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গ্রাম আদালত প্রকল্প-২ এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক সরদার আসাদুজ্জামান পার্বত্যনিউজের করা এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, আইন অনুযায়ী গ্রাম আদালত ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় পরিচালিত হবে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামেও এর ব্যতিক্রম নয়।

বাংলাদেশ গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় রাঙামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় স্থানীয় বিচার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে। বুধবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকালে রাঙামাটি শহরের পর্যটন করপোরেশেনের সম্মেলন কক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রোকসানা কাদেরের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মেসবাহুল ইসলাম।

উপস্থিত ছিলেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত এইচ ই রেনজি থিউরিংক, ইউএনডিপি বাংলাদেশ আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মুখার্জী, চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য গৌতম চাকমা, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরীসহ তিন জেলার প্রথাগত (হেডম্যান-কার্বারি) প্রতিনিধি, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

ঢাকার জাতিসংঘ কার্যালয় থেকে এক বার্তায় জানান হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সুবিধা বঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায় বিচারের সুযোগ বাড়াতে স্থানীয় সরকার বিভাগ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউএনডিপির (জাতিসংঘ সহায়তা কর্মসূচি) সহযোগিতায় পার্বত্য অঞ্চলে বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (২য় পর্যায়) প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে ।

প্রথম পর্যায়ের (২০০৬-২০১৫) সফল বাস্তবায়নের ভিত্তিতে, বাংলাদেশের ১ হাজার ৮০টি ইউনিয়নে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউএনডিপি ও বাংলাদেশ সরকারের ত্রিপক্ষীয় অংশীদারিত্বে এই প্রকল্প শুরু হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশের দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আইনিসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো।

বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন বাড়তি আর্থিক সহায়তায় প্রকল্পটি পার্বত্য চট্টগ্রামে সম্প্রসারিত হতে চলেছে। এতে স্থানীয় প্রশাসন আঞ্চলিক ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তাকে আমলে নেয় এবং সুবিধা বঞ্চিত জনগণের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করে। এর মাধ্যমে স্থানীয় সাধারণ মানুষ, বিশেষত নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে। বর্ধিত এই আর্থিক সহায়তার ফলে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ-২ প্রকল্পে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশীদারিত্বের পরিমাণ দাঁড়াল ২৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন ইউরো।

অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মেসবাহুল ইসলাম বলেন, ‘জুডিসিয়াল বিচার ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সরকার এ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষেত্রে এখানকার প্রথাগত আইন রীতিনীতি সংস্কৃতি রক্ষার জন্য এ প্রকল্প সহায়ক হবে বলে আমরা করছি।

তিন পার্বত্য জেলাসমূহে ১২১টি ইউনিয়নেই স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে নিজেদের অর্থায়নে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউএনডিপির আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় আগামী চার বছর গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (দ্বিতীয়) প্রকল্পটি পরিচালিত হবে। এ আদালতের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার টাকার ক্ষতি এমন বিচার কাজ করতে পারবে গ্রাম আদালত।’

তিনি বলেন, ‘সমতল এলাকায় গ্রাম আদালত যেভাবে কাজ করে পার্বত্য এলাকায় এর কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। এখানে প্রতিটি মৌজায় হেডম্যান ও কার্বারি রয়েছে যারা ইতোমধ্যে গ্রামের সমস্যাগুলো গ্রামেই সমাধানের চেষ্টা করেন। এই প্রকল্পের কার্যক্রমের মাধ্যমে বিচারিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে এবং অত্র এলাকায় গ্রামীণ জনসাধারণ কম খরচে ও স্বল্প সময়ে বিচারিক সেবা পাবে।’

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেন্সজে তেরিংক বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সুবিধা বঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কম দামে ও দ্রুততম সময়ে ন্যায় বিচারের সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গ্রাম আদালতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব সময়ই বাংলাদেশের সামাজিক ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করে তুলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ; যাতে সুবিধা বঞ্চিত মানুষ বিশেষ করে দরিদ্র মহিলারা ন্যায়বিচার পেতে পারে এবং তাদের বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আঞ্চলিক পর্যায়ে আইনি সেবা পায়।’

এদিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গ্রাম আদালত প্রকল্প-২ এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক সরদার আসাদুজ্জামান পার্বত্যনিউজের করা এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, আইন অনুযায়ী গ্রাম আদালত ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় পরিচালিত হবে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামেও এর ব্যতিক্রম নয়।

কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে যেহেতু ভিন্ন একটি বিচার প্রক্রিয়া বিদ্যমান রয়েছে। সেখানে হেডম্যান, কার্বারী রয়েছে- যারা গ্রামের সমস্যা বিচার করে থাকেন। আমরা এই প্রকল্পের আওতায় তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের প্রক্রিয়াটাকে শক্তিশালী করবো। তারা যাতে সঠিকভাবে বিচার করতে পারে সে ব্যাপারে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। তবে এটা গ্রাম আদালত নয়। তাদের প্রথাগত বিচার ব্যবস্থার লিখিত কোনো রূপ নেই, তারা যদি সেটা চাই আমরা তাদের দিয়ে সেটাও করে দিতে পারি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেখানকার মানুষ চাইলে গ্রাম আদালতেও যেতে পারবে, আবার প্রথাগত বিচার ব্যবস্থার সুবিধাও নিতে পারবে। কে কোন বিচার গ্রহণ করবে সেটা তাদের পছন্দ।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × one =

আরও পড়ুন