বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার পরিজনদের স্মৃতি

fec-image

বছরটা ঠিক মনে নেই, একটি রচনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলাম, যার বিষয় ছিল ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু’। আমি তখন স্কুলে পড়তাম। সে সময়ে খুব ছোট্ট পরিসরে বঙ্গবন্ধুকে জানার সুযোগ হয়। আমি যখনই কিছু পড়ি, সেই বিষয়টার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করি। আমার ছোটবেলাটা বেশির ভাগই ‘ববই’ মনোরমা ত্রিপুরার সঙ্গে কাটিয়েছি। ত্রিপুরা ভাষায় নানিকে ‘ববই’ বলে। আমি ববইকে জিজ্ঞাসা করতাম, ‘তুমি কি কখনো বঙ্গবন্ধুকে দেখেছ?’ ববই হাসতেন আর বলতেন, ‘দেখেছি মানে, আমি ওনার পাশেও বসেছি।’ আমি ববই-এর কথা একদম বিশ্বাস করতাম না। মনে করতাম, মজা করার জন্যই তিনি এসব বলছেন। আসলে বিষয়টা মোটেও মজা করে বলা ছিল না। তিনি সত্যিই কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন।

একটু বলে রাখি, অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি আমার পরিবারের সদস্যরা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গেও জড়িত। ১৯৭৩ সালের বিজয় দিবস উদযাপনের জন্য ঢাকায় রাঙামাটির একটি সাংস্কৃতিক দল যায়। আমার মা সাগরিকা রোয়াজা সেই সাংস্কৃতিক দলের একজন সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণ করতে যান। ওই সময় ১৬ ডিসেম্বরের অনুভূতিটাই ছিল অন্য রকম। ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি অনেক প্রশংসিত হয়েছিল, কিন্তু দুঃখের বিষয় প্রিয় নেতা, যাকে দেখার জন্য সবার এত কৌতূহল, তিনি অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি। শিল্পীদের মন খারাপ হয়ে যায়। পরে রাঙামাটির সংসদ সদস্য সুদীপ্তা দেওয়ানের মাধ্যমে তথ্যটি পৌঁছে দেওয়া হলো বঙ্গবন্ধুর কাছে। পাহাড় থেকে আসা শিল্পীরা মনে কষ্ট পেয়েছে, এ কথা শুনে বঙ্গবন্ধু গণভবনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে নির্দেশ দিলেন। ২২ ডিসেম্বর ১৯৭৩ শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের শিল্পীদের নিয়ে গণভবনে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি হয়েছিল।

আমার দাদু সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা মহকুমা তথ্য অফিসার ছিলেন। চাকমা, ত্রিপুরা, ম্রো এবং আরও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শিল্পীদের নিয়ে তিনি আরেকবার ঢাকায় যান। শিল্পীদের থাকতে দেওয়া হয়েছিল নাখালপাড়ার এমপি হোস্টেলে। আমার নানিও শিল্পীদের সঙ্গে অভিভাবক হিসেবে যান। বঙ্গবন্ধু এমপি হোস্টেলে শিল্পীদের দেখতে আসেন এবং তাদের সঙ্গে কথা বলেন। আমার নানির ভাষ্য মতে, বঙ্গবন্ধু এতটাই সহজ-সরল ও বন্ধুবৎসল ছিলেন যে তাঁর পাশে বসিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলে শিল্পীদের সুবিধা-অসুবিধার কথা জানতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর রাঙামাটি সফর উপলক্ষে পুরোনো সার্কিট হাউজে এক সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছিল। দাদু শুধু একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন শিল্পী, লেখক, গীতিকার ও সুরকার। অনুষ্ঠানে নিয়ে গেলে বঙ্গবন্ধু বিশ্বকীর্তিকে মেডিকেল কলেজে ভর্তির নির্দেশ দিয়ে দেন। ডাক্তারি পাস করে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে ডা. বিশ্বকীর্তি বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন। রাঙামাটির সবাই জানে, বঙ্গবন্ধুর বদান্যতায় বিশ্বকীর্তি মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

অনেকের ধারণা, পাহাড়ের কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। কারণ, ১৯৭১ সালে চাকমা ও বোমাং সার্কেল চিফসহ অনেকেই পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু বাস্তবতা অন্য রকম। পাহাড়ের অনেক মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আমার বাবা প্রীতি কান্তি ত্রিপুরাও ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ওপর গবেষণাকারী অনেকে এখনো বাবার কাছে ওই সময়ের তথ্য জানার জন্য আসেন। বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ চলে আসবেই। পাহাড়ের মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে ভালোবেসে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল।

আমি যুদ্ধ দেখিনি, তবে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গল্প বড়দের কাছে শুনেছি। যে গল্প আমাকে শক্তি দেয়, অনুপ্রেরণা দেয়, দেশকে ভালোবাসতে শেখায়। যুদ্ধ ও যুদ্ধের পরের কিছু গল্প এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গল্প আমার লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

১৯৬০ সালে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প শুরু হওয়ার পর আমাদের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যায়। ১৯৬২ সালে বাবার পিতামহের চাকরির সুবাদে পুরো পরিবার বান্দরবানে চলে যান। ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর মার্চের শেষের দিকে বান্দরবানে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। পরিষদের উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করা। আমার বাবা এই সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতের মিজোরামের দেমাগ্রীতে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মাতৃভূমিকে ভালোবেসে দেশকে মুক্ত করার তাগিদেই তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। দাদির মুখে শুনেছি, বাবা যখন যুদ্ধে গিয়েছিলেন বান্দরবানের রাজাকাররা দাদিকে বলতেন, তোমার ছেলে আর ফিরে আসবে না, মারা গেছে, আরও কত কী বলে মানসিক কষ্ট দিত। দাদি কাঁদতেন আর ভাবতেন, আমার ছেলে ফিরে আসবেই। এই ভেবে অপেক্ষার প্রহর গুনতেন। বাবা ফিরে এসেছিলেনও।

মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলে শেষ করা যায় না। বাবা কখনো তার যুদ্ধের কথা শোনাতেন না। খুব চুপচাপ থাকেন সব সময়। কোনো চাপা অভিমান আছে কি না, জানি না। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তোমার কি কোনো ইচ্ছা আছে নাকি?’ একদিন বলছিলেন, মরে যাওয়ার পর গার্ড অব অনারটা দেখতে পাব না। গার্ড অব অনারটা যদি বাবা মারা যাওয়ার আগে পেতেন, তাহলে হয়তো শান্তি পেতেন।

দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে আর আমরা বিজয় অর্জন করি। গল্প এখানেই শেষ নয়। যুদ্ধের পরে শুরু হয় নতুন দেশ গড়ার সংগ্রাম। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার জন্য নানা পদক্ষেপ নেন। বঙ্গবন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য রক্ষার কথা বলেছেন। পার্বত্য জনগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও ভালোবাসা তাঁর কার্যক্রমে প্রতিফলিত হয়েছে। আমি পরবর্তী প্রজন্মের একজন হিসেবে বলতে চাই, বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক অসাধারণ নেতা। তাঁর হৃদয়জুড়ে ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসা। পার্বত্যবাসীও তাঁর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়নি। প্রজন্ম পরস্পরায় বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।

ডজী ত্রিপুরা: সহকারী পরিকল্পনা কর্মকর্তা, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: বঙ্গবন্ধু
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 + 4 =

আরও পড়ুন