parbattanews

বাংলাদেশে বাঙালিরাই আদিবাসী (চতুর্থ পর্ব)

ত্রিপুরা জাতির ইতিহাস বিচার- ২

 ত্রিপুরাব্দ

বাঙালি জাতির যেমন একটি নিজস্ব সন বা বর্ষপঞ্জী রয়েছে- যাকে আমরা বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন বলে থাকি। তেমনি ত্রিপুরা জাতিরও একটি নিজস্ব সন বা বর্ষপঞ্জী রয়েছে। ত্রিপুরা সম্প্রদায় একে ত্রিপুরাব্দ বলে থাকে। এটা ত্রিপুরা জাতির সমৃদ্ধি, গর্ব ও ঐতিহ্যের প্রতীক। ত্রিপুরাব্দের উৎপত্তি সম্পর্কে ত্রিপুরা জাতির ইতিহাস লেখক প্রভাংশু ত্রিপুরা তাঁর ত্রিপুরা জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে লিখেছেন, ত্রিপুরা মহারাজা বীররাজ যুঝারূপা ওরফে হামকতর ফা ৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। সিংহাসন আরোহণের পাঁচ বছর পর তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের সীমানা সম্প্রসারণ করতে প্রয়াসী হন। অতঃপর ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গদেশ জয় করেন। বঙ্গ বিজয়কে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্যে মহারাজা হামকতর ফা “ত্রিপুরাব্দ” নামে একটি বর্ষ পঞ্জিকা প্রবর্তন করেন। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক কৈলাস চন্দ্র সিংহ তাঁর রচিত ত্রিপুরার ইতিহাস গ্রন্থের ৩১ ও ৩২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন “ত্রিপুরা রাজ হামতর ফা বীর রাজ দ্বিগ্বিজয় উপলক্ষে গঙ্গার পশ্চিম তীরে বিজয় বৈজয়ন্তী উড্ডীন করিয়া সেই ঘটনা চির স্মরণীয় করিবার জন্য একটি অব্দ প্রবর্তিত করেন। ইহাই ত্রিপরাব্দ নামে পরিচিত। ইহা ৫১২ শকাব্দ হইতে আরম্ভ হইয়াছিল।[1]

প্রায় একই ধরণের দাবী করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা গেজেটীয়ার এর ইতিহাস অধ্যায়ে। এতে বলা হয়েছে, Chittagong Hill Tracts and Chittagong formed a bone of contention between the rulers of Tripure and Arakan and it frequently change hands. According to an account Bira Raja was the founder of Tripura Raj Dynesty in 590 AD. Bira Raja defeated the king of Hill Chittagong and made Rangamati his capital.[2]

কিন্তু প্রভাংশু ত্রিপুরা বা হিল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারের এই দাবী গ্রহণ করেনি শ্রী শীতলচন্দ্র চক্রবর্ত্তী। তিনি ত্রিপুরাব্দের সূচনার ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে বলেছেন, “প্রবাদ অনুসারেই জনৈক প্রাচীন ত্রিপুর নরপতি দিগ্বিজয় উপলক্ষে গঙ্গার পশ্চিম তীরে বিজয় বৈজয়ন্তী উড্ডীন করিয়া, সেই ঘটনা চির- স্মরণীয় করিবার জন্য একটা অব্দ প্রবর্ত্তিত করেন। ইহাই অধুনা ত্রিপুরাব্দ নামে পরিচিত।”


এই সিরিজের আগের পর্বগুলো পড়ুন

পাশ্চাত্য ঐতিহাসিক Sir Roper Lethbridge তদীয় “The Golden Book of India” নামক গ্রন্থে এই বিষয়ে এইরূপ লিখিয়াছেন,

“Eighty eighth in descent from Chandra was Raja Birraj, who introduced the Tipperah Era, used in the Rajmala or Chronicles of the kings of Tipperah.”

উপরি উদ্ধৃত স্থল হইতে কৈলাস বাবুর উল্লিখিত প্রবাদের ত্রিপুরা রাজার নাম “বীরবাজ” বলিয়াই বোধ হয়। বিশ্বকোষকার ত্রিপুরার সন সম্বন্ধে একটী বিচার করিয়াছেন। সেই বিচারটা আমরা এখানে উদ্ধৃত করা কর্ত্তব্য বোধ করি:-

“এই ত্রিপুরাব্দ ত্রিপুরার রাজাদিগের নিজ প্রতিষ্ঠিত অব্দ। ইহা কাহাকর্ত্তৃক কোন্ সময় প্রতিষ্ঠিত হয়, কিছুই জানা যায় না। ১৮৬২ খৃষ্টাব্দে মহারাজ ঈশানচন্দ্র মাণিক্যের মৃত্যু হয়, তখন ত্রিপুরাব্দ ১২৭২। সুতরাং খৃষ্টাব্দে ও ত্রিপুরাব্দে ৫৯০ বৎসরের অন্তর। অতএব খৃষ্টীয় ৬৮২ অব্দে প্রথম ত্রিপুরাব্দ প্রচলিত হয়। তাহা হইলে ঈশানচন্দ্রের মৃত্যুকাল হইতে ১১৮০ বৎসর পূর্ব্বে ত্রিপুরাব্দ প্রথম প্রচলিত হইয়াছিল। ১১৮০ বৎসরে ৩৫/৩৬ পুরুষ ধরা যাইতে পারে। তাহা হইলে, মহারাজ শিবরাজ বা দেবরাজের সময় ত্রিপুরাব্দ প্রচলিত হইয়া থাকিবে।”

উল্লিখিত কোন মতই আমাদের নিকট সমীচীন বলিয়া বোধ হয় না। সুতরাং তদনুসারে কোন অঙ্গ পূর্ব্ব হইতে প্রচলিত হওয়া সম্ভবপর হইতে পারে না।

লেব্রিজ সাহেব বীররাজের সময় ত্রিপুরাব্দ প্রচলন হয়, মত প্রকাশ করিয়া তাঁহাকে ত্রিপুর রাজবংশের ৮৮ম পুরুষ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। আমরা কিন্তু রাজমালার বংশ পরিগণনায় বা বিশ্বকোষ প্রদত্ত বংশ তালিকায় ৮৮ম স্থলে কোন বীররাজেরই উল্লেখ দেখিতে পাইলাম না। রাজমালায় আমরা ৪৪শ পুরুষে এক বীররাজ এবং ২১শ পুরুষে এক বীররাজের নাম প্রাপ্ত হই। বিশ্বকোষেও ৪০শ পুরুষ ও ২০শ পুরুষে বীররাজের নাম পাওয়া যায়। রাজমালার সহিত বিশ্বকোষ বংশাবলীর একরূপ মিলই দেখা যায়।

বিশ্বকোষকার যে দেবরাজকে বা শিবরাজকে ত্রিপুরাব্দের প্রবর্তক বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন, তাঁহারা বংশ তালিকায় যথাক্রমে ৭৫ ও ৭৬ স্থানীস্বরূপে সন্নিবিষ্ট হইয়াছেন। রাজমালায় ও আমরা উভয়কেই যথাক্রমে ৭৫ ও ৭৬ স্থানীয় রূপেই সন্নিবিষ্ট দেখিতে পাই। কিন্তু ইহাদের কাহারও সম্বন্ধেই কোন স্মরণীয় ঘটনারই উল্লেখ রাজমালায় পাওয়া যায় না। অব্দ প্রচলনের জন্ম যে স্মরণীয় কোন অদ্ভুত পূর্ব্ব ঘটনার প্রয়োজন হইবে, তাহা সকলেই স্বীকার করিবেন। বিশেষ স্মরণীর ঘটনার উল্লেখ দূরের কথা, সাধারণ স্মরণীয় ঘটনা ও যখন বিশ্বকোষকার অনুমিত অব্দ প্রবর্তক রাজদ্বয়ের সম্বন্ধে উল্লিখিত হয় নাই, তখন তাঁহাদিগকে কিরূপে অব্দ প্রবর্তক বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে? বিশ্বকোষকার এ সম্বন্ধে তুষ্ণীম্ভাব প্রদর্শন করিয়া আপনার প্রচলিত মতের অদৃঢ়তাই স্বীকার করিয়াছেন।

প্রকারান্তরে আমরা এস্থলে ত্রিপুরাব্দ সম্বন্ধে একটী অভিনব মত প্রচারেই সাহসী হইতেছি। আমরা মনে করি যে, কপিল প্রদেশের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠা হইতেই ত্রিপুরাদের প্রচলন আরম্ভ হয়। ইহা বলা বোধ হয় কখনই অত্যুক্তি হইবে না যে, ত্রিপুর রাজবংশের এতদপেক্ষা অধিক স্মরণীর ঘটনা আর কিছুই সম্ভবপর হইতে পারে না। মহারাজ প্রতীতের সময়ই ত্রিপুর রাজগণ কপিল প্রদেশ পরিত্যাগ পূর্ব্বক ত্রিপুরার আসিয়া অধিষ্ঠিত হন। ত্রিপুরাজ ত্রিপুরায় প্রথমাধিষ্ঠানেরই সময় জ্ঞাপন করিতেছে।

গৌড়ের ইতিহাস লেখক প্রথিতনামা রজনীকান্ত চক্রবর্তীও ত্রিপুরারাজ্য স্থাপনের সময়কেই ত্রিপুরাব্দ প্রবর্তনের সময় বলিয়া অনুমান করিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন, “৬৮২ খৃষ্টাব্দ হইতে ত্রিপুরাব্দ গণিত হয়। সম্ভবতঃ উক্ত খৃষ্টাব্দে ত্রিপুরা রাজ্য স্থাপিত হয়।” গৌড়ের ইতিহাস ২২পৃঃ।

রজনী বাবু এখানে খৃষ্টাব্দে ভুল করিয়াছেন। উহা ৫৯০ হইবে। কারণ খৃষ্টাব্দ হইতে ত্রিপুরাব্দ বাদ দিলেই উহা পাওয়া যাইতে পারে। বিশ্বকোষকারও এই ভূলই করিয়াছেন। বিশেষতঃ আমাদের নির্ধারিত সময়ের সহিত সমসাময়িক ঐতিহাসিক ঘটনার যেরূপ সামঞ্জস্য হইতে পারে, বিশ্বকোষকার বা গৌড়ের ইতিহাস লেখকের সময়ের সহিত সেরূপ সামঞ্জস্য হইতে পারে না।

সুপ্রসিদ্ধ চীন পরিব্রাজক হুয়েন্ সিয়াং ৭ম শতাব্দীর প্রারম্ভে কমলাঙ্ক বা কুমিল্লা প্রদেশকে একটা স্বতন্ত্র রাজ্য দেখিয়া গিয়াছিলেন বলিয়া তদীর ভ্রমণবৃত্তান্তে উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু তাহাতে ত্রিপুরার অধিকারের কোন উল্লেখ নাই। বস্তুতঃ আমরা ত্রিপুরাব্দের প্রমাণ হইতে ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে ত্রিপুর রাজগণ যে প্রবঙ্গ বা বর্ত্তমান ত্রিপুরার উত্তরাংশে অধিষ্ঠিত হন, তাহাই বুঝিতে পারি, তাঁহারা যে তদ্দক্ষিণে অগ্রসর হন এরূপ বুঝিতে পারি না।[3] ৮৯-৯২

এবিষয়ে তিনি আরো বলেন, বাবু পরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তদীয় “বাঙ্গালার পুরাবৃত্তে” ত্রিপুরাব্দের উৎপত্তি সম্বন্ধে যে, একটী মত প্রচার করিয়াছেন, তাহাও এস্থলে উদ্ধৃত করা কর্ত্তব্য মনে করি:-

“৫৯০ খৃষ্টাব্দে ত্রিপুরাব্দ আরম্ভ হয়। সম্ভবতঃ, কাম্বোজগণ ত্রিপুরা আক্রমণ ও জয় করিয়া ঐ অব্দ প্রচলিত করে।” এই মতটীকে আমরা আমাদের মতের বিশেষরূপ পরিপোষক বলিয়া মনে করি। কাম্বোজ আমাদের নিকট কিরাতেরই নামান্তর বলিয়া বোধ হয়। বিশ্বকোষকার কাম্বোজের শিলালিপিতে কাম্বোজের স্থলে ‘কিরাত’ নামের উল্লেখ পাইয়াছেন। তাহা হইলে কিরাত কর্তৃক ত্রিপুরা জয়ই কাম্বোজ কর্তৃক ত্রিপুরা জয় বলা হইতে পারে। বিশেষতঃ রাজমালার কাম্বোজজয়ের কোন কথাই নাই, কিরাত জয়ের কথাই আছে। সুতরাং কিরাতকর্তৃক ত্রিপুরা জয় হইতেই ত্রিপুরাদের প্রথম প্রবর্তন হইয়াছে, আমাদের এই মতের আশ্চর্য্য সমর্থনই এখানে প্রাপ্ত হওয়া যাইতেছে।[4]

এদিকে রাঙামাটি হিল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার এবং গবেষক জামাল উদ্দীন তার পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস গ্রন্থে বলেছেন, ত্রিপুরার রাজা বীররাজ ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অধিকার করে রাঙামাটিতে রাজধানী স্থাপন করেন।[5]

তবে শ্রী শীতলচন্দ্র চক্রবর্ত্তী এ তথ্য স্বীকার করেননি। তার মতে, এই রাঙামাটি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি নয় বরং ত্রিপুরার উদয়পুরই হলো এই রাঙামাটি। কেননা, ত্রিপুরা রাজ্যের উদয়পুর নামক স্থানে যেখানে ত্রিপুরার প্রাচীন রাজধানী অবস্থিত ছিলো তার প্রাচীন নাম রাঙামাটি। মি. চক্রবর্ত্তীর ভাষায়, রাঙামাটি যে বর্তমান উদয়পুরেরই প্রাচীন নাম ছিল, তাহা রাজমালা পাঠ করিতে পারিলেই জানিতে পারা যায়।[6]

এছাড়াও ত্রিপুরা রাজ যদি রাঙামাটিতে রাজধানী স্থাপন করে থাকেন তবে সেটি রাঙামাটির কোথায় অবস্থিত ছিলো? রাজপ্রাসাদ ও অন্যান্য স্থাপনার কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নজির কোথায়- এই সাধারণ প্রশ্নও রাখেননি কোনো গবেষক। এটা তো প্রাগৈতিহাসিক কালের ঘটনা নয়।


 ত্রিপুরা ভাষা

ত্রিপুরা জাতি (বরক) যে ভাষায় কথা বলে তা ভারতবর্ষে কক্-বরক্ নামে অভিহিত হয়। কক্-বরক্ ভাষাটি ৫৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১৩৬৪ বছর ধরে স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্যের রাষ্ট্রভাষা ছিল। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ সেপ্টেম্বর তারিখে স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্য ভারত ইউনিয়নে যোগদান করলে ককবরক রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা হারায়। অতঃপর ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জানুয়ারি ভারত সরকার ককবরক ভাষাকে ত্রিপুরা রাজ্যে পুনরায় রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা প্রদান করে। দেবনাগরী ও রোমান লিপিতে ককবরকের লেখ্যরূপ দেয়া হয়। নৃতাত্ত্বিক বিচারে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী Indo Mongoloid এর অন্তর্গত এবং সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এই জনজাতির লোকদের মধ্যে মঙ্গোল বৈশিষ্ট্যসমূহ বিদ্যমান। ককবরক ভাষাটি Austronesian Family ভাষার অন্তর্গত Asian বিভাগের Tibeto Bur- mese গোত্রভুক্ত।[7]

এ ছাড়াও তিনি আরো বলেছেন, ত্রিপুরারা যে ভাষায় কথা বলে তা ভারতবর্ষে কব্বর নামে অভিহিত। যতদূর জানা যায় এই ভাষা ৫৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১৩৬৪ বছর ধরে স্বাধীন ত্রিপুরা জাতির রাষ্ট্রভাষা ছিল। ১৯৪৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্য ভারত ইউনিয়নে যোগদান করলে কক্করক রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা হারায়। অতঃপর ১৯৭৯ সালে কব্বর ভাষা পুনরায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদ লাভ করে।[8]

মি. প্রভাংশু ত্রিপুরার বক্তব্য কোনোভাবেই ইতিহাস সমর্থিত নয়। কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ ও দলিল ছাড়াই তিনি ‘যতদুর জানা যায়’ এই উপর ভর করে উপসংহারে এসেছেন, এই ভাষা ৫৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১৩৬৪ বছর ধরে স্বাধীন ত্রিপুরা জাতির রাষ্ট্রভাষা ছিল। ১৯৪৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্য ভারত ইউনিয়নে যোগদান করলে কক্করক রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা হারায়।
তবে ভারতীয় ও ত্রিপুরার গবেষকগণের বক্তব্য এ তথ্য সমর্থন করে না। এদের মধ্যে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার বীরবিক্রম কলেজের অধ্যাপক মোহিত পুরাকায়স্থ তাঁর ‘ত্রিপুরায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নামক গ্রন্থে বলেছেন,

ত্রিপুরার বিভিন্ন পার্বত্য জাতির মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন রকমের ভাষা প্রচলিত। কিন্তু বহুদিন থেকেই এ-রাজ্যের রাজভাষা বাঙলা। কোন অজানা অতীতে বাঙলা ভাষা ত্রিপুরায় রাজমর্যাদা লাভ করেছিল তা নির্ণয় করা কঠিন। কত রাজার উত্থান-পতন হয়েছে, কত রাজনৈতিক বিপ্লবের বন্যা ত্রিপুরার ওপর দিয়ে ব’য়ে গেছে কিন্তু বাঙলা ভাষার দৃঢ় ভিত্তিকে বিচলিত করতে পারেনি। পার্বত্য জাতির লোকেরা পর্যন্ত বাঙলা ভাষা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। রাজমালা-সংগ্রাহক কৈলাসচন্দ্র সিংহ লিখেছেন-

“ত্রিপুরার রাজভাষা বাঙ্গালা, ইহার অধিকাংশ তাম্রশাসন বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালা অক্ষরে লিখিত। এই রাজ্যের প্রাচীন ইতিহাস রাজমালা প্রাচীন বঙ্গ সাহিত্যের রত্নমালা স্বরূপ। সুতরাং ত্রিপুরার গৌরবে বাঙ্গালী ও বাঙ্গালা ভাষা গৌরবান্বিত।”

ত্রিপুরার রাজচিহ্ন ও স্ট্যাম্পে বাঙলা ভাষারই প্রাধান্য। শীল- মোহর (আজ্ঞা ও পদ্মমোহর) বাঙলা ভাষায় অঙ্কিত। মুদ্রায় বাঙলা ভাষা ও অক্ষর উৎকীর্ণ। কর্ণেল মহিমচন্দ্র ঠাকুর তাঁর “দেশীয় রাজ্য” গ্রন্থে লিখেছেন-“ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় আমার সোনার চেনের সহিত একখানা সোনার মোহর দোহুল্যমান দেখিয়া হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন ‘তোর চেইনের ঝলমলানির সঙ্গে যে মোহর চকচক করিতেছে ইহা কোন মোহর?” আমি বিনম্র বচনে, তাঁহাকে বলিয়াছিলাম (১৮৮৪ খৃষ্টাব্দের কথা) ইহা আমাদের রাজ্যের মোহর। তিনি হাতে করিয়া পাঠ করিলেন ‘শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণপদে শ্রীযুত মহারাজা গোবিন্দমাণিক্য শ্রীশ্রীমহারাণী গুণবতী দেব্যা।’ ইহা পাঠ করিয়াই তিনি পুলকিত হইয়া উপস্থিত গণ্যমান্য ব্যক্তি- দিগকে বলিয়াছিলেন ইহাতে যে বাঙ্গালা ভাষার ছাপা। তবে আমার বাঙ্গালা রাজভাষা।’ —-

ত্রিপুরার রাজাদের দেওয়া সনদের ভাষাও বাঙলা, যদিও তার মধ্যে আরবী ও ফারসী শব্দ মেশান রয়েছে। বাঙলা ভাষায় সবখানেই দলিলের ভাষায় আরবী ও ফারসীর বাহুল্য দেখা যায়। ত্রিপুরার মঠ ও মন্দিরে যে-সমস্ত শিলালিপি রয়েছে তার অধিকাংশই সংস্কৃত ভাষায় রচিত হ’লেও বাঙলা হরফে লেখা। কোন কোন মন্দিরে বাঙলা-ভাষায় লেখা প্রস্তর ফলকও দেখা যায়। পুরীতে জগন্নাথ দেবের মন্দিরের বেষ্টনীর মধ্যে ত্রিপুরার মহারাজের নির্মিত মন্দিরের গায়ে বাঙলায় লেখা প্রস্তর ফলক রয়েছে। উদয়পুরে ত্রিপুরাসুন্দরীর মন্দিরের উত্তর দিকের ও দক্ষিণ দিকের দেয়ালে দুটি প্রস্তরফলক বাঙলায় লেখা। ….

১৭৫১ শকে বা ১২৩৯ ত্রিপুরাব্দে মহারাজ কাশীচন্দ্র মাণিক্য ত্রিপুরা সুন্দরীর বাড়ীতে একটি বড় ঘণ্টা স্থাপন করেন। ঘণ্টাতে মহারাজের নাম, নির্মাতার নাম ও ঘণ্টাপ্রদানের সন তারিখ বাঙলায় লেখা রয়েছে। আগরতলায় উমামহেশ্বর বিগ্রহের পাদপীঠে এবং পুরাণ আগরতলায় চৌদ্দ দেবতার সিংহাসনে বাঙলায় লেখা শ্লোক দেখা যায়।…..

ত্রিপুরার বিশিষ্ট সম্পদ তার দরবারী ভাষা। একমাত্র পররাষ্ট্র বিভাগ ছাড়া এখানকার সরকারী কাজে সর্বত্র বাঙলা ভাষার ব্যবহার ছিল। সরকারী আদেশ বাঙলা ভাষায় প্রচারিত হ’ত। সরকারী চিঠিপত্র, হিসাব-নিকাশ, রেজিষ্ট্রী, ফর্ম, ইত্যাদি সবখানেই বাঙলা ভাষার ব্যবহার ছিল। আদালতে সাক্ষীর জবানবন্দি, রায় ইত্যাদি বাঙলায় লেখা হ’ত। বাঙলা দেশে ফৌজদারী দণ্ডবিধি প্রচলিত হ’বার অনেক আগে ত্রিপুরায় বাঙলা ভাষায় “চলৎ দণ্ডবিধি” আইন প্রচলিত হয়েছিল। ইংরেজী শিক্ষিত কর্মচারীদের দ্বারা সময় সময় শাসন ও বিচার বিভাগে ইংরেজী ভাষা প্রয়োগের চেষ্টা যে না হ’ত তা নয়। কিন্তু, মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য পররাষ্ট্র বিভাগ ছাড়া সরকারী কাজে ইংরেজী ভাষার ব্যবহার আইন দ্বারা নিবারণ করেন।

মহারাজ রাধাকিশোর মন্ত্রী রমণীমোহন চট্টোপাধ্যায়কে ইংরেজী ভাষায় আদেশ প্রচার করতে দেখে তাঁকে লিখেছিলেন- “এখানে আবহমান কাল রাজকার্য্যে বাঙ্গালা ভাষার ব্যবহার এবং এই ভাষার উন্নতিকল্পে নানারূপ অনুষ্ঠান চলিয়া আসিতেছে, ইহা বঙ্গদেশীয় হিন্দু রাজ্যের পক্ষে বিশেষ গৌরবজনক মনে করি। বিশেষতঃ আমি বঙ্গ ভাষাকে প্রাণের তুল্য ভালবাসি এবং রাজকার্য্যে ব্যবহৃত ভাষা যাহাতে দিন দিন উন্নত হয় তৎপক্ষে চেষ্টিত হওয়া একান্ত কর্তব্য মনে করি। ইংরেজী শিক্ষিত কর্মচারী- বর্গের দ্বারা রাজ্যের এই চিরপোষিত উদ্দেশ্য ও নিয়ম ব্যর্থ না হয় সে বিষয়ে আপনি তীব্র দৃষ্টি রাখিবেন।”[9]

মোহিত পুরাকায়স্থ ত্রিপুরা রাজন্যবর্গ কর্তৃক বাংলাকে রাজভাষা ঘোষণার কোনো সময় উল্লেখ করতে না পারলেও ত্রিপুরার গবেষক পঙ্খশুভ্র দেববর্মন বাংলাকে রাজভাষা ঘোষণার একটি সময় উল্লেখ করেছেন। তার মতে, ত্রয়োদশ শতকে রাজ ভাষা হিসেবে গোটা বিশ্বে বাংলাকে প্রথম স্বীকৃতি দেয় রাজন্য ত্রিপুরাই।[10]

অন্যদিকে শ্রী শৈলেশকুমার বলেছেন, রত্নমানিক্যই কয়েক হাজার বাঙালি পরিবারকে ত্রিপুরায় উপনিবিষ্ট করান। বাঙালির ধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে এবং বাংলা ভাষার সঙ্গে ত্রিপুরার যোগাযোগ এভাবে আরম্ভ হয়। তিনি ছিলেন শিক্ষার অর্থাৎ বাংলা ও সংস্কৃত শিক্ষার উৎসাহদাতা। যদিও তিনি নিজে ছিলেন বড়োভাষী। তিনিই বাংলা ভাষায় ‘রাজমালা’(পদ্যে ত্রিপুরা কাহিনী) রচনার প্রবর্তক।[11]

ত্রিপুরার মাণিক্য রাজাগণ বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। রাজা এবং রাজ পরিবারের লোকেরা নিজেরাও সাহিত্য চর্চা করেছেন। রাজসভার কাজে ব্যবহার করেছেন বাংলা। এমনকি আধুনিক যুগেও রাজকার্যে যাতে বাংলার ব্যবহার ব্যাহত না হয় সেজন্য রাজা সতর্ক নজর রেখেছেন। পঞ্চদশ শতকে রত্ন মাণিক্যের সময় থেকেই ত্রিপুরার রাজকার্যে পার্সি ও বাংলার প্রভাব পড়তে থাকে। পঞ্চদশ শতকে মহারাজা ধর্ম মাণিক্য রাজমালা রচনা করান।এই রাজমালাকে বাংলা কাব্যের প্রাচীন নিদর্শন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।[12]

দ্বিতীয় ধর্ম মাণিক্যও(১৭১৪-২৯খ্রীঃ) সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি বাংলা ভাষায় মহাভারতের পদ্যানুবাদ করিয়েছিলেন। জগৎ মাণিক্যও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি বাংলা কাব্যে অনুবাদ করিয়েছিলেন পদ্মপুরাণের অন্তর্গত ‘ক্রিয়াযোগসার’। গ্ৰন্থটি রচিত হয়েছিল ১৭২৬ খ্রীষ্টাব্দে।জগৎ মাণিক্য এই পুঁথির নকল প্রজাদের ঘরে ঘরে রাখার আদেশ দিয়েছিলেন।

এবার আসা যাক বীরচন্দ্র মাণিক্যের(১৮৬২-৯৬খ্রীঃ)কথায়। ত্রিপুরার এই রাজাই প্রথম কিশোর কবি রবীন্দ্রনাথকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।কবির ‘ভগ্ন হৃদয়’ কাব্য গ্ৰন্হ পাঠ করে রাজা রবীন্দ্রনাথের মধ্যে এক ভুবনজয়ী সম্ভাবনা লক্ষ্য করেছিলেন। তারপরই কিশোর কবিকে সম্বর্ধনা জানাতে রাজা তাঁর সচিবকে পাঠিয়ে দেন কলকাতায়।[13]

তবে বিষয়টা শুধু এক পাক্ষিক নয়। বাঙালিরাও তাদের প্রতি ত্রিপুরার রাজপরিবার ও ত্রিপুরা জাতির অবদানের প্রতিদান দেয়ার চেষ্টা করেছেন। বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে শঙ্খশুভ্র দেববর্মণের ভাষায়। তিনি বলেছেন, প্রাচীন ত্রিপুরার ইতিহাস নথীবদ্ধকরণে বাঙালি লেখক এবং গবেষকদেরই অবদান বেশি বলে এঁদের প্রতি ত্রিপুরি জন গোষ্ঠীর কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত। শুক্রেশ্বর, বাণেশ্বর, কালী প্রসন্ন সেন, কৈলাশ চন্দ্র সিংহ, ভূপেন্দ্র চন্দ্র চক্রবর্তী, শ্রী দ্বিজেন্দ্র চন্দ্র দত্ত, শ্রী সুপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় , কুমুদ কুণ্ডু চৌধুরী, ডা. জগদীশ গণচৌধুরী প্রমুখ পন্ডিত ব্যক্তিরা প্রাচীন ত্রিপুরার বহু ঐতিহাসিক তথ্য নথীবদ্ধ করে গিয়েছেন এবং এইসময়েও বহু গবেষক কাজ করে চলেছেন। প্রাচীন ত্রিপুরার ইতিহাস লিপিবদ্ধকরণে এঁদের অবদান সবসময়ই স্মর্তব্য।[14]

ত্রিপুরা জাতি

বাঙালির মতোই ত্রিপুরা কোনো বিশুদ্ধ জাতি নয়। ত্রিপুরা জাতির উৎপত্তি সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিভিন্ন মত দেখা যায়। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের মতে, নেপালের কিরান্তি জাতি কিরাত শ্রেণীভূক্ত। তিপারাগণও এই শ্রেণীর অন্তর্গত। ইউরোপীয় কোনো কোনো পণ্ডিতের মতে, আরাকানের মুলং জাতি যে শ্রেণীর অন্তর্গত, ইহারাও সেই একই শ্রেণীর অন্তর্গত।[15] একই মত পোষণ করেছেন, শ্রী শীতলচন্দ্র চক্রবর্ত্তী। তিনি বলেছেন, বাঙালার পুরাবৃত্তে ত্রিপুরা জাতি কিরাত জাতিরই শাখা বলিয়া অনুমিত হইয়াছেঃ- ত্রিপুরা অঞ্চলে যে ত্রিপুরাজাতি আছে, তাহারা প্রাচীন কিরাত জাতিরই শাখা।[16]

প্রায় একই মত পোষণ করে শৈলেশকুমার সেন আরো যুক্ত করেছেন, ঐতিহাসিক বিচারে ত্রিপুরা রাজ্য অতি প্রাচীন- প্রগৈতিহাসিক যুগের সুবিস্তৃত কিরাত ভূমির অন্তর্গত ও কিরাত গোষ্ঠীর অন্যতম শাখা বোড়ো জাতির দ্বারা অধ্যুষিত।[17]তবে মৃণালকান্তি দেবরায় ও শ্যামল চৌধুরী সরাসরি ত্রিপুরা জাতিকে বড়ো জাতির অন্তর্ভূক্ত বলে দাবি করেছেন। তাদের মতে, আধুনিক ঐতিহাসিক ও ভাষাতত্ত্ববিদদের মতে, ত্রিপুর গোষ্ঠী বোড়ো-ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত। এই বড়ো ভাষী তিব্বত-বর্মী গোষ্ঠী চিনের ইয়াংসি ও হোয়াংহো নদীর উজান অঞ্চল থেকে তিব্বত এবং বর্মা হয়ে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পৌঁছায়।[18]

এ ব্যাপারে প্রভাংশু ত্রিপুরার অবস্থান অত্যন্ত কৌতুহলোদ্দীপক। তিনি বলেছেন, নৃতাত্ত্বিক বিচারে ত্রিপুরা জাতি মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত। ইতিহাসবেত্তাদের অভিমত, এই জনজাতির পূর্ব পুরুষগণ প্রায় ৫ হাজার বছর আগে মূল মঙ্গোলিয়া থেকে মধ্য এশিয়ার তিব্বত ও সাইবেরিয়ার পথ পরিক্রমায় ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চল সমূহে আগমণ করেছিল। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ Bodo বা Boro নামে পরিচিত ছিল। ভারতবর্ষে আর্যগণের আগমনের পূর্বে এই বোডো বা বরো জনজাতি সুদৃঢ়ভাবে আধিপত্য কায়েম করেছিল। ঐতিহাসিক কাব্যগ্রন্থ রামায়ণ ও মহাভারত সূত্রে জানা যায় ভারতবর্ষের উত্তর পূর্বাঞ্চল রাজ্যসমূহ Bodo বা Boro জনজাতির নৃপতি কর্তৃক শাসিত হতো। আর্যগণ তাদেরকে কিরাত, দানব ও অসুর নামে আখ্যায়িত করতো। এই Bodo বা Boro জনজাতির একটি শক্তিশালী দল ক্রমে ক্রমে গঙ্গানদী, শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী নদীর অববাহিকার বিস্তৃর্ণ ভূ-খণ্ডে স্থায়ীভাবে গোড়াপত্তন করেছিল। শক্তিশালী এই জনজাতিই পরবর্তীকালে এই উপমহাদেশে ত্রিপুরা জাতি এবং নামে একটি রাজ্যের নামাঙ্কিত করতে সক্ষম হয়। ত্রিপুরা সম্পূর্ণ অনার্য জাতি এবং উপমহাদেশের অন্যতম মাটি ও মানুষের আদি সন্তান বলে দাবীদার।[19] তিনি আরো বলেছেন, বলতে বাধা নেই যে, ত্রিপুরা জাতি বলতে ত্রিপুরা নামীয় রাজ্যে ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী বোডো গ্রুপকেই বুঝতে হবে।[20]

এখন আমরা মি. প্রভাংশু ত্রিপুরার অবস্থানকে সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করতে চাই। তিনি ত্রিপুরা জাতিকে বড়ো জাতির শাখা না বলে বড়ো জাতিকেই ত্রিপুরা জাতি বলে দাবি করেছেন। অথচ উপমহাদেশে এখনো বড়ো একটি সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে অবস্থান করছে। অন্যদিকে ত্রিপুরা সাম্রাজ্য ও বড়ো সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ ভিন্ন ইতিহাস হয়েছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, গ্রন্থের শুরুতে মি. ত্রিপুরা রাজমালার উদ্ধৃতি দিয়ে ত্রিপুরা জাতিকে চন্দ্র বংশীয় বলে দাবী করলেও এ স্থানে এসে ত্রিপুরা জাতিকে সম্পূর্ণ অনার্য বলে স্বীকার করেছেন।

তার মতে, ত্রিপুরা রাজা বীররাজ ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অধিকার করে রাঙ্গামাটিতে রাজধানী স্থাপন কর গোড়াপত্তন রাজা উদয়গিরি কীলে ও মংলে নামে দুই রিয়াং সহোদরকে মাতামুহুরী নদীর দক্ষিণ তীরবর্তী পার্বত্যাঞ্চলের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। ৫৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মোট ৩৬৩ বছর ধরে ত্রিপুরা রাজন্যবর্গ বংশপরম্পরায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম শাসন করেন। অতঃপর আরাকানের রাজা সুলা চন্দ্র (Tsula Tsandra) ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে ত্রিপুরা মহারাজার শাসন ক্ষমতার হাত থেকে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অধিকার করেন। সেই থেকে আরাকান রাজন্যবর্গ একটানা ২৯৭ বছর ধরে চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন করেন। অতঃপর ত্রিপুরা মহারাজ সেংথুমকা ১২৪০ খ্রিস্টাব্দে আরাকান রাজাকে পরাজিত করে পুনরায় চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অধিকার করেন এবং এ অঞ্চলসমূহে ত্রিপুরা রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত করে আবারো বংশপরম্পরায় একটানা ১০২ বছর যাবৎ শাসনকার্য পরিচালনা করেন। অতঃপর গৌড়ের পাঠানবংশীয় সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজার হাত থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চল অধিকার করেন। গৌড় সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহের চট্টগ্রাম জয়ের মধ্যে দিয়ে এ অঞ্চলে মুসলমানদের আগমনের সূত্রপাত ঘটে।[21]

তবে এখানেই শেষ নয়, প্রাগৈতিহাসিক যবনিকা উত্তোলিত হলে ত্রিপুরা লক্ষ্যচক্ষুর প্রত্যক্ষীভূত হয় মহারাজ রত্নফার সময়ে।  জানা যায়, বাংলার সুলতান শামসুদ্দিনের সাহায্যে রত্ন ত্রিপুরার সিংহাসন অধিকার করেন ১৩৫০ সালে। সুলতান শামসুদ্দিন হতে তিনি ‘মাণিক্য’ উপাধি লাভ করেন। রত্ন হতেই ত্রিপুরার মহারাজাদের ‘মাণিক্য’ উপাধি ধারণের সূত্রপাত।[22]

আমরা সকলেই জানি কুমিল্লার প্রাচীন নাম ত্রিপুরা। পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরা সম্পদায় দাবী করে থাকে যেহেতু একসময় ত্রিপুরা রাজা দীর্ঘ সময় কুমিল্লা দখল করে রাজধানী স্থাপন করেছিলেন তাই কুমিল্লার প্রাচীন নাম ত্রিপুরা। কিন্তু ইতিহাস এই মত সমর্থন করে না। কেননা, প্রাচীনকালে বৃহত্তর কুমিল্লা সমতট নামে পরিচিত ছিলো। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং তার ভ্রমণ কাহিনীতে লিখেছেন, বুদ্ধদেব পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট (কুমিল্লা) ইত্যাদি স্থানে সপ্ত দিবসকাল ধর্মোপদেশ দান করেছিলেন। যদিও এটি নির্ভেজাল ইতিহাস রূপে গ্রহণ করা হয়নি। তবে ঐতিহাসিকগণ একমত যে, বুদ্ধের সমকালেই সমতটে বৌদ্ধ ধর্মের বাণী পৌঁছেছিল। এ অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রাচীন নিদর্শনাদি থেকে জানা যায়, খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দী থেকে ত্রিপুরা গুপ্ত সম্রাটদের অধিকারভুক্ত ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে সপ্তম থেকে অষ্টম শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এ অঞ্চলে বৌদ্ধ দেববংশ রাজত্ব করে। নবম শতাব্দীতে কুমিল্লা হরিকেলের রাজাগণের শাসনাধীনে আসে। প্রত্নপ্রমাণ হতে পাওয়া যায় যে, দশম হতে একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রায় দেড়শ বছর এ অঞ্চল চন্দ্র রাজবংশ দ্বারা শাসিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মোঘলদের দ্বারা শাসিত হয়। অর্থাৎ সুপ্রাচীন কাল থেকে ত্রিপুরা রাজগণ কুমিল্লা পর্যন্ত তাদের সম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন দীর্ঘদিন পর্যন্ত- এ তথ্য ইতিহাস দ্বারা সমর্থিত নয়।

কুমিল্লা জেলার প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭৬৫ সালে এটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে আসে। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে কোম্পানী ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দ প্রদেশে একজন তত্ত্বাবধায়ক  নিয়োগ করে। তখন কুমিল্লা ঢাকা প্রদেশের অন্তর্গত ছিল। ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লাকে কালেক্টরের অধীন করা হয়। ১৭৯০ সালে ব্রিটিশরা বৃহত্তর কুমিল্লা অর্থাৎ কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষীপুর ও চাঁদপুর জেলারগুলো নিয়ে একটি কালেক্টরেট জেলা সৃষ্টি করা হয়। বৃটিশরা এর নাম দেন ত্রিপুরা। এ ইতিহাস থেকে বোঝা যায়, কুমিল্লার প্রাচীন নাম যে ত্রিপুরা- এর সাথে ত্রিপুরা রাজত্ব ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কোনো সম্পর্ক নেই।

ত্রিপুরার প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থের লেখক শ্রী শীতলচন্দ্র চক্রবর্ত্তী বর্ণনা থেকে আমরা দেখতে পাই যে, ‘কমলাঙ্ক যে সপ্তম শতাব্দীতে স্বাধীন রাজ্যরূপে বর্ত্তমান থাকিবে তাহা ঐতিহাসিক সত্য রূপে প্রমাণিত হইতেছে।’[23]

সুপ্রসিদ্ধ চীন পরিব্রাজক হুয়েন্ সিয়াং ৭ম শতাব্দীর প্রারম্ভে কমলাঙ্ক বা কুমিল্লা প্রদেশকে একটা স্বতন্ত্র রাজ্য দেখিয়া গিয়াছিলেন বলিয়া তদীর ভ্রমণবৃত্তান্তে উল্লিখিত হইয়াছে।

উক্ত আলোচনায় আমরা দেখতে পাই যে, কুমিল্লা একসময় ত্রিপুরা রাজের শাসনাধীন থাকলেও সে শাসনকাল দীর্ঘ ছিলো না। তবুও উক্ত কারণে অনেকেই কুমিল্লার প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ময়নামতি ও লালমাই বিহার প্রভৃতিকে ত্রিপুরা রাজের নিদর্শন বলে ধারণা পোষণ করেন। প্রকৃতপক্ষে, ময়নামতি ও লালমাই বিহার বৌদ্ধ সভ্যতার নিদর্শন। ত্রিপুরা রাজবংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এসকল বিহারের সাথে ত্রিপুরা রাজের কোনো সম্পর্ক নেই। এসব কীর্তির দাবীদার দেব রাজবংশ।

দেব রাজবংশ প্রাচীন বাংলার সমতট অঞ্চলে শাসনকারী রাজবংশ। দেবপর্বত ছিল এ বংশের রাজাদের রাজধানী। ময়নামতির প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে দেবপর্বত সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা গিয়েছে। আমাদের ইতিহাসে দুটি দেব রাজবংশের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথমটি খ্রিস্টীয় ৮ম-৯ম শতাব্দীতে প্রাচীন বাংলার সমতট অঞ্চলে রাজত্বকারী রাজবংশ। যার রাজধানী ছিল কুমিল্লার দেবপর্বত। আর দ্বিতীয় দেব রাজবংশটি ছিল একটি হিন্দু বৈষ্ণব রাজবংশ, যার রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। অষ্টম শতাব্দীর দেব রাজবংশের চারজন রাজার নাম পাওয়া যায়: শান্তিদেব, বীরদেব, আনন্দদেব ও ভবদেব। কুমিল্লার ময়নামতি থেকে উদ্ধারকৃত মহারাজ আনন্দদেবের সময়কালের তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, অষ্টম শতাব্দীর দেব রাজারা “শ্রী বাঙ্গালা মৃগাঙ্ক” উপাধি ব্যবহার করতেন যার অর্থ বাংলার চন্দ্র। এই রাজ্যকালকে প্রাচীন বাংলার ‘স্বর্ণযুগ’ মনোনীত করা যেতে পারে।

শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, ভোজ বিহার, কুটিলা মুড়ার বৃহৎ স্তূপ এবং ইটাখোলামুড়া ও রূপবান মুড়া দেব রাজবংশের অনন্য কীর্তি। এর সাথে ত্রিপুরা রাজবংশের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এ কথাও অনস্বীকার্য যে, বৃহত্তর কুমিল্লায় ত্রিপুরা রাজাদের নির্মিত বেশকিছু স্থাপনা রয়েছে। এরমধ্যে কুমিল্লা শহর থেকে কয়েক কি.মি দক্ষিণ পূর্বে জগন্নাথ পুরে নির্মিত সতেররত্ন মন্দির। ত্রিপুরার মহারাজা দ্বিতীয় রত্নমাণিক্য(১৬৮৫-১৭২২) এই মন্দিরের নির্মাণ কার্য শুরু করেছিলেন বলে জানা যায়। পরবর্তীকালে মহারাজা কৃষ্ণ কিশোর মাণিক্য ১৭৬১ সালে এই মন্দির নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন।[24] এছাড়াও কুমিল্লার ধর্মসাগর নামে যে সুবিশাল দিঘী রয়েছে তা খনন করিয়েছেন দ্বিতীয় ধর্ম মাণিক্য।  একই শহরের রাণীর দিঘীর নামে আরেকটি বড় যে দিঘী রয়েছে এটি খনন করিয়েছেন কৃষ্ণ মাণিক্যের পত্নী জাহ্নবী দেবী। এসবে প্রমাণিত হয় কুমিল্লায় ত্রিপুরা মহারাজাদের অবস্থানকাল প্রাচীনকালের বা দীর্ঘকালের নয়। হাচিনসন যেমন বলেছেন, ‘In the year 1512 the Tipperas were at the hight of their power, and captured Chittagong from Mughals but were subsequently driven out by the Arakanese with the help of the Portuguese and their capital of Udaipure was sacked in 1587.[25]

উল্লিখিত গবেষকগণের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রভাংশু ত্রিপুরা, শোভা রাণী ত্রিপুরা সহ বাংলাদেশী গবেষকগণের একটা বড় অংশই কোনোরূপ ঐতিহাসিক যাচাই ছাড়াই কেবলমাত্র মিথ ও কল্পকাহিনীর উপর ভিত্তি করে একটি জাতির ইতিহাস রচনা করেছেন। তাদের গবেষণার মূল ভিত্তি হিসেবে তারা ত্রিপুরা রাজবংশের বংশগাঁথা ‘রাজমালাকে’ প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু কেউই এই রাজমালার. বিশেষ করে প্রথমাংশের ঐতিহাসিক মূল্য যাচাই করেননি।  অথচ উপমহাদেশে ত্রিপুরা একটি সমৃদ্ধ জাতির নাম। ঐতিহাসিক বিচারেই এ জাতির গর্ব করার মতো অসংখ্য উপাদান ও অবদান রয়েছে। বিশেষ করে ত্রিপুরা রাজবংশ ও সভ্যতা ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী রাজবংশ ও সভ্যতার অংশ বিশেষ। কিন্তু উল্লিখিত ঐতিহাসিক আলোচনায় এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, ত্রিপুরা জাতি বাংলাদেশ নামক আজকের ভূ-খণ্ডের প্রাচীনতম জনগোষ্ঠী বা আদি বাসিন্দা নয়। এমনকি তাদের আদিবাস যে ভারতে সেখানেও তারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত নয়।

♦ আগামী সংখ্যায় সমাপ্য

তথ্যসূত্র


 

 

 

Exit mobile version