পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্বরতম ভূষণছড়া গণহত্যা ৩৭তম বার্ষিকীতে

৩৭ বছর পর বিস্মৃতপ্রায় এক গণকবরের পাশ থেকে

 

জনসংখ্যার সুষম বন্টন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য বাংলাদেশ সরকার সত্তরের দশকের শেষদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভূমিহীন ও দরিদ্র মানুষদেরকে এনে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম উপত্যকা এলাকায় সরকারি খাস জমিতে পুনর্বাসন করে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গঠন করার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও এর সশস্ত্র সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে সমতলের বাঙ্গালীদের এই পুনর্বাসন মেনে নেয়নি।

এই পুনর্বাসন এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের সাথে বাঙ্গালীদের জনসংখ্যা ভারসাম্যের সমীকরণ কিছুটা বদলে যাওয়ায় উপজাতীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা শুরু থেকেই বাঙালি পূনর্বাসনের বিরোধিতা করতে থাকে। তারা এই পুনর্বাসন বন্ধ করার জন্য এবং পুনর্বাসিত ও স্থানীয় বাঙালিরা যাতে পাহাড় ছেড়ে সমতলের চলে যায় সে কারণে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক পাহাড়ে বাঙালি গণহত্যা কান্ডের ঘটনা পরিচালিত করতে থাকে। পার্বত্য দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা হঠাৎ করে কোন বাঙালি গ্রামে আক্রমণ করে হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ করে গ্রামটিকে ধ্বংস করে দেয়ার চেষ্টা করেছে বারবার। এভাবেই পাহাড়ে একের পর এক গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের দ্বারা। এদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক ছিল রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার ভূষণছড়া গণহত্যা।



বিশ্বের ইতিহাসে একরাতে এত বড় গণহত্যার নজির খুব বেশি নেই। ১৯৮৪ সালের ৩০ মে দিবাগত ভোর চারটায় অর্থাৎ ৩১ মে ভোর চারটা থেকে শুরু করে সকাল আটটা পর্যন্ত উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা ভূষণছড়া বাঙালি গ্রামে একযোগে হামলা করে প্রায় চারশত বাঙালিকে হত্যা করে এবং এই ঘটনায় সহস্রাধিক বাঙালি আহত হয়। পুড়িয়ে দেয়া হয় তিন শতাধিক বাঙালি ঘরবাড়ি।

তৎকালীন সামরিক শাসনামলে গণমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ আরোপিত থাকায় গণমাধ্যমগুলো এত বড় ঘটনা কোন রিপোর্ট করতে পারেনি। এছাড়াও ঘটনাটি প্রকাশ হলে উপজাতীয়রা ভয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে পারে এই অজুহাত দেখিয়ে তৎকালীন সরকার এই ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিয়ে ফেলে। তৎকালীন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কারণে কোনো সাংবাদিকদের পক্ষেও ঘটনাস্থলে গিয়ে সঠিক পরিস্থিতি তুলে ধরার মতো বাস্তবতা ছিলনা সেসময়।

কিন্তু এই ঘটনার পরে বিক্ষুব্ধ বাঙালিরা উপজাতীয় গ্রামে হামলা করলে কয়েকজন উপজাতীয় গ্রামবাসী হতাহত হয়। উপজাতিদের পক্ষে মিডিয়ার সরকারি সেন্সরশিপ এড়িয়ে বিদেশের মাটিতে বসে  বাঙ্গালীদের আক্রমণের ঘটনাটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশ করে। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে ভূষণছড়ায় পাহাড়ীদের গণহত্যার বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে, পাহাড়িদের একতরফা ও অতিরঞ্জিত প্রচারণা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় এবং সেই সূত্রে বিভিন্ন লেখকদের লেখা ও গবেষণায় প্রকাশিত ও ডকুমেন্টেশন হয়। আড়ালে পড়ে যায় বাংলাদেশের ইতিহাসে এক দিনে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও বর্বরতম এক গণহত্যার কথা।

ঘটনার পর তৎকালীন সরকার প্রধান রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ নিহত ও আহত এবং অন্য ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালিদেরকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন এর কথা ঘোষণা করলেও নামকাওয়াস্তে কিছু নগদ টাকা দেয়া ছাড়া আর কোনো পুনর্বাসন করা হয়নি। কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালিরা। এমনকি এই ঘটনায় বরকল থানায় মামলা করতে গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কথা বলে বরকল থানা সেসময় বাঙ্গালীদের মামলা গ্রহণ না করে একটি জেনারেল ডায়েরি করে রাখে। বাঙালিরা বারবার মামলা করার চেষ্টা করলেও পুলিশ কোনো মামলা গ্রহণ করেনি। ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম ও বর্বরতম গণহত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।

রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার একটি দুর্গম ইউনিয়নের নাম ভূষণছড়া। রাঙামাটি জেলা শহর থেকে এর দুরত্ব ৭০-৭৫ কি.মি.। পুরোটাই জলপথ। সড়কপথে জেলা শহরের সাথে এই এলাকায় যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কাপ্তাই লেকের ভেতর দিয়ে স্পিড বোটে যেতে লাগে আড়াই ঘণ্টা। দেশীয় ইঞ্জিন চালিত নৌকায় যেতে সময় লাগে ৫-৬ ঘণ্টা। কর্ণফুলি নদীর ওপারে বিজিবি’র ছোট হরিণা জোন। এপারে ভুষণছড়া। নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় যোগাযোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি লক্ষ্যণীয়।

৩০ মে ২০২১ সালে ভূষণছড়া দিবসের আলোচনা দেখতে যাওয়ার পূর্বে ভূষণছড়া গণহত্যাকাণ্ডে নিহত শহীদদের গণকবর দেখতে ২০০৯ সালে আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। তখন সেখানে গণকবরে একটি পাকা দেয়াল দেখেছিলাম। তার একটি জায়গা ভেঙে গিয়েছিল, যা দিয়ে কুকুর যাতায়াত করছিল। বিষয়টা আমাকে ব্যথিত করেছিল। আমার লেখায় সেটি তুলে ধরেছিলাম। কিন্তু গত রবিবার যখন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলাম তখন সেই পাকা দেয়ালের কোনো ছিটেফোটাও দেখতে পেলাম না। এমনকি শতাধিক শহীদের গণকবর সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থাই দেখলাম না। বরং যেটি দেখলাম তা আরো হৃদয় বিদারক। সম্ভবত মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বাঁশের একটি বেড়া দেয়া হয়েছে। কবরগুলো সদ্য কুপিয়ে পরিস্কার করার দৃশ্য সুস্পষ্ট ছিলো। এ নিয়ে শহীদদের স্বজনের ক্ষোভের অন্ত নেই।


পার্বত্য চট্টগ্রামের আরো কিছু গণহত্যা সম্পর্কে পড়ুন


৩০ মে আমি যখন ঘটনাস্থলে যাই তখন সেখানে ১০-১২জন ক্ষতিগ্রস্ত এবং ২৫-৩০ ক্ষতিগ্রস্তের স্বজন উপস্থিত ছিলেন। ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে সেই ভয়াবহ রাতের নারকীয় বর্বরতার চিহ্ন বহন করে চলেছেন। তাদের সবার শরীরের বিভিন্ন স্থানে শান্তিবাহিনীর গুলি ও নানাভাবে আঘাতের চিহ্ন। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারী ছিলেন। যারা তখন শিশু, কিশোরী বা সদ্য বিবাহিতা তরুণী ছিলেন। তারা শান্তিবাহিনীরা সেইসব নারী শিশুদেরও রেহাই দেয়নি। তাদের কয়েকজন আমাকে বলেন, শান্তিবাহিনী সেদিন যত গর্ভবতী নারী সামনে পেয়েছে তাদের সবার পেট চাকু দিয়ে কেটে বাচ্চা বের করে দিয়েছে। যারা ছোট শিশু ছিলো তাদের উপরে ছুঁড়ে মেরে তার নিচে চাকু ধরে গেঁথে দিয়েছে, প্রভৃতি ভয়াবহ জিঘাংসার বর্ণণা।

পুরুষ ক্ষতিগ্রস্তরা জানিয়েছে, হামলা দুইভাগে হয়েছে। রাতের অন্ধকারে একবার হামলা হয়েছে। সেসময় অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে পরিবার নিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিল। জঙ্গলে তাদের অনেককে হত্যা করা হলেও রাতের অন্ধকারে অনেকেই গা ঢাকা দিয়ে থাকতে সক্ষম হন। এরপর ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে হামলা বন্ধ হয়ে যায়। এতে জঙ্গলে পালিয়ে থাকা অনেকেই মনে করেন, শান্তিবাহিনী চলে গেছে। ফলে জঙ্গল থেকে তারা বেরিয়ে আসতে শুরু করেন। এসময় শান্তিবাহিনী পুণরায় হামলা করে অবশিষ্টদের হত্যা করে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত তাসলিমা নামের এক নারী পার্বত্যনিউজকে জানায়, ঘটনার সময় তার বয়স ৪ বছর ছিলো। হামলা শুরু করলে তার পিতা তাকে কোলে নিয়ে পালাতে গিয়ে শান্তিবাহিনীর সামনে পড়ে যায়। এসময় তার পিতাকে ব্রাশ ফায়ার করলে তিনি পিতার কোল থেকে পড়ে যান। এসময় শান্তিবাহিনীরা তাকেও গুলি করলে তার হাতে ও পায়ে গুলি লাগে। তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। শান্তিবাহিনী মৃত ভেবে ফেলে যায়। এরপর তিনি কিভাবে বেঁচে গিয়েছেন বলতে পারেন না। হাতে-পায়ে গুলির আঘাতের চিহ্ন দেখিয়ে তিনি বলেন, যারা সেদিন আক্রমণ-নির্যাতন করেছিল তারাই পরে সরকারি নানারকম সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে। আমরা যারা মার খেয়েছিলাম তারাই এখন অনাহারে-অর্ধাহারে কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।

খাদিজা নামের এক নারী পার্বত্যনিউজকে জানায়, তার বাবা তাদের মা ও ৭ ভাইবোন নিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিলেন। প্রথম দফা হামলা থামার পর তার পিতা দুরে পালানোর জন্য তাদের জঙ্গলের কিনারায় রেখে নদীতে নৌকা আনতে গিয়ে শান্তিবাহিনীর দ্বিতীয় দফা হামলার মুখে পড়েন। তারা অনেক খোঁজাখুজি করেও তাদের পিতার লাশ আর খুঁজে পাননি।

এক রাতে পরিবারের ১১ সদস্যকে হারানো নুরুন্নাহার বেগম বলেন, ‌‘১৯৮৪ সালের ৩১ মে আমার বয়স ছিলো মাত্র ৭ বছর। কিন্তু ওই রাতেই আমি মা বাবা বোনসহ পরিবারের ১১ সদস্যকে হারিয়েছি। বড় ভাই রমজান আলী ও আমি ছাড়া সেদিন আর বেঁচে ছিলো না কেউই। এই হত্যার বিচার চাই আমি। চাই ক্ষতিপূরণও।’

নুরুন্নাহার বেগম যখন এসব কথা বলছিলেন তখন কবরের পাশে কাঁদছিলেন তার ভাই রমজান আলী। শুধু নুরুন্নাহার বেগম নন; শান্তিবাহিনীর আক্রমণে সেদিন স্বজনহারা হয়েছেন শাহজালাল, রাণী বেগমসহ শত শত মানুষ।

মোহাম্মদ শাহজালাল নামে স্থানীয় এক মসজিদের মুয়াজ্জিনের মা মারা গিয়েছিল ঘটনার দিন। তিনি ক্ষোভের সাথে পার্বত্যনিউজকে জানান, ৪০ বছর পর যদি এই দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে পারে তাহলে আমরা কেন আমাদের মায়ের হত্যার বিচার পাবো না। তিনি আরো বলেন, প্রেসিডেন্ট এরশাদ ক্ষতিপুরণ হিসেবে আমাদের জমি দেয়ার কথা বলেছিলেন। সে জমি তো পাইই নাই। উল্টো আমাদের কবুলিতভুক্ত জমি পড়ে আছে পাহাড়ের কিনারে কিনারে। সেসব জমিতেও চাষাবাদ করতে যেতে পারছি না।পাহাড়িরা সেখানে চাষাবাদ করছে।

মুহাম্মদ নিজামউদ্দীন পার্বত্যনিউজকে জানান, ৮৪’র ঐ ঘটনায় তিনি তার স্ত্রী, দুই সন্তান এক মেয়েকে হারিয়েছেন। তার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। সেই আগুনে তার শিশু সন্তানদের ফেলে দেয়া হয়। তারা পুড়ে একসাথে দলা হয়ে গিয়েছিল। তার স্ত্রীর পেটের মধ্যে ব্রাশফায়ার করলে তার নাড়িভুড়ি বের হয়ে যায়। তিনি এ ঘটনার বিচার চান।

আবদুর রাজ্জাক পার্বত্যনিউজকে জানান, ৮৪’র ৩১ মে তার স্ত্রী পুত্র এ ঘটনায় নিহত হয়েছে। ১৯৯১ সালে শান্তিবাহিনী তার বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। এরপর ২০১১ সালে তার আরেক ছেলে কাপ্তাই লেকে মাছ মারতে গিয়ে নিখোঁজ হয়। শান্তিবাহিনী তাকে অপহরণ করে হত্যা করে। লাশ এখনো খুঁজে পাননি।  তিনি দাবী করেন, গ্রুপের পক্ষ থেকে রাঙামাটিতে মার্শাল ল’ কোর্টে তিনি মামলা করেছিলেন। খুনীরা তোর চোখের সামনে বুড়া হয়ে মারা গেছে। কেউ ছুঁয়েও দেখেনি। তিনি কোনো বিচার পাননি। ক্ষতিপুরণ হিসেবে এ পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা ও ১ বস্তা চাউল পেয়েছেন- যা দিয়েছিলেন দীপঙ্কর তালুকদার। একটা মানুষের দাম যে এই হতে পারে সেটা ঐ দিনই জানলাম।

মুশফিকুল ইসলাম লায়ন পার্বত্যনিউজকে জানান, ৮৪ ঐ গণহত্যায় তার পরিবারের ৭ জন নিহত হয়েছে। একমাত্র সদস্য হিসেবে তিনি বেঁচে আছেন। তার চাচী গর্ভবতী ছিলেন। শান্তিবাহিনী দা দিয়ে তার পেট কেটে গর্ভস্থ সন্তান বের করে দিয়েছিল। তিনি বলেন, আমরা যখনই বিচার চাইতে গিয়েছি, সরকার বলেছে, বিচার করে তাদের আর ফেরত পাওয়া যাবে না। আমরা তোমাদের জায়গা, জমি, চাকরীসহ ক্ষতিপুরণ দেবো কিন্তু আমরা কিছুই পাইনি।

তৈয়বুর রহমান তার পিতাকে হারিয়েছেন এ ঘটনায়। তিনি ক্ষোভের সাথে পার্বত্যনিউজকে বলেন, এদেশে অনেক পুরাতন ঘটনার এখন বিচার হচ্ছে। তাই আমরাও আমাদের পিতার হত্যার বিচার চাই।

গণহত্যায় নিজের ১২ জন আত্মীয়কে হারিয়েছেন আব্দুল হাই নামে এক বৃদ্ধ বলেন, ভূষণছড়া হত্যাকাণ্ডের পর শান্তিবাহিনীর যেসব সন্ত্রাসী ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল সরকার তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে জমি, রেশন, ঘরবাড়ি, চাকরি ও ব্যাংকঋণ দিয়ে নানাভাবে পুনর্বাসিত করেছে। কিন্তু আমরা হতাহত পরিবারগুলো আজ পর্যন্ত কিছু পাইনি। নিহতদের লাশ যে গণকবরে দাফন করা হয়েছিল সেই গণকবরও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তত্কালীন ভিডিপি কমান্ডার আব্দুল হামিদ বলেন, সেদিন ঘটনার পর গ্রামের মানুষ মামলা করতে বরকল থানায় গিয়েছিল। কিন্তু মামলা না নিয়ে জিডি নিয়েছিল। প্রশাসন আমাদের দুই একর করে জমিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মামলা না করতে বলেছিল। কিন্তু তারা আজ পর্যন্ত কোনো কথা রাখেনি।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত পার্বত্য নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় মহাসচিব আলমগীর করিব পার্বত্যনিউজকে বলেন,  ভূষণছড়া গণহত্যার ৩৭ বছর পরও ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালিরা তাদের নিহত স্বজনের হত্যার বিচার চেয়ে শীর্ষ স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, তারা সরকারের প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন চায়।

বাঙ্গালীদের দাবি শান্তি চুক্তির আওতায় শান্তি বাহিনীর সদস্যদের ক্ষমা করা হলেও ফৌজদারি অপরাধের মামলার ক্ষমা হতে পারে না। তাদের মতে, বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘটনায় সরকার রাজাকারদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেও যে সমস্ত রাজাকার ফৌজদারি অপরাধ করেছিল তাদেরকে ক্ষমা করেনি। ফলে স্বাধীনতার ৪০ বছর পর ৭১ সালের যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার করে শাস্তি দিয়েছে বর্তমান সরকার।

একইভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদেরকে ইন্ডেমনিটির মাধ্যমে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে সংবিধান সংশোধন করলেও উচ্চ আদালতের রায়ে সেই ইন্ডেমনিটি বাতিল করে জাতির পিতা হত্যাকারীদের বিচার করা হয়েছে। সেই বিচারে শান্তি চুক্তি কোনো সাংবিধানিক ও আইনগত বিষয় নয়। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সমস্ত উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা শান্তিচুক্তির পূর্বে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের মতো অপরাধের সাথে জড়িত তাদের বিচার করতে কোনো আইন গত বাধা থাকার কথা নয় । তাই ভূষণছাড়ায় নিহত-আহত বাঙালি পরিবারের সদস্যরা তাদের স্বজনদের হতাহতের ঘটনার যথোপযুক্ত বিচার দাবি করছে এবং একই সাথে সরকারের প্রতিশ্রুত পূরণ এবং তাদেরকে নিজ ভূমিতে পুনর্বাসন করার জন্য জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে।

একই সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার মাসুম রানা পার্বত্যনিউজকে বলেন, হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বিচার এবং ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন না পেয়ে অনেকেই এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয় অন্যদিকে এ ঘটনার সাথে জড়িত উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা যারা ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল সরকার তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ জমি, রেশন, ঘরবাড়ি, চাকরি ব্যাংকঋণ দিয়ে নানাভাবে পুনর্বাসিত করেছে। এমনকি এই ঘটনার সাথে নেতৃত্বদানকারী তৎকালীন শান্তিবাহিনীর সামরিক কমান্ডার মেজর রাজেশ ওরফে মনিস্বপন দেওয়ান শান্তি চুক্তির আওতায় সাধারণ ক্ষমা পেয়ে, নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদের সদস্য এবং প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা উপভোগ করেছে। কিন্তু নিহত-আহত ঘরবাড়ি ছাড়া তথা সর্বহারা বাঙালিরা কিছুই পায়নি। তাদের লাশ যে গণকবরে দাফন করা হয়েছিল সেই গণকবরও যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি।

ভূষণছড়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. মামুনুর রশিদ মামুন পার্বত্যনিউজকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা বাঙালিদের নিধনে ভূষণছড়া গণহত্যাসহ এ পর্যন্ত যতগুলো হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বর্তমান সরকারের কাছে তার বিচার দাবি করছি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন দাবি করছি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুয়েল রানা বলেন, ১৯৮৪ সালে ভূষণছড়ায় সহিংস ঘটনায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, সরকারের নির্দেশনা পেলে তাদের তালিকা প্রস্তুত করে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এদিকে দীর্ঘ ৩৭ বছর পার হলেও রাঙামাটি জেলার ভূষণছড়ায় সংঘটিত গণহত্যার বিচার হয়নি এখনও। এক রাতের তাণ্ডবে নিঃস্ব হওয়া ১৬০০ পরিবার পায়নি কোন ক্ষতিপূরণও। চার শতাধিক মানুষ হত্যা করা হলেও এখন পর্যন্ত হয়নি কোনো মামলা। এদিকে নিহতের স্বজনরা ভূষণছড়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে রোববার শোকসভা করেছেন। তারা খুনিদের দ্রুত চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। গণকবরে গিয়ে আহাজারীও করতে দেখা গেছে স্বজন হারানো মানুষদের।

শোকসভা অনুষ্ঠানেও বক্তারা এই গণহত্যার বিচার দাবি করেন। ভূষণছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুয়েল রানা, থানার ওসি জসিম উদ্দিন ও স্বজন হারানো মানুষরা।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: গণহত্যা, ভূষণছড়া গণহত্যা, শান্তিবাহিনী
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + ten =

আরও পড়ুন