সেন্টমার্টিনে ক্রু-দালালদের সঙ্গে যাত্রীদের সংঘর্ষে ঘটনায় ৩ মামলা: আটক ৬: আহতদের চিকিৎসা চলছে
স্টাফ রিপোর্টার:
কক্সবাজারের টেকনাফ সেন্টমার্টিনে বাংলাদেশের সীমান্তের ভিতরে পূর্ব-দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে বুধবার সকালে অবৈধভাবে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলারের ভেতর ক্রু-দালালদের সঙ্গে যাত্রীদের সংঘর্ষে গুলিতে নিহতের ঘটনার একদিন পর ৩১৮ জন যাত্রী বহনকারি সেই ট্রলাটি গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬ টার দিকে টেকনাফে নিয়ে এসেছে কোস্টগার্ড।
এদিকে মালয়েশিয়াগামী ৫জন নিহতের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৬ জন আটক করা হয় । এ ব্যপারে থানায় ৩টি মামলা দায়েরের কথা জানানো হয়েছে। সংঘর্ষে নিহত ৫ জনের লাশ ময়না তদন্তের জন্য বেলা ১২টায় কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। গুলিতে গুরুতর আহত ২৯ জনকে ভর্তি করা হয়েছে একই হাসপাতালে। আজ শুক্রবার স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হবে বলে জানান গেছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রেস বিফিং এ সাংবাদিকদের কাছে পুরো ঘটনার বিষয়বস্তু তুলে ধরে কোস্টগার্ডের টেকনাফ স্টেশনের কমান্ডার লে.কর্ণেল কাজি হারুন অর রশীদ মোট ২৯৮ জন যাত্রী বিষয় নিশ্চিত করেছেন। তৎমধ্যে সংঘর্ষে ঘটনায় ৫ জন নিহত, গুলিবিদ্ধ, অসুস্থ ব্যক্তি ও আটকসহ ২৯৩ জন। গত বুধবার রাত ১২ টার দিকে নিহত ৫ জনের লাশসহ গুলিবিদ্ধ ও আহতসহ ৬৮ জনকে আনা হয়। পরেরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬ টার দিকে বাকি ২৩০ জনসহ জব্দকৃত ট্রলাটি কে নিয়ে আসা হয়।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন ট্রলারে থাইল্যন্ডের নাগরিক চেং ও জাহাজের ক্রু মং এবং দালাল মিয়ানমার নাগরিক আবদুল গফুর, একই ঘটনায় জড়িত নরসিংদীর শিবপুর থেকে কামাল সরকার , সাতকানিয়া থেকে কাঞ্চনাপাল পাড়ার মৃত ইন্দু ভূষণ পালের ছেলে প্রকাশ পাল (৪৮) ও কক্সবাজারের রামু উপজেলার তেচ্ছিপুল এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে মো. জাহাঙ্গীর আলম (২৭)।
সূত্র জানায় দীর্ঘ ২৫ কিলোমিটার সমুদ্র চ্যানেল অরক্ষিত হয়ে পড়ায় সৈকতকে মালয়েশিয়া মানব পাচারের নিরাপদ রোড হিসেবে ব্যবহার করছে পাচারকারীরা। যার কারণে কক্সবাজারে বিশেষ করে টেকনাফ, উখিয়া, মহেশখালী ও কক্সবাজার সদরে মানব পাচার অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ছে। এ আদম পাচার কাজে সরাসরি রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। সংলিষ্ট প্রশাসন বহনকারিদের আটক করলেও ছদ্মনাম ব্যবহারকারি প্রকৃত দালালদের এখনো আটক করতে পারেননি।
এ প্রসঙ্গে লে.কর্ণেল কাজি হারুন অর রশীদ বলেন, মালয়েশিয়া পাচারকাজে ব্যবহত ট্রলারগুলো দিনের বেলায় মিয়ানমার সীমান্তে থাকে এবং রাতে সুযোগ বুঝে মালয়েশিয়া পাঠিয়ে দেয় । যার জন্য তাদের সহজে আটক করা সম্ভব হয়না। এবছর বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে কয়েকটি ট্রলারসহ ৫৭০ জন আটক করেছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে সহকারি পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন মজুমদার জানান, মালয়েশিয়া পাচার প্রতিরোধে পুলিশের নজরদারি রয়েছে। গত শুধু টেকনাফে এক বছরে ৮৫৪ জন যাত্রী উদ্ধার. ১৬৪ জন দালাল ও ৪৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে গুলি বর্ষণের ঘটনায় পৃথক ৩ মামলা দায়ের

সেন্টমার্টিনের অদূরে বঙ্গোপসাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে মানব পাচারকারীদের গুলিতে আহত ২৯ জনকে টেকনাফে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর উন্নত চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে। পাশাপাশি নিহত ৫ বাংলাদেশীর লাশ ময়না তদন্ত শেষে রাখা হয়েছে সদর হাসপাতাল মর্গে। নিহতদের স্বজনরা এলে তাদের কাছে লাশগুলো হস্তান্তর করা হবে বলে জানায় পুলিশ।
এদিকে এ ঘটনায় ১২ জুন বিকেল ৫ টার দিকে শহরের বাজারঘাটাস্থ হোটেল সী-হাট থেকে প্রকাশ পাল ও জাহাঙ্গীর আলম নামের ২ দালালকে আটক করে কক্সবাজার মডেল থানা পুলিশ। কোস্টগার্ড কর্তৃক বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় হত্যা ও মানব পাচারসহ পৃথক ৩টি মামলা দায়েরের কথা জানিয়ে টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মোক্তার হোসেন বলেন, আটক থাইল্যান্ডের ২ নাগরিক ও শিবপুরে আটক কামালসহ আরো অনেকে।
সোনার হরিণ ধরতে সাগরপথে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে পাচারকারীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নিতে আসা কুষ্ঠিয়ার সজীব, নরসিংদীর আরাফাত আলী ও মুন্সিগঞ্জের মিল্লাতসহ আরো কয়েকজন জানায় ৩/৪ ধরে পানি পর্যন্ত তাদের খেতে দেয়া হয়নি বলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন আরো অনেককে গলা কেটে ও গুলি করে পানিতে লাশ ফেলে দিয়েছে মানব পাচারকারীরা।
তাদের কেউ কেউ জানায়, দীর্ঘ ১৩ দিন ট্রলারটি বিকল হয়ে সাগরে ভাসছিল। শেষের দিকে খাবার নিয়ে তাদের সঙ্গে পাচারকারীদের কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় পাচারকারীরা নিরস্ত্র যাত্রীদের ওপর গুলি চালায়। তবে এ দাবী নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। বিভিন্ন জনের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। প্রথম দিকে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের উপর গুলি চালিয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও সরকারী তরফ থেকে কেউ তা স্বীকার করেনি।
উল্লেখ্য, সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে টেকনাফের সেন্টমার্টিনদ্বীপ থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব এলাকার মিয়ানমার সীমান্তের নিকটবর্তী জলসীমায় পাচারকারী চক্রের গুলিতে ১১ জুন নিহত হন বাংলাদেশী ৫ যাত্রী। নিহত যাত্রীরা হলেন-বগুড়ার সাইফুল ইসলাম, যশোরের রুবেল, সেলিম, সিরাজগঞ্জের মনির হোসেন ও মোহাম্মদ ইসলাম।
মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে গুলিবর্ষনের ঘটনায় এক দালাল আটক

অবৈধভাবে নদীপথে মালয়েশিয়া পাঠানোর অভিযোগে নরসিংদীর শিবপুর থেকে কামাল সরকার নামে এক দালালকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল সন্ধ্যায় উপজেলার ধনাইয়া গ্রাম থেকে তাকে আটক করা হয়।
শিবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার মিজানুর রহমান জানান, অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে বুধবার বিকেলে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত থেকে উদ্ধার যাত্রীদের উদ্ধার করা হয়। ওই ট্রলারের যাত্রী শিবপুরের জয়নগর গ্রামের নাঈমের বাবা আসাদ মিয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে কামালকে আটক করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় আরো কেউ জড়িত থাকলে তাদেরও গ্রেপ্তার করা হবে। এলাকাবাসী জানায়, আটককৃত কামাল সরকার ইতোপূর্বে প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধভাবে সাগরপথে বেশ কয়েকজনকে পাচার করেছে। এদের অনেকেই এখনো নিখোঁজ রয়েছে। উল্লেখ্য, বুধবার বিকেলে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ-মীয়ানমার সীমান্ত থেকে কোস্টগার্ড তিন শতাধিক মালয়েশিয়াগামী যাত্রীসহ একটি ট্রলার উদ্ধার করে।
বঙ্গোপসাগরে মালয়েশিয়াগামী গুলিবিদ্ধ ও আহতের চিকিৎসা চলছে: নিহতের লাশ মর্গে স্বজনের অপেক্ষায় 
সেন্টমার্টিনের অদূরে বঙ্গোপসাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে মানব পাচারকারীদের হামলায় আহত ৬০ জনকে টেকনাফ ও কক্সবাজার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কোস্টগার্ডের টেকনাফ স্টেশন কমান্ডার লে. কাজী হারুনুর অর রশীদ জানান- নিহত ৫ জনের লাশ সেন্টমার্টিন থেকে বুধবার রাত ২টার দিকে একটি ট্রলারে করে কোস্টগার্ড তাদেরকে টেকনাফে নিয়ে আসে।
লাশগুলো কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আহত ৪০জনকেও টেকনাফ থেকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকীদের তিনটি ট্রলারে করে সেন্টমার্টিন থেকে টেকনাফ মডেল থানায় সোর্পদ করা হয়েছে বলে কাজী হারুন অর রশীদ।
আহতদের মধ্যে ২৩ জন রয়েছে গুলিবিদ্ধ। এছাড়া আহতাবস্থায় আটক ট্রলারের ২ ক্রু ও তাদের সহযোগী ১ মিয়ানমার নাগরিকসহ ৩ জনকেও তাদের সাথে টেকনাফে আনা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রফিকের পুত্র সেলিম, মোকামের পুত্র রুবেল, বগুড়ার মাটিরডালি এলাকার সাইদুল এবং সিরাজগঞ্জের মনিরের পরিচয় পাওয়া গেছে। অন্যদের পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। উদ্ধারপ্রাপ্ত মালয়েশিয়া যাত্রীরা যশোর, কুষ্টিয়া, নরসিংদী, সিরাজগঞ্জ, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।
এদিকে টেকনাফে আসা যাত্রীরা তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। তারা জানায় খাবার ও পানি চাইলে ট্রলারের ক্রুরা তাদেরকে নির্দয়ভাবে মারধর করতো। ট্রলারের যাত্রী কুষ্টিয়ার আলমগীর হোসেন জানান, ১৫ দিন পূর্বে কক্সবাজার থেকে ছোট ট্রলারে করে তিনি মালয়েশিয়াগামী বড় ট্রলারটিতে উঠেন। উল্লেখ্য বুধবার সকালে সেন্টমার্টিনের অদূরে বঙ্গোপসাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারটিতে মানবপাচারকারীদের হামলায় ৫ জন নিহত ও ৬০ জন যাত্রী আহত হয়। ট্রলারের ক্রু ও যাত্রীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে পরে সাগরে অবস্থানরত অন্যান্য মানবপাচারকারীরা ৫টি ট্রলারে এসে এই ট্রলারটিতে গুলিবর্ষন করে। এতে হতাহতের এ ঘটনা ঘটে।
মালয়েশিয়াগামীদের কোস্টগার্ড কর্তৃক টেকনাফ থানায় সোপর্দ
সাগরপথে মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের সেন্টমার্টিন থেকে টেকনাফে নিয়ে আসা হয়েছে। সেন্টমার্টিন-টেকনাফ নৌ পথের ৪টি সার্ভিস বোট ও আটক বিকল জাহাজে করে ২শ ৩০ জন যাত্রী নিয়ে সন্ধ্যায় টেকনাফে পৌঁছেছে। তাদের টেকনাফ মডেল থানায় নিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান টেকনাফ থানার ওসি মোক্তার হোসেন।
আহতদের মধ্যে আশংকাজনক কয়েক জনকে টেকনাফ হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কয়েকজনকে চমেকে পাঠানো হয়েছে। সেন্টমার্টিনে কোস্টগার্ড ও নৌ বাহিনীর হেফাজতে থাকা ২শ ৩০ জনের মধ্যে মাত্র কয়েকজন শিশু থাকলেও কোন মহিলা যাত্রী নেই বলে জানা যায়। গতকাল সন্ধ্যায় গভীর বঙ্গোপ সাগর থেকে বিকল জাহাজটি সেন্টমার্টিন পৌছলে সেখান থেকে ৫ যাত্রীর লাশ ও প্রায় অর্ধশত ব্যাক্তিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।




















