মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিরসনে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা

fec-image

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বর্তমানে দেশটির কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে পাকিস্তান যেভাবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যেও দেশটির প্রভাবকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান মূলত দক্ষিণ এশিয়া কেন্দ্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে একটি কেন্দ্রীয় শক্তিতে আবির্ভূত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যখন প্রথাগত কূটনীতি ব্যর্থ হয়, তখনই শান্তি আলোচনার ভার পড়ে তাদের ওপর যারা যুদ্ধের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। আর সেই ধারণারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ইসলামাবাদে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার ব্যক্তিগত কূটনৈতিক দক্ষতার সুবাদে গত ১২–১৩ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সরাসরি আলোচনার টেবিলে আনার ঘটনা এটিই প্রথম। যদিও এই বৈঠকে তাৎক্ষণিক কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি, তবে এটি শান্তি আলোচনার একটি ইতিবাচক সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কেন সামরিক বাহিনী বেশি কার্যকর?

সামরিক নেতাদের এই নতুন ভূমিকার পেছনে বেশ কিছু কৌশলগত কারণ রয়েছে:

সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের নিজস্ব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং বিদেশি প্রতিপক্ষের সাথে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে, যা অনেক সময় বেসামরিক কূটনীতিকদের কাছে থাকে না।

কেবল আলোচনার টেবিলে বসা নয়, বরং যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তির শর্তগুলো কার্যকর করার মতো সক্ষমতা ও গ্যারান্টি দেওয়ার ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর রয়েছে।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতার চেয়ে সামরিক বাহিনীর কঠোর ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মপদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ফলাফল পেতে সহায়তা করে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে পাকিস্তানের একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর, পাকিস্তানকে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। এছাড়া, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নেও পাকিস্তান দৃশ্যমান ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি সেখানে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী বাহিনীর (International Stabilization Force) অংশ হিসেবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

যদিও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বিদ্যমান অবিশ্বাসের কারণে পরবর্তী আলোচনা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে, তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা এখনো চলমান। তুরস্কের প্রতি ইসরায়েলের ক্ষোভ, ওমানের মধ্যস্থতার সক্ষমতা হ্রাস এবং জাতিসংঘের ব্যর্থতার সুযোগে পাকিস্তান এখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন ও শক্তিশালী ‘নিরাপত্তা মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সূত্র : দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট অনলাইন (২৩ এপ্রিল ২০২৬)

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আন্তর্জাতিক, পাকিস্তান, সেনাবাহিনী
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন