বান্দরবানের ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষক

fec-image

বান্দরবান সদর উপজেলার ২নং কুহালং ইউনিয়নের বিক্রিছড়ার মেহ্লাউ পাড়াতে ধান মাড়াইয়ের ব্যস্ত কৃষক উসিং হাই মারমা

ধানের দাম নিয়ে কথা বলতে গেলেই তাঁর চোখে মুখে চরম হতাশা জেগে ওঠে। কারণ ধান চাষ করে এখন আর লাভ করতে পারছেন না তিনি।

বান্দরবান সদর উপজেলার ২নং কুহালং ইউনিয়নের বিক্রিছড়া মেহ্লাউ পাড়ার গ্রামে সরজমিনে গিয়ে এমনটায় দেখা গেছে।

কৃষিবিদদের মতে, সারা দেশে এখন ধানের দামের মন্দা। তার প্রভাব পরেছে বান্দরবানেও। ধানের দাম এভাবে চলতে থাকলে কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারাবে। কৃষি কাজের শ্রমিকদেরও দৈনিক মজুরি ৭শ’ টাকা ও কৃষকদের ধান চাষে অতিরিক্ত খরচ হওয়ায় তারা পোষাতে পারছেন না বলেই তাদের এই দূর অবস্থা।

এদিকে, জেলার ৭টি উপজেলার মধ্যে লামা, আলীকদম, রোয়াংছড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমা, থানছি ও সদর উপজেলার এলাকা গুলোতে যে চিত্র পাওয়া গেল সেটি হচ্ছে পাহাড়ি গ্রাম অঞ্চল গুলিতে কৃষি শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

ফলে শ্রমিকের মজুরির দাম বেড়ে এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে কৃষকদের ধান উৎপাদন খরচ লাগামহীন ভাবে বেড়ে গেছে। মাঠে কাজ করার জন্য কৃষি শ্রমিক জোগাড় করতে ভীষণ কষ্ট হয় কৃষকদের। শ্রমিক যদিও পাওয়া যায় তাহলে একজন কৃষি শ্রমিকের মজুরি দৈনিক অন্তত ৭শ’ টাকা। এই টাকার পরেও একজন কৃষি শ্রমিককে দুপুরে খাবার ও ২ প্যাকেট আকিজ বিড়ি দিতে হয়। হিসেব করে দেখা যায় বর্তমানে একজন কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরি এক মণ ধানের চেয়েও বেশি। অথচ বাজারে ধান বিক্রি করে সে দাম মিলছে না কৃষকদের।

রাজবিলা ইউনিয়নের কৃষকরা জানিয়েছেন, গত কয়েক বছর যাবত ধানের উৎপাদন বেশ ভালো হয়েছে। কিন্তু মধ্য স্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে অনেকেই গত মৌসুমে উৎপাদিত ধান এখনো বিক্রি করতে পারেননি। আবার ধান বিক্রি করতে বাড়ি থেকে বাজার পর্যন্ত যে পরিবহন খরচ দিতে হয় সেটিও আগের তুলনায় বেড়ে গেছে।

কৃষক উসিং হাই মারমা ও মো. শাহ আলম জানিয়েছেন, ধানের মণ ৫শ’ ৪০ টাকা হলেও একজন কৃষকের মজুরি ৭শ’ টাকা। এ জন্য আমরা ধান চাষ করে আর পোশাতে পারছি না। ধান চাষ নিয়ে আমারা পারিবারিক ভাবে খুবই কষ্ট আছি। এখন আর আগের মতন দিন মজুরও পাওয়া যায় না, এমনটাই বলছিলেন পাহাড়ের এই কৃষকরা।

যদি ধানের মণ ৮শ’ টাকাও হতো কৃষকরা কিছুটা হলেও বাঁচতো বলেও তারা জানান।

কুহালং ইউনিয়নের বিক্রিচড়ার কৃষক উবাচিং মারমা জানিয়েছেন, এক বিঘা জমি চাষ করতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রয় ১৪ হাজার টাকা। সে জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে ২০ মণের মতো। প্রতি মণ ৬শ’ টাকা করেও বিক্রি করলে তাঁর আয় হবে মাত্র ১২ হাজার টাকা।

বান্দরবান চাল বাজারের চালের দোকান মালিক আবুল বশর জানিয়েছেন, তিনি ২০ বছর যাবত ধান-চালের ব্যবসা করছেন। তিনি কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় থেকে শুরু করে প্রতি কেজি চাল উৎপাদন করতে খরচ হয় ৩১-৩২ টাকা। কিন্তু পাইকারি দামে চাল বিক্রি করে সেটি পুষিয়ে নিতে পারছেন না এবং খুচরা বাজারে ঠিকই ৪০-৪৫ টাকার নিচে। তবে কম দামে চাল কিনলে ভাত খাওয়া যায় না বলেও দাবি করেন আবুল বশর।

বাজালিয়ার রাইস মিল মালিক মাহামুদুল হক জানিয়েছেন, আমার রাইস মিলে প্রতি মাসে ৯শ’ থেকে ১ হাজার মন ধান মিলিং বা মাড়ায় হয়। বর্তমানে প্রতি মণ ধানের ধাম চলছে ৫শ’ টাকা থেকে ৫শ’ ৩৫ টাকার মধ্যে। হিসাব করলে ধানের চেয়ে কৃষকের মজুরি বেশি হওয়ায় কৃষকরা আমাদের কাছে অভিযোগ করলেও আমাদের কিছু করার থাকে না।

আবার অন্যদিকে কৃষকরা যাদের কাছে ধার বিক্রি করেন সেই চাতাল মালিকরাও লোকসানের কথাই বলছেন।

এ বিষয়ে বান্দরবান সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক দৈনিক বলেন, এবারে বান্দরবানে বোরো ধানের মধ্যে উৎপাদন রয়েছে ২ প্রকার ধান উপসি ব্রি-১৮, ব্রি-৭৮, ব্রি-৬৯, ব্রি-৮১, জাতের ধান। এছাড়া হাইব্রিডের মধ্যে হিরা, টিয়া, সেরাসহ বিভিন্ন জাতের ধানের এ বছর ভালই ফলন হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এবছর বোরো মৌসুমে পুরো জেলায় ৬২ হাজার ৫৯ হেক্টর জমিতে ২৬ হাজার মেট্রিকটন ধান উৎপাদন হয়েছে। জেলায় বর্তমানে ধানের দাম ৫শ’ থেকে ৫শ’ ৫০ টাকার মধ্যে ওঠা নামা করছে। সরাসরি খাদ্য বিভাগ যদি কৃষকের কাছে ধান কিনে এবং সরকার বিদেশ থেকে চাল আমদানি বন্ধ করে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে চাল রফতানি করলে দেশের কৃষকরা বাঁচবে বলে মনে করেন এই কৃষি কর্মকর্তা।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: কৃষক, ধান চাষ, বান্দরবান
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 − ten =

আরও পড়ুন