সিএনএনের রিপোর্ট

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় বিপদের শঙ্কা

fec-image

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভিযান বর্তমানে যে গতিতে চলছে তা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আরও দ্রুত কমে যাবে। এতে ভবিষ্যতে চীন কিংবা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা সিএনএন’কে এমন মন্তব্য করেছে।

গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ফের ঘোষণা করেন যে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি “শেষ হয়ে গেছে”। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, গত পাঁচ দিনের মতো একই মাত্রায় যুদ্ধ চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এমন পর্যায়ে নেমে আসবে, যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে নতুন ও আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচালিত ইরান অভিযানের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র হাজার হাজার দূরপাল্লার নির্ভুল হামলার ক্ষেপণাস্ত্র এবং শত্রুপক্ষের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বৈদেশিক নীতি গবেষণা বিভাগের প্রধান মাইকেল ও’হ্যানলন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বর্তমানে ‘আমাদের প্রত্যাশার তুলনায় কম’- এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

থাড, প্যাট্রিয়ট ও টমাহকের বড় অংশ ইতোমধ্যে ব্যবহৃত

সিএসআইএসের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শেষ হওয়ার সময় পর্যন্ত পেন্টাগন তাদের মোট থাড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্তত অর্ধেক ইন্টারসেপ্টর, প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় অর্ধেক এবং টমাহক ভূমি-থেকে-ভূমিতে হামলার ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যবহার করে ফেলেছে।

সিএনএন জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অভ্যন্তরীণ তিনটি সূত্র ওই বিশ্লেষণের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
যুদ্ধবিরতির পর কয়েক মাস ধরে সীমিত পাল্টাপাল্টি হামলা চলায় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের হার কিছুটা কমে আসে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর চাপও সাময়িকভাবে কমেছিল।

নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের ধীর গতি

মার্ক ক্যানসিয়ানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে এসব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র পুনরায় উৎপাদনের হার অত্যন্ত কম। চলতি অর্থবছরের সরবরাহ পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি মাসে পেন্টাগন মাত্র ১৫টি টমাহক এবং ২০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে। আর ২০২৬ সালে কোনো নতুন থাড ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনাই নেই।

সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের আগের মজুতের পর্যায়ে ফিরতে এসব অস্ত্র পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের তিন বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং পেন্টাগনের সাবেক ডেপুটি ও ভারপ্রাপ্ত কম্পট্রোলার এলেইন ম্যাককাসকার বলেন, অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদ পুনরায় মজুত করতে দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগবে।

এখনো অতিরিক্ত অর্থ অনুমোদন দেয়নি কংগ্রেস
পেন্টাগনের সাবেক দুই-তারকা জেনারেল ও প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ বিশেষজ্ঞ জন ফেরারি বলেন, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিস্থাপনের জন্য কংগ্রেস এখনো এক ডলারও বরাদ্দ দেয়নি। ফলে শান্তিকালীন ধীরগতির বার্ষিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
সম্প্রতি হোয়াইট হাউস ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। তবে বিলটি কংগ্রেসে অনুমোদন পাওয়া কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ

পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে সরকার কাজ করছে। গত জুনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট কার্যকর করে নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমানোর নির্দেশ দেন, যাতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো যায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উৎপাদন লাইন সম্প্রসারণের চুক্তিও করেছে প্রতিরক্ষা দপ্তর।

ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।
তবে মার্ক ক্যানসিয়ানের মতে, ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট কিছুটা সহায়ক হলেও এর প্রভাব সীমিত হবে, কারণ নতুন উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে যথেষ্ট সময় লাগে।

মিত্র দেশেও উৎপাদনের উদ্যোগ

জার্মানি ও ইউক্রেনের মতো দেশগুলোকে নিজস্বভাবে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লাইসেন্স দেয়ার উদ্যোগও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ কমাতে পারে। ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প ইউক্রেনকে এমন লাইসেন্স দেওয়ার ঘোষণা দেন।
তবে এই উদ্যোগও দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। জাপানের একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা নির্মাণে তিন বছর সময় লেগেছিল। আর ২০২২ সালে উৎপাদন লাইন তৈরির কাজ শুরু করলেও জার্মানি এখনো একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রও উৎপাদন করতে পারেনি।

উত্তর কোরিয়াও বড় ঝুঁকি

সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রিসাইস স্ট্রাইক মিসাইল ও জয়েন্ট এয়ার-টু-সারফেইস স্ট্যান্ডঅব মিসাইলের (জেএএসএসএম) মতো কিছু অস্ত্রের মজুত তুলনামূলক দ্রুত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব এবং ২০২৭ সালের মাঝামাঝি বা শেষ নাগাদ সেগুলো আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।

তবে মার্ক ক্যানসিয়ান সতর্ক করে বলেন, ঝুঁকি শুধু চীনকে ঘিরেই নয়। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হবে। একদিকে শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য, অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে মার্কিন বাহিনী ও দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলকে রক্ষার জন্য।

তবে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এখনও যুক্তরাষ্ট্রেরই রয়েছে এবং প্রেসিডেন্টের নির্দেশে যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে অভিযান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব সক্ষমতা তাদের হাতে রয়েছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক সফল সামরিক অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্রভাণ্ডার বজায় রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের মাইকেল ও’হ্যানলন মনে করেন, এখন পর্যন্ত চীন বা উত্তর কোরিয়াকে প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েনি।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি দীর্ঘ সময় ধরে একই হারে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার চলতে থাকে, তাহলে একসময় প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। তবে সেই সীমা ঠিক কোথায়, তা আগে থেকে নির্ধারণ করা কঠিন, কারণ বিষয়টি অনেকটাই সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের মানসিক মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।

উৎস : মানবজমিন

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আন্তর্জাতিক, যুক্তরাষ্ট্র, সিএনএন
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন