দ্রুত নিজ দেশে ফিরতে চান রোহিঙ্গারা



রোহিঙ্গারা বলছেন, তারা দ্রুত নিজ দেশে তারা ফিরতে চান। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী কর্তৃক হাজার হাজার নিরাপরাধ নারী-পুরুষ, মা-বোনকে নির্যাতন, ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, অপহরণ ও হত্যা করায় এই দিনটিকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করছে শরনার্থী রোহিঙ্গারা। ২০১৮ সাল থেকেই তারা দিনটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।
সরেজমিনে এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে গেলে পার্বত্যনিউজের এ প্রতিনিধিকে রোহিঙ্গারা বলেছেন, আরকানে নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও নিজ জমি-জমা ফেরত পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেই তারা স্বদেশে ফিরে যাবে- এমনটাই পার্বত্যনিউজকে জানিয়েছেন রোহিঙ্গা নেতারা।
টেকনাফ উপজেলার লেদা (নং- ২৪) ও জাদিমুরা (নং-২৭) ক্যাম্প পৃথকভাবে গনহত্যা দিবস পালন করা হবে। এছাড়াও উখিয়া উপজেলার কুতুপালং ক্যাম্পসহ অন্যান্য ক্যাম্পেও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হবে বলে জানা গেছে।
শালবাগান ২৬ নং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা বজলুর ইসলাম পার্বত্যনিউজকে জানান, নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাসহ নানান ঘটনা যাতে রোহিঙ্গারা ভুলে না যায়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে রোহিঙ্গাদের আত্মত্যাগ স্বরনে রাখে এবং যাদেরকে আমরা হারিয়েছি তাঁদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করতে দিনটি গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গা এই নেতা আরো বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তা বিশ্বের নজরে আনা এবং মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচারের আওতায় আনতে এই গণহত্যা দিবস পালন করা হচ্ছে।
এক প্রশ্নের উত্তরে বজলু বলেন, ‘আজকের দিনে দাবির বিষয় নয়, তবু বলছি- আমরা যত দ্রুত নিজ দেশে ফিরতে চাই। আরকানে নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও নিজ জমিজমা ফেরত নিশ্চিত করলেই স্বদেশে ফিরে যাব’।
টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয়কারী আবদুল হাফেজ বলেন, ‘কখন স্বদেশে ফিরে যাব, কবে ক্ষুদ্র ১০-১২ ফুটের এই শিবির থেকে মুক্তি পাব, কবে স্বাধীন ভাবে চলাচল করতে পারব, মুক্ত বাতাসে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারব প্রহর গুনছি। এক মুহুর্তও এমন বন্দী জীবনে পরিবার নিয়ে থাকতে চাইনা। সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাদের দিকে চেয়ে আছি। আমাদের দাবী আদায়ের মাধ্যমে কখন প্রত্যাবাসন শুরু করবে’।
একই ক্যাম্পের শব্বির আহমদ মাঝি বলেন, মাতৃভূমি আরকান দেশের মন জন্য কাঁদে। নাগরিকত্ব ও নিজ ভিটে-বাড়ি ফিরিয়ে দিলেই এদেশে আর থাকবো না। স্বেচ্ছায় চলে যাব। এই ভাসমান জীবন ভাল লাগছে না। ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যত দিন দিন অন্ধকার হয়ে উঠছে। এমন পরিবেশে এভাবে কি থাকা যায়।
টেকনাফ ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অতিরিক্ত ডিআইজি মো. কাউসার সিকদার বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্বাভাবিক নিরাপত্তা জোরদার রয়েছে। যে কোন অপতৎপরতা ঠেকাতে আমাদের পুলিশ সদস্যরা সদা প্রস্তুত আছে। তবে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা দিবস পালনের বিষয়ে এখনো কোন প্রকার মৌখিক বা লিখিত আবেদন করেনি।
উল্লেখ্য, মিয়ানমারে চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা উখিয়া-টেকনাফের ৩০টিরও বেশী অস্থায়ী ক্যাম্পে মানবেতর জীবন যাপন করছে। গত ২০১৭’র ২৫ আগস্ট দেশটির রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরুর পর ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এসব শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে।

আরসা নামক একটি উগ্রপন্থি সংগঠনের সদস্যরা সেনা ছাউনিতে হামলার অজুহাতে গত ২০১৭’র ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন শুরু করে মিয়ানমার সেনা বাহিনী। দেশটির সেনা, বিজিপি ও উগ্রবাদী রাখাইন যুবকরা গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়ে রোহিঙ্গা নর-নারী, শিশুর উপর বর্বরোচিত নৃশংসতা চালায়। ফলে প্রাণ বাঁচাতে বানের স্রোতের মতো বাংলাদেশের দিকে ছুটতে থাকে রোহিঙ্গারা।
জানা যায়, বর্তমানে নতুন-পুরনো মিলে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গারা দাবি করছেন, ২০১৭ সালে সেনাদের হাতে ১০০ নারী ধর্ষিত, ৩০০ গ্রামকে নিশ্চিহ্ন, ৩৪ হাজার শিশুকে এতিম, ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা, ৯ হাজার ৬০০ মসজিদ, ১২০০ মক্তব, মাদ্রাসা ও হেফজখানায় অগ্নিসংযোগ, হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম এখনো বন্দি ও ৮ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আরকান রাজ্য থেকে বাস্তচ্যুত হয়।


















