মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি

রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমরা দুই দিক থেকেই নিপীড়নের শিকার

fec-image

২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দ্বারা শুরু হওয়া গণহত্যা থেকে বাঁচতে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশের কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয় নিতে শুরু করে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে নতুন করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে রাখাইন রাজ্যের সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মি।এরপর উত্তর রাখাইনের বহু এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। সে সময় তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, দখলকৃত এলাকায় সব জাতিগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। কিন্তু বাস্তবে রোহিঙ্গারা জানাচ্ছেন, তাদের জীবনে আরাকান আর্মির শাসন অত্যন্ত কঠোর ও বৈষম্যমূলক। রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যেমনভাবে রোহিঙ্গাদের নিপীড়ন করে এসেছে, আরাকান আর্মিও এখন সেই একই পথ অনুসরণ করছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমরা দুই দিক থেকে নিপীড়নের শিকার। একদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী, অন্যদিকে আরাকান আর্মি। দুই পক্ষই নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ ও বেআইনি নিয়োগসহ বিভিন্ন সহিংসতা চালিয়েছে।

মিয়ানমার ও রাখাইন রাজ্য সম্পর্কে
১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে বার্মা এবং ইউনিয়ন অফ বার্মা নামে একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির নাম একসময় বার্মা ছিল এবং রাজধানী ছিল রেঙ্গুন। পরে ১৯৮৯ সালে দেশটির সামরিক সরকার বার্মার নতুন নামকরণ করে মিয়ানমার রাখে এবং রাজধানী রেঙ্গুনের নতুন নাম রাখা হয় ইয়াঙ্গুন।

মিয়ানমারের একটি উপকূলীয় প্রদেশ হলে রাখাইন রাজ্য। যা আগে আরাকান নামে পরিচিত ছিল। এই রাজ্যে প্রধানত রাখাইন জনগোষ্ঠী বাস করে, যারা বৌদ্ধধর্মের প্রাচীনতম শাখা থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। রাজ্যটি বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এবং এটি মিয়ানমারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল, যেখানে বর্তমানে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির লড়াই চলছে। আরাকান আর্মি মুসলমানদের সঙ্গে বৈষম্য করছে। মুসলিমদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। পুরুষদেরকে নির্যাতন করছে। এমনকি নারীদেরকে ধর্ষণ করে হত্যা ও দেশত্যাগে বাধ্য করেছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলমান রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন এখন বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমগুলোর শিরোনাম। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ইতিহাস সম্পর্কে অনেকেরই অজানা। রাখাইন রাজ্যের বেশিরভাগ অধিবাসী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। ১৯৮৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, রাখাইন রাজ্যে মুসলমানদের সংখ্যা ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। সেই সময়ে রাখাইন রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ৯৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ ছিল বৌদ্ধ। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে মুসলমানদের সেখানে বসবাস।

মূলত রোহিঙ্গারাই আরাকানের স্থায়ী ও আদি মুসলমান বলে প্রামাণ্য তথ্য দিয়েছেন গবেষকরা। রোহিঙ্গা গবেষক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান আকন্দ তার আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, আরাকান রাজ্যের মুসলিম সংস্কৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে রোহিঙ্গাদের ভূমিকা ছিল প্রধান। বাংলার অধিবাসী হবার কারণে যেমন বাঙালি বলা হয় তেমনি আরাকানের মুসলমানগণকে রোহিঙ্গা বলা হয়ে থাকে।

আরব বণিক, নাবিক, ইসলাম প্রচারক, রোহার থেকে আগত ইসলাম প্রচারক, গৌড়ীয় মুসলিম সৈন্য, বাংলায় অপহৃত দাসগণসহ অধিকাংশ মুসলমানই রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত। আধুনিক কালের প্রয়োগ হলেও যেমন বাঙালির ইতিহাস হাজার বছরের তেমনি রোহিঙ্গা শব্দটি আধুনিক কালের হলেও রোহিঙ্গাদের ইতিহাসও হাজার বছরের চেয়েও পুরনো। এরা পরিচয়হীনভাবে বেড়ে ওঠা কোন জনগোষ্ঠী নয়। মূলত রোহিঙ্গারাই আরাকানের স্থায়ী ও আদি মুসলমান।

গবেষক ড. মাহফুজুর রহমান আকন্দ তার প্রবন্ধে আরো উল্লেখ করেন যে, চট্টগ্রাম এবং আরাকানে আগত ও বসতি স্থাপনকারী আরব বণিক সম্প্রদায়, নাবিক, সুফি, দরবেশ শ্রেণী এবং ত্রয়োদশ শতকের পর থেকে তুর্কি, পাঠান ও মোগলদের শাসনামলে বাংলা থেকে আগত মুসলমানদের সাথে এ অঞ্চলের (চট্টগ্রাম-আরাকান) নিম্নবর্ণের হিন্দু ও বৌদ্ধদের সংমিশ্রণ ঘটে এবং তারা ব্যাপক হারে ইসলামে দীক্ষা গ্রহণ করে।

সেইসাথে চট্টগ্রাম অঞ্চল ছিল বাংলা, আরাকান, ত্রিপুরা ও বার্মার লক্ষ্যস্থল এবং আরাকান রাজ্যের অধীনে চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন শাসিত হওয়ার ফলে চট্টগ্রামে বসবাসরত জনগোষ্ঠী, নবদীক্ষিত মুসলমান, বহিরাগত ইসলাম প্রচারক-বণিক, সুফি-দরবেশ, উলামা সম্প্রদায় অবাধে আরাকানে ইসলাম প্রচারের জন্য যাতায়াত করতেন। ফলে চট্টগ্রামের মতো আরাকানেও একটি ইসলামি পরিবেশ সংবলিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠে। পর্দাপ্রথা, খাদ্যাভ্যাস, রান্না পদ্ধতি, এমনকি মানবীয় আচরণেও ইসলামের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

অক্টোবর ২০১৬ সালে থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে সহিংস সংঘর্ষ শুরু হয়। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) দ্বারা বিদ্রোহী হামলার ফলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী প্রধানত মুসলিম রোহিঙ্গা বেসামরিকদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটায়। তারা অক্টোবর ২০১৬ থেকে জুন ২০১৭ এর মধ্যে “ক্লিয়ারেন্স অপারেশন” শুরু করে।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আন্তর্জাতিক সম্মেলন, আরাকান আর্মি, উখিয়া
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন