আজ সেলিম হত্যা দিবস

এম. কামাল হোসেন সুজন : পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের অন্যতম শহীদ সেলিমসহ সাত জন বাঙালি হত্যাকান্ড।

রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলার গুলশাখালী ইউপির মুর্শিদাবাদ গ্রামের বাসিন্দা মৃত রহমত আলীর বড় ছেলে শহীদ সেলিম উদ্দিন ১৯৯১ সালের ২৩ জুলাই শান্তি বাহানীর হাতে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হয়। তার সাথে নিহত হয় আরও ছয় জন নিরীহ বাঙালি। গুলশাখালী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর দূরন্ত ডানপিঠে কিশোর সেলিমের বয়স তখন ১৪ বছর। সে স্কুল ফুটবল দলের সেরা খেলোয়াড় সে। শুধু খেলোয়াড় নয় আচার-আচারণ, পড়ালেখাসহ সকল বিষয়ে সেলিম ছিল বন্ধুদের মাঝে বেশ এগিয়ে।

সে যদিও পড়াশোনা ও খেলাধুলায় অগ্রগামী ছিল কিন্তু দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় পড়াশোনার খরচ চালানোর মত সামার্থ্য তার বাবার ছিল না। দরিদ্র বাবার পাঁচ সন্তানের মধ্যে সেলিম ছিল সবার বড়। সেলিমের বাবা পাহাড় থেকে কাঠ-বাঁশ কেটে বাজারে বিক্রয় করে সংসার চালাতেন। দরিদ্র সংসারে বাবার সাথে সহায়তার জন্য সেলিম নিজেও বাবার হাত ধরে পাহাড় থেকে যৎ সামান্য কাঠ-বাঁশ কেটে এনে বিক্রয় করে সংসারে সহায়তা করত। তখন ২য় সাময়িক পরীক্ষা সামনে, বেতন ও পরীক্ষার ফি দেয়ার মতো টাকা হাতে নেই। সেদিন ছিল ১০ মহরম, পবিত্র আশুরার দিন। স্কুল বন্ধ থাকায় সেলিম সেদিন সাইফুল, ইসমাইল, জয়নুদ্দিন, টিয়া ও করিমের সাথে বনে বাঁশ কাটতে যায়।

কিন্তু দুপুরের দিকে পাহাড় থেকে ভেসে গুলির শব্দ, এলএমজি’র ব্রাশ ফায়ারের শব্দ। যারা পাহাড়ে গিয়েছিল তাদের মধ্যে যে যেভাবে পাহাড় থেকে ছুটে আসে। কিন্তু বিকাল হয়ে সন্ধ্যা নামে সেলিমসহ আরও কয়েকজন। সেলিমসহ অনেকে পাহাড় থেকে বাঁশ কেটে ফেরার পথে শান্তিবাহিনীর হামলার শিকার হয়। তাদের পেছন থেকে ব্রাশ ফায়ার করে ক্ষত-বিক্ষত করে পালিয়ে যায় শান্তিবাহিনী। সেলিমদের নিথর দেহ মাটিতে লুটিয়ে পরে, রক্তাক্ত হয় পবিত্র জমিন।

বিডিআর এর তৎকালীন ৭ম ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক আবুল কালামের নেতৃত্বে তেমাথা ক্যাম্পের কয়েক জন সৈন্য ও সাহসী কয়েক জন বেসামরিক বাঙালি যুবক দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে গুলশাখালী হাই স্কুল মাঠে নিয়ে আসে। সেই নিরস্ত্র বাঙালি বাঁশ শ্রমিকদের দলে ১৬ জন হতভাগা ছিল, যার মধ্যে ৭ জন মারা যায় বাকি ৯ জন আহত অবস্থায় ফিরে আসে। নিহতরা হলেন- ১) সেলিম উদ্দিন (১৪), পিতা: রহমত আলী, ২) আব্দুল কুদ্দুছ সরকার (৫৮), ৩) জয়নুদ্দিন (১৪) পিতা: ইউনুছ আলী, ৪) টিয়া মিয়া (৫৩), ৫) আবুল কালাম (২৩), ৬) নেওয়াজ মিয়া (৩০), ৭) ইন্তাজ আলী (৪৩)। আর আহতরা হলেন- ১) আক্কাছ  আলী (৬৫), ২) ঈসমাইল মিয়া (৫০), ৩) আব্দুস সালাম (৪০), ৪) সাইফুল ইসলাম (৩৮), ৫) জসিম উদ্দিন (৪৫), ৬) জব্বার মিয়া (৫০), ৭) আইয়ুব আলী (৩৮), ৮) সফিক মিয়া (৬২)।

সেলিমের মা তখনও তার বাছাধনের মৃত্যুর খবর পায়নি, কিন্তু যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সেলিমকে খুঁজতে থাকে, সেলিমের বাবা রহমত আলী (বর্তমানে মরহুম) কোথাও প্রিয় সন্তানকে খুঁজে না পেয়ে আহতদের মাঝে খুঁজতে লাগল, কিন্তু না পেয়ে নিহতদের মাঝে খুঁজেও হতাশ হয়ে বাড়ি এসে সেলিমের দুঃখিনী মাকে বলতে লাগল যে, সেলিমকে কোথাও পেলাম না হয়ত বা কোথাও লুকিয়ে আছে, সময়মত বেরিয়ে আসবে। মার মন কোনভাবেই স্থির হচ্ছে না, তাই সেলিমের বাবাকে বলে দেখ, সেলিম সাদা ডোরা কাটা কালো রং এর লুঙ্গি পরে আর সাদা হাফ সার্ট পরে সকালে পাহাড়ে গিয়েছিল। শুনামাত্র সেলিমের বাবা উঠে দৌড়াতে থাকে, কারণ সে এমন এক তরুণের লাশ ৭ জনের মধ্যে দেখেছে, যে সেলিমের বয়সী কিন্তু মুখম-ল বিচ্ছিন্ন, জামার কথা শোনার সাথে সাথে তার মনে পরে যায় এবং গিয়ে দেখে তার মায়ের বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যায় যে মস্তক বিচ্ছিন্ন লাশটি আর কারো নয় সে যে হতভাগা সেলিমের। দৌড়াতে দৌড়াতে গিয়ে হতভাগা মা-ও শনাক্ত করে যে, এটাই তাদের আদরের মানিক হতভাগা সেলিমের নিথর দেহ।

তারপর সকলে মিলে তাদের শান্ত করে ও বাড়ি নিয়ে যায় তারপর সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া, সমবেদনা আর যৎ সামান্য রেশন দিয়েই সকল দায়িত্ব শেষ করে প্রশাসন। নেই কোন জবাবদিহিতা, নেই কোন বিচার প্রক্রিয়া, নেই কোন প্রকার তদন্ত, নেই কেন প্রকার অপূরণীয় ক্ষতির সমাধানের চেষ্টা মাত্র। দীর্ঘ ২৩ বছরেও সরকার বা দায়িত্বশীল কোন কর্তৃপক্ষ ঐ হত্যাকা-ের কোন খোঁজখবর নেয়নি বা নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। এমন স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জনগণ আমরা, যে দেশের সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে দুষ্টের দমনে ব্যর্থ।

সরকার আসে সরকার যায় বদল হয় ক্ষমতার, কিন্তু পার্বত্যবাসীর ভাগ্যোন্নয়ন অসম্ভবই থেকে যায়। পার্বত্য বাঙালিরা যেখানে নিত্যদিন ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, পশ্চাৎপদতা, গুম, অপহরণ, হত্যা ও সকল সুযোগ বঞ্চিত হয়ে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে চলছে। এই পার্বত্য অঞ্চল সমন্ধে কতুটুকু জানেন সুলতানা কামাল, ইফতেখারোজ্জামান, সারা হোসেন ও হাফিজ উদ্দিন মহোদয়গণ? দয়া করে পার্বত্য বাঙালিদের সম্পর্কে ভুল চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিটা উপলব্ধি করুন। নয়তো জাতির কাছে সারাজীবন প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে বৃহত্তর শান্তি প্রিয় রাজনৈতিক দল রয়েছে তাদের সাথে পরামর্শ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে উভয় সম্প্রদায়ের সাথে কথা বলে সত্যটা উপŸব্ধি করুন। আর সেলিমদের মতো হতভাগা স্কুল ছাত্রদের হত্যাকা- সমন্ধে জাতির কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপন করতে সহায়তা করুন।
লেখক : সাবেক ছাত্র নেতা

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven + six =

আরও পড়ুন