পরিবারের শোকের মাতম

কেএনএফের গুলিতে নিহত সেনা সদস্য রফিকুলের দাফন সম্পন্ন

fec-image

বান্দরবানের রুমায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কেএনএফের গুলিতে নিহত সেনাসদস্য রফিকুলের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তিনি করপোরাল পদে কর্মরত ছিলেন।

শুক্রবার (১৯ এপ্রিল) বিকালে রুমা উপজেলার বড়থলি পাড়া আর্মি ক্যাম্পের আওতাধীন পলি প্রাংশা পাড়ার মধ্যবর্তী স্থানের যাত্রীছাউনি এলাকায় গুলিতে নিহত হন তিনি।

একই ঘটনায় আহত হন আরো দুই সেনা সদস্য। শনিবার (২০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় মরদেহ গ্রামের বাড়ি এসে পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। এশার নামাজের পর জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে শুক্রবার রাতে মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ।

এর আগে একই দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে চট্টগ্রাম সিএমএইচ থেকে এই সেনা সদস্যের মরদেহ গ্রামের বাড়ি পৌঁছালে এলাকায় শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ সময় তাঁর আত্মীয় স্বজন ও সহপাঠীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে বাড়ির পাশে মসজিদের মাঠে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জাতীয় ও সামরিক বাহিনীর পতাকায় আচ্ছাদিত সেনা সদস্য রফিকুল ইসলামের কফিনে গান স্যালুট দেন সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল। এ সময় বিও গলে করুণ সূর বেজে ওঠে। জানাজার নামাজ শেষে সহকর্মীরা কাঁধে করে রফিকুলের কফিন কবরস্থানে নিয়ে যান। দাফন শেষে কবরে সেনা বাহিনীর পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

নিহত রফিকুল ইসলাম (৩৭) নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার পরকোট ইউনিয়নের পশ্চিম সোশালিয়া গ্রামের আমজাদ আলী কায়তার বাড়ির মফিজ উদ্দীনের ছেলে। মরদেহ গ্রামের বাড়িতে আনার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয় হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ স্বজনরা।

সন্ধ্যায় রফিকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, কাপড়ে মুখ ঢেকে কাঁদছেন স্ত্রী আমেনা বেগম। পাশেই অপলক দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছে অবুঝ তিন শিশু। রফিকুল ইসলামের তাফহীম, তাহমীদ ও ফারহান নামে তিন ছেলে সন্তান রয়েছে। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন রফিকুল ইসলামের মা হায়াতুন্নেছা। মা কেন কান্না করছে, তা এখনও বোঝার বয়স হয়নি তাফহীম, তাহমীদ ও ফারহানের। বাকরুদ্ধ হয়ে ঘরের মধ্যে বিছানায় শুয়ে কাঁদছেন তাদের দাদি হায়াতুন্নেছা। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা ছিল না তাদের। সবার চোখে পানি ঝরছিল।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, দেশ মাতৃকার টানে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন রফিকুল ইসলাম। শুক্রবার বিকালে রুমা উপজেলার পলি প্রাংশা পাড়ার যাত্রীছাউনি এলাকায় কেএনএফের সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন রফিকুল। তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। শনিবার তার পরিবারের সদস্যরা চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে মরদেহ গ্রহণ করে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসেন।

এশার নামাজের পর জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় নিহতের স্ত্রী আমেনা বেগম বলেন, ‘রোজার আগে সবশেষ বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। শুক্রবার সকালেও কথা হয়েছে। বলেছেন, ডিউটিতে আছেন। রাতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ফোন করে মৃত্যুর খবর জানানো হয়। আজ সকালে আমার শ্বশুর গিয়ে মরদেহ নিয়ে এসেছেন। আমার তিন ছেলে। বড় ছেলে প্রাইমারি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। সবাই অবুঝ শিশু। আমার পরিবারে আর কেউ উপার্জনক্ষম নেই। তিন ছেলেকে নিয়ে আমি এখন কীভাবে চলবো? আমাদের দেখার আর কেউ রইলো না।’ বলে কান্না শুরু করেন আমেনা।

বিলাপ করতে করতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন রফিকুল ইসলামের বোন মফিদা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই নিজের সংসারের পাশাপাশি আমাদেরও খেয়াল রাখতো। আমরা এখন কি নিয়ে বাঁচবো? আমার ভাতিজাদের কে দেখবে? সবকিছু শেষ হয়ে গেলো।’

কাঁদছেন সেনাসদস্য রফিকুল ইসলামের স্ত্রী আমেনা বেগম, পাশে সন্তান ও মা। রফিকুলের আরেক বোন শাহিন আক্তার বলেন, ‘আমার সোনার টুকরো ভাইকে হারিয়ে ফেলেছি। ও ভাই, কেন আমাদের ছেড়ে চলে গেলি। আমাদের এখন কে দেখবে? কে সংসার চালাবে? কে আমাদের বৃদ্ধা মায়ের ওষুধ খরচ দেবে?’

চাটখিল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দীন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে শুক্রবার রাতে আমাকে ফোন করে তার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য নেওয়া হয়েছিল। পরে স্বজনদের কাছ থেকে মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত হয়েছি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার পরিবারের পাশে থাকবে বলে আশা করছি।’

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: নিহত, সেনা সদস্য
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন