“মুখে যতোই অস্ত্র পুণরায় হাতে তুলে নেয়ার হুমকি দিন টানা ২১ বছর প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগকারী সন্তু লারমার পক্ষে এখন আর জঙ্গলে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তার সে বয়সও নেই। সম্ভব নয় শান্তিবাহিনীর এককালের সামরিক প্রধান ও জেএসএসের সহসভাপতি উষাতন তালুকদারের পক্ষেও। টানা ৫ বছর সংসদ সদস্য হিসেবে পার করা উষাতনের ব্যক্তিজীবন এখন জৌলুস ও বৈভবে ভরপুর। একইভাবে স্থানীয় সরকারে পুনর্বাসিত জেএসএসের অন্যান্য নেতাদের পক্ষেও স্বচ্ছল, বিলাসবহুল বা নাগরিক জীবন ত্যাগ করে জঙ্গল জীবনে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তারা জোর করে চাইলেও পরিবারের সমর্থন পাবেন না। শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা সেক্টরে বিপুল বিনিয়োগ ও উন্নয়ন হয়েছে। সরকারি নানা কোটা ও প্রণোদনার কারণে এই সুবিধা নিয়েছে স্থানীয় আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি। এককথায়, জেএসএস ও ইউপিডিএফের শীর্ষ নেতারা ও তাদের স্বজন, পরিজনরা। ফলে তাদের জীবনেও এসেছে স্বাচ্ছন্দ, বিলাস, বৈভব, জৌলুস এবং নিরাপত্তার ধারণা। তাদের পক্ষেও আর বন্দুক নিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ সম্ভব নয়।”

ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র আন্দোলন

fec-image

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইনসার্জেন্সির ইতিহাস, বর্তমান পরিস্থিতির গতি প্রকৃতি গভীরভাবে অভিনিবেশ করে আমার মনে হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইনসার্জেন্সি একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এটি একটি যুগসন্ধিকাল। আমার মতে, সন্তু লারমার নেতৃত্বে শান্তিবাহিনীর মাধ্যমে(পরবর্তীতে চার গ্রুপে) পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ইনসার্জেন্সি বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল তার একটি যুগ পরিবর্তনের সম্মুখীন। এর পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। তবে বড় যে তিনটি কারণ রয়েছে তা হলো- শান্তিচুক্তি, আদর্শিক বিচ্যুতি ও প্রচারে আধিপত্য হারানো।

হঠাৎ করেই পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। একের পর এক খুন, অপহরণের ঘটনা ঘটছে। গত ৫ মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক রাজনৈতিক কারণে ৩২জন খুন হয়েছে। এ ছাড়াও অজ্ঞাত বা অসনাক্ত কারণে আরো ২৩জন খুন হয়েছে। আঞ্চলিক রাজনৈতিক কারণে খুন হওয়া ৩২জনের মধ্যে উপজাতি কর্তৃক উপজাতি খুন হয়েছে ২৩জন, বাঙালি কর্তৃক বাঙালি খুন হয়েছে ৩জন এবং উপজাতি কর্তৃক বাঙালি খুন হয়েছে ৬জন।

একই সময়ে অপহৃত হয়েছে ১০জন। যাদের মধ্যে ৮জন উপজাতি কর্তৃক উপজাতি ও ২জন উপজাতি কর্তৃক বাঙালি অপহৃত হয়েছে। একই সময়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি রাজনৈতিক সংঘর্ষে ১জন খুন হয়েছে।

শুধু গত মে মাসেই আঞ্চলিক রাজনৈতিক কারণে ৯জন খুন হয়েছেএ এর মধ্যে উপজাতি কর্তৃক উপজাতি ৮জন এবং বাঙালি কর্তৃক বাঙালি ১জন। একই সময়ে অজ্ঞাত কারণে আরো ৮জন খুন হয়েছে। মে মাসে ৩জন অপহৃত হয়েছে। এদের মধ্যে উপজাতি কর্তৃক উপজাতি ২জন এবং উপজাতি কর্তৃক বাঙালি ১জন।

লক্ষ্যণীয় যে, তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে বান্দরবান অপেক্ষাকৃত শান্ত ও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক যে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে তার বেশিরভাগই ঘটেছে বান্দরবানে। প্রশ্ন উঠতে পারে, সম্প্রীতির বান্দরবান হঠাৎ করে কেন সহিংস হয়ে উঠলো?

আপাতদৃষ্টিতে এ ঘটনাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বলেই মনে হয়। কিন্তু বাস্তব হিসাব এমন সরল রৈখিক নয়। এই ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি’ বা খুন অপহরণ বৃদ্ধির পেছনে নানা কারণ রয়েছে। অনুসন্ধান করে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর সামরিক শাখাগুলো বিগত এক দশকের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে।

গত ১৮ মার্চ ৫ম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে নয়মাইল নামক স্থানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের এম্বুশে পড়ে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের গাড়িগুলো। সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে ঘটনাস্থলেই ৭ জন নিহত ও ১৯জন আহত হয়।

এ ঘটনায় সারাদেশে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। উপর মহলের চাপে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক চিরুণী অভিযান শুরু করে। এতে টিকতে না পেরে সন্ত্রাসীদের একটি বড় অংশ সীমানা পাড়ি দিয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

এ ঘটনা এবং পূর্বের আরো কিছু ঘটনা বিশেষ করে নানিয়ারচরের চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা এবং ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের সভাপতি তপনজ্যোতি ওরফে বর্মা নিহত হওয়ার ঘটনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ ও জেএএসের এবং তাদের সামরিক শাখার অধিকাংশ নেতাকর্মীর নামে মামলা হওয়ায় অভিযুক্ত নেতারা পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছে।

ইউপিডিএফের অন্যতম শীর্ষ নেতা আনন্দ প্রকাশ চাকমা গ্রেফতার হয়েছে। মাইকেল চাকমা নিখোঁজ। শান্তিচুক্তিকারী দল হিসেবে এতোদিন জেএসএস(সন্তু) তাদের বহু অপকর্মে সরকারি ছাড় পেলেও বর্তমানে পাচ্ছে না। বান্দরবানে জেএসএসের শীর্ষ নেতারা গ্রেফতার হয়েছে।

জেএসএস সূত্রের দাবি, ২০১৯ সালে এ পর্যন্ত ৪টি মামলায় জেএসএসের ১০০ জন নেতা-কর্মী-সমর্থকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০১৮ সালে ৫টি মামলায় ১১৭ জনকে জড়ানো হয়েছে এবং ৭৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০১৭ সালে ১৬১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং কমপক্ষে ১৪১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

নভেম্বর ২০১৭ থেকে মার্চ ২০১৮ পর্যন্ত সময়ে রাঙামাটি জেলাধীন জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি ও রাঙামাটি সদর উপজেলায় ১০টি মামলায় ১৮৭ জনকে আসামী করা হয়েছে। ২০১৬ সালে বান্দরবনে ৭জন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিসহ ১৫০ জন জেএসএস কর্মী ও তাদের সমর্থকদের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তাদের মধ্যে ৪০জনকে গ্রেফতার করা হয়।

এদিকে ২৬ জুলাই ২০১৮ তারিখে বাঘাইছড়ি উপজেলার রূপকারী ইউনিয়নের দাঙ্গাছড়া, রাইন্নাছড়া ও বেতাগী ছড়ায় সশস্ত্র তিন গ্রুপ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে বন্ধুক যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ঘন্টাব্যাপী চলা এ যুদ্ধে বন কুসুম চাকমা নামের এক ব্যক্তি গুলিতে নিহত হয়। আর এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে বন কুসুম চাকমার ভাইয়ের ছেলে নিয়ন বাদী হয়ে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের প্রধান প্রসীতসহ ইউপিডিএফের ৪৪ জন শীর্ষ নেতাকে অভিযুক্ত করে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে। এসব কারণে বিপুল পরিমাণ নেতাকর্মী এলাকা ত্যাগ করে।

এদিকে গত ৩ মে ২০১৮ তারিখে নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা হত্যা মামলায় ৯ মে ইউপিডিএফের ৪৬জন শীর্ষনেতাকে আসামি করে মামলা দায়ের করে শক্তিমান চাকমার সহকারী রূপম দেওয়ান। ৪ মে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নেতা তপন জ্যোতি বর্মাসহ ৫ হত্যা মামলায় ইউপিডিএফ মূলের ৭২জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করে সংগঠনের নেতা অর্চিন চাকমা।

এই ৬ হত্যা মামলায় মোট ১১৮জনকে আসামি করা হয়। তারা সকলেই ইউপিডিএফের শীর্ষ নেতা। এদিকে ১৮ মার্চ ২০১৯ নির্বাচনী কর্মকর্তাদের উপর হামলার ঘটনায় ২০ মার্চ অজ্ঞাতনামা ৪০-৫০জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় ধরা পড়ার ভয়ে জেএসএসইউপিডিএফের প্রায় সকল নেতাকর্মীই এলাকা ছাড়া ও পলাতক। ফলে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম ভেঙে পড়ার উপক্রম।

বাঘাইছড়িতে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের উপর হামলার পর বিভাগীয় তদন্তে জেএসএস সন্তু গ্রুপের নাম আসায় ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল এসএম মতিউর রহমান প্রকাশ্যেই বলেছেন, তিনি মনে করেন, এ হামলার মাধ্যমে জেএসএস শান্তিচুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে। তার এ বক্তব্য এতোটাই স্পষ্ট ও দৃঢ় ছিলো যে, জেএসএস ও শান্তিবাহিনী পরিষ্কার একটি বার্তা পেয়েছে যে, অপকর্ম করলে এবার তাদের ছাড়া হবে না। বাস্তবেও তাই ই হয়েছে।

বান্দরবানে জেএএসের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এটা পরিস্কার হয়েছে। রাঙামাটিতেও পর্দার অন্তরালে অনেক ঘটনা ঘটেছে যা হয়তো মিডিয়াতে আসেনি। জেএসএস’র শীর্ষ নেতা সন্তু লারমার দীর্ঘদিনের সহকারী বরুণ চাকমা নিখোঁজ। সন্তু লারমাউষাতন তালুকদার বাদ দিয়ে জেএসএসের সামরিক শাখার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সকল নেতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এতে তারা সকলেই পলাতক রয়েছে। ফলে কোণঠাসা জেএসএস শক্তি ও আধিপত্য হারিয়ে নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে রাজস্থলী-কাপ্তাই হয়ে বান্দরবানের দিকে সরে যেতে থাকে। এর কারণও আছে। (কারণটি পরবর্তীতে আলোচনা করা হয়েছে।) জেএসএস সন্ত্রাসীদের এই স্থানাস্তর স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় আধিপত্যবাদী গ্রুপের সাথে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করে, ফলে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইনসার্জেন্সির ইতিহাস, বর্তমান পরিস্থিতির গতি প্রকৃতি গভীরভাবে অভিনিবেশ করে আমার মনে হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইনসার্জেন্সি একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এটি একটি যুগসন্ধিকাল। এর পেছনে নানাবিধ কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি হঠাৎ করেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।

আমার মতে, সন্তু লারমার নেতৃত্বে শান্তিবাহিনীর মাধ্যমে(পরবর্তীতে চার গ্রুপে) পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ইনসার্জেন্সি বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল তার একটি যুগ পরিবর্তনের সম্মুখীন। এর পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। তবে বড় যে তিনটি কারণ রয়েছে তা হলো- শান্তিচুক্তি, আদর্শিক বিচ্যুতি ও প্রচারে আধিপত্য হারানো।

শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিবাহিনীর ১৯৪৬জন সদস্য অস্ত্র সমর্পন করে প্রকাশ্য জীবনে বেরিয়ে আসে। এছাড়াও এ চুক্তির পর শান্তিবাহিনী ও জেএসএসের বিপুল পরিমাণ সদস্য অনুকূল পরিবেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে স্বাভাবিক জীবন শুরু করে। সরকারি নানা প্রণোদনার ফলে শিক্ষা, চাকুরি, ব্যবসা বাণিজ্যসহ নানা খাতে সহজেই তারা ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তারা অনেকেই এখন স্বচ্ছল বা বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

মুখে যতোই অস্ত্র পুণরায় হাতে তুলে নেয়ার হুমকি দিন টানা ২১ বছর প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগকারী সন্তু লারমার পক্ষে এখন আর জঙ্গলে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তার সে বয়সও নেই। সম্ভব নয় শান্তিবাহিনীর এককালের সামরিক প্রধান ও জেএসএসের সহসভাপতি উষাতন তালুকদারের পক্ষেও। টানা ৫ বছর সংসদ সদস্য হিসেবে পার করা উষাতনের ব্যক্তিজীবন এখন জৌলুস ও বৈভবে ভরপুর।

একইভাবে স্থানীয় সরকারে পুনর্বাসিত জেএসএসের অন্যান্য নেতাদের পক্ষেও স্বচ্ছল, বিলাসবহুল বা নাগরিক জীবন ত্যাগ করে জঙ্গল জীবনে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তারা জোর করে চাইলেও পরিবারের সমর্থন পাবেন না। শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা সেক্টরে বিপুল বিনিয়োগ ও উন্নয়ন হয়েছে। সরকারি নানা কোটা ও প্রণোদনার কারণে এই সুবিধা নিয়েছে স্থানীয় আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি।

এককথায়, জেএসএসইউপিডিএফের শীর্ষ নেতারা ও তাদের স্বজন, পরিজনরা। ফলে তাদের জীবনেও এসেছে স্বাচ্ছন্দ, বিলাস, বৈভব, জৌলুস এবং নিরাপত্তার ধারণা। তাদের পক্ষেও আর বন্দুক নিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ সম্ভব নয়।

এখানে কেউবা মুখে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্ত্বশাসনের কথা বলেছে, দাবিদাওয়া, অধিকার আদায়ের আন্দোলন করেছে; আবার কেউবা শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য হুমকি দিচ্ছে- কিন্তু এগুলো সবই গ্যালারি শো। মূল মঞ্চে সরকারকে চাপে রেখে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রাখা, নানা সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করে স্বচ্ছল জীবনযাপনই হচ্ছে আসল খেলা। মুখে আদর্শের গাল ভরা বুলি ও উত্তেজনাকর বক্তব্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ধরে রাখলেও তাদের নিজেদের জন্য, নিজেদের পরিবারের সদস্যদের জন্য তারা ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছে।

আঞ্চলিক নেতারা পাহাড়ের অশিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত ও অনগ্রসর সমাজের তরুণ, যুবকদের আদর্শিক নানা মোটিভেশনের মাধ্যমে অস্ত্র হাতে তুলে দিয়ে জঙ্গলে পাঠালেও নিজের সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে কোটা, বৃত্তির সুযোগ গ্রহণ করিয়ে দেশ-বিদেশের নামিদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পাঠিয়েছে। সরকারি, বেসরকারি, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, এনজিও ও দূতাবাসের, বিদেশি চাকরিতে সংযুক্ত করেছে। মঞ্চে যাই বলুন, শিক্ষিত সেই প্রজন্মের পক্ষে এখন আর সশস্ত্র বিপ্লব সম্ভব নয়।

এদিকে আদর্শিক মোটিভেশন দিয়ে জঙ্গলে পাঠানো সাধারণ, অশিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিত যুবকেরা জুম্মল্যান্ড গঠনের স্বপ্ন নিয়ে অনিশ্চিত জীবনের পথে পা বাড়ালেও দিন শেষে তারা নিজেদের এক একজন চাঁদাবাজ হিসেবেই দেখেছে। বলা হয়ে থাকে, উঠতি বয়সে কোমরে একটি অবৈধ পিস্তল গোঁজা থাকলে তার গরম সহ্য করা কঠিন। সেখানে এদের কাছে মার্ক ফোর, জি থ্রি, একে ফোরটি সেভেনের মতো মারাত্মক যুদ্ধাস্ত্র।

প্রচলিত সিস্টেম মোতাবেক বিনা পরিশ্রমে বিপুল পরিমাণ চাঁদা আসছে। না দিতে চাইলে ‘আমি ভেতর পার্টির লোক বলছি’ বলে একটি টেলিফোন করলেই পায়ের কাছে এসে পড়ছে লোকে, কারণ এর পরিণতি সকলে জানে। বেয়াড়া কেউ একটু বেশি বেগরবাই করলে খুন, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতনের পথ তো রয়েছেই। এতে এক ঢিলে বহু পাখি মরছে। মানুষ ভয় পাচ্ছে, নমস্কার জানাচ্ছে, মাথা নত করছে- এ এক অন্যরকম রোমাঞ্চকর জীবন। এ ফাঁদে পা দিয়েছে অনেক তরুণ, যুবক।

তাদের  আদায়কৃত চাঁদা দলীয় সিস্টেমে চলে যাচ্ছে পার্টির কেন্দ্রীয় নেতাদের তহবিলে। কেন্দ্রীয় নেতারা আদায়কারীদের জন্য নির্ধারিত হারে সামান্য ভাতা, পরিবারের জন্য কিছুটা পারিতোষিক দিলেও বেশিরভাগ টাকারই কোনো হিসাব থাকে না। সেই হিসাব চাওয়ার সুযোগ ও সাহসও তাদের নেই। হিসাব চাইলে বা দ্বিমত করলে করুণ পরিণতির অনেক উদাহরণ তাদের সামনে থাকে।

কিন্তু চোখের সামনে তারা দেখেছে, তাদের জঙ্গল জীবনের কষ্টের টাকায় নেতৃবৃন্দ ও তাদের পরিবারের স্বচ্ছল ও জৌলুসপূর্ণ জীবন, সুখ ও সাচ্ছন্দ। ফলে তারাও একটা সময় আদায়কৃত চাঁদার বড় অংক সরিয়ে ফেলে নিজেদের সন্তানদের নিজেদের অনিশ্চিত পথে না টেনে দেশে বিদেশে বড় শহরে রেখে পড়াশুনা করিয়েছে।

সেইসব সন্তানরা শিক্ষিত হয়ে সরকারি, বেসরকারিপ্রতিষ্ঠানে চাকরি বা ব্যবসা বাণিজ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করে বাবা/ভাইদের জঙ্গলের অনিশ্চিত জীবন পরিত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চাপ দিচ্ছে। এতে অনেকে ফিরে এসেছে আবার কেউবা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।

২০১৮ সালের ৬ ডিসেম্বর খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের বিচার ও সাংগঠনিক শাখার পরিচালক আনন্দ চাকমার আত্মসমর্পন এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আনন্দ চাকমা সুদীর্ঘ ৩৪ বছর শান্তিবাহিনী, জেএসএসইউপিডিএফের হয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনযাপন করেছেন। আত্মসমর্পণকালে তিনি খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন কীভাবে তাদের কষ্টের টাকায় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বিলাসবহুল জীবনযাপন করে তাদের বঞ্চিত করে।

আনন্দ চাকমার এক ছেলে সরকারি চাকুরিতে, অপর মেয়ে বি.এ পড়ছে। মেয়েটি শিক্ষাজীবন শেষে একটা ভাল চাকরি চায়। তারা চায়না তাদের পিতা আর জঙ্গলের অনিশ্চিত জীবনে পড়ে থাকুক। তাই তিনি নিজ অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। এরকম আনন্দ চাকমার সংখ্যা পাহাড়ে অসংখ্য। তারাও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়। কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন থেকে ফিরে আসার রাস্তা সহজ নয় মোটেই। অতীতে এই রাস্তায় হাঁটার চেষ্টারত নিজ দলের বহু কর্মীকে প্রাণ দিয়ে খেসারত দিতে হয়েছে। তাই চাইলেও অনেকেই পারছেন না স্বাভাবিক সেই জীবনে ফিরে আসতে।

আবার অনেকে আঞ্চলিক দলের সম্পর্ক ত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে দেশে নিরাপদে থাকতে পারবেন না জেনে সহায় সম্পদ বিক্রি করে ভারত-মিয়ানমারে পালিয়ে গেছেন। অনুসন্ধান করলে গত দুই বছরে পাহাড়ে এ ধরণের অনেক ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যাবে। এভাবে আরো অনেকের পাহাড় ত্যাগ করে বিদেশে বা সমতলে পাড়ি জমানোর চেষ্টা দৃশ্যমান রয়েছে। আর এভাবেই পাহাড়ে ইনসার্জেন্সির একটি যুগ আজ সন্ধিকালে উপনীত হয়েছে।

এই সন্ধিকালে উপনীত হওয়ার পেছনে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। শান্তিচুক্তির পর তাদের সশস্ত্র সংগ্রামের মাত্রা কমে গেলে পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলো তাদের লক্ষ্য অর্জনে বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম, আন্তর্জাতিক ও জাতীয়ভাবে জনমত গঠনেপ্রচার সেলকে শক্তিশালী করে। একই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হিংসাত্মক ও ঘৃণাত্মক প্রচার চালিয়ে, জুম্মল্যান্ডের অলীক স্বপ্নে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ও মতলববাজদের ষড়যন্ত্র একীভূত করে পাহাড়ের সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিকে আড়াল করে অধিকার আদায়ের এক নতুন ও শক্তিশালী প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন তারা। কিন্তু এ বিষয়টি লুকোনো থাকেনি বেশিদিন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশপ্রেমিক জনগণের চোখে খুব সহজেই ধরা পড়ে যায় সফট টেরোরিজমের আড়ালে লুকানো বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্র।

ফলে গত ৬/৭ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে বেশ কিছু গণমাধ্যম তৈরি হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তারা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। এতে করে নতুন এসকল গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকর্মীরা সফলভাবে সভ্য ও সুশীলের ভেক ধরা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকারী ও তাদের সমর্থকদের মুখোশ দেশ ও বিদেশের সামনে উন্মোচিত করেছে।

ফলে এক্ষেত্রেও তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে প্রবলভাবে। এতে করে নতুন প্রজন্মের পাহাড়ি তরুণ/যুবকদের অনেকেই আর ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াতে রাজি নয়। আর এভাবেই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের একটি অধ্যায় ক্রান্তিকালে উপনীত হয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শেষ হয়ে যাচ্ছে? আমি তা মনে করি না। আমার মনে হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র আন্দোলনের একটি অধ্যায় সমাপ্তির প্রান্তে উপনীত। এখান থেকে এই আন্দোলনের নতুন ধাপ বা নতুন অধ্যায় বা নতুন বাঁকে মোড় নেবার সম্ভাবনা প্রবল। এর ভাল বা মন্দ দুইদিকই থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়,

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান ইনসার্জেন্সি যদি বর্তমান রূপে বহাল থাকেও তবে তা নতুন রূপে বা নতুন বাঁকে আবির্ভূত হবে। যেমন, ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর খাগড়াছড়ি সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাড়ি বহরে হামলা করে ইউপিডিএফ সমর্থকেরা। এরপর পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনী ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে চরম কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। বিভিন্ন মামলায় একের পর এক গ্রেফতার হতে থাকে ইউপিডিএফ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় দলটি র‌্যালি, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের মতো নির্দোষ কর্মসূচি নিয়েও মাঠে টিকে থাকার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।  প্রশাসনের কঠোর অবস্থানে দলটি কোণঠাসা হতে হতে অস্তিত্বের সঙ্কটে উপনীত হয়। শেষ পর্যন্ত নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় চরম শত্রু জেএসএস সন্তু গ্রুপের সাথে অঘোষিত সমঝোতা করে দলটি টিকে যায় এবং জেএসএস মূল ও ইউপিডিএফ মূল নতুন ও বৃহত্তম চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর সম্মুখে আবির্ভূত হয়।

একই পূর্বালোচিত কারণগুলোর ফলে চরমভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এখন টিকে থাকার প্রয়োজনে নতুন মিত্র ও নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে সংগ্রামরত। তবে কেন্দ্রে টানা আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা ও তাদের সাথে ভারতের উষ্ণ সম্পর্ক থাকায় ভারত থেকে হাত খোলা সহায়তা পাওয়ার আপাতত সম্ভাবনা নেই। সেক্ষেত্রে তাদের নতুন বা সম্ভাব্য মিত্র হতে পারে মিয়ানমার।

বিশেষ করে জেএসএসের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর বান্দরবানের দিকে অগ্রসর হওয়া সেই ইঙ্গিতই বহন করে। বাংলাদেশ মিয়ানমার সম্পর্কের কূটচালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গ্রুপগুলোর সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্ক নতুন মাত্রায় উপনীত হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

এমনিতেই গত কয়েক বছরে এ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো মিয়ানমারের বিভিন্ন শক্তির কাছ থেকে অস্ত্র, প্রশিক্ষণসহ নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আসছে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে শত শত পাহাড়ি যুবক ইতোমধ্যে মিয়ানমারে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে।

পার্বত্যনিউজে এ নিয়ে বেশকিছু রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। কাজেই বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের জটিলতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গ্রুপগুলো যদি মিয়ানমারভিত্তিক জোরালো পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে নতুন রূপে আবির্ভূত হয় তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বিশেষ করে আরাকান আর্মির হাতে প্রবল মার খাওয়া মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর কাউন্টার কর্মসূচিনেয়ার সম্ভাবনা নাকচ করা যায় না।

এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম সন্নিহিত কক্সবাজারভিত্তিক রোহিঙ্গা সমস্যা, বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রীক আন্তর্জাতিক রাজনীতির সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইনসার্জেন্সি একীভূত হয়ে নতুন রূপ পরিগ্রহ হবার ঝুঁকিও রয়েছে।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আপাত নিয়ন্ত্রিত ইনসার্জেন্ট গ্রুপ জেএসএস সংস্কার ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকও যে ভবিষ্যতে কোনো হুমকি হবে না এ নিশ্চিয়তা দেয়াও কঠিন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিএনপি শাসনমালে সন্তু লারমার প্রধান অভিযোগ ছিলো, জেএসএসকে ধংস করতেবিএনপি সরকার ইউপিডিএফকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে।

কিন্তু পরবর্তীকালে সেই ইউপিডিএফই পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তার জন্য প্রধান ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গত ২৭ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে জেএসএস সংস্কার নেতা সুদর্শন চাকমার বক্তব্য উপস্থিত অনেককেই চমকিত ও শঙ্কিত করেছে।

আবার এমন সম্ভাবনাও রয়েছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইনসার্জেন্সি আর আগের মতো চ্যালেঞ্জিং ফ্যাক্টর হয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারলো না। কিন্তু তাতেও এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে না। কেননা, সেক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রীক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেবে এবং শক্তিশালী করবে।

এক্ষেত্রে আদিবাসী স্বীকৃতি ইস্যু, ১৯০০ সালের শাসনবিধি বাস্তবায়ন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈশিষ্ট্য রক্ষার নামে নানা আইনগত সুবিধা ও সুরক্ষা আদায়, বাঙালিদের সমতলে প্রত্যাবাসন, উপজাতীয় শরণার্থীদের নতুন তালিকা বাস্তবায়ন, সেনা প্রত্যাহার, ভূমি অধিকার কুক্ষিগত করা ইত্যাদি হতে পারে জনপ্রিয় দাবি।

করণীয়

১. বর্তমান সশস্ত্র গ্রুপগুলো যাতে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে সেদিকে কঠোর নজরদারী রাখতে হবে সর্বাগ্রে। এ ক্ষেত্রে যেকোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে শৈথিল্য দেখানো চলবে না।

২. বর্তমান সশস্ত্র গ্রুপগুলো যাতে নতুন মিত্রের পৃষ্টপোষকতা না পেতে পারে সে বিষয়ে কঠোর নজরদারী ও কূটনীতি বহাল রাখা।

৩. নিয়ন্ত্রিত সশস্ত্র গ্রুপগুলো যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে না পারে তার উপর নজরদারী রাখা।

৪. শান্তিচুক্তির অবাস্তবায়িত ধারাগুলো বাস্তবায়নের জটিলতা নিরসনকল্পে শান্তিচুক্তি আপডেট করতঃ পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করা।

৫. শুধুমাত্র জেএসএসের(সন্তু) সাথে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির সীমাবদ্ধতা কাটাতে শান্তিচুক্তির বাইরে থাকা উপজাতীয় সশস্ত্র ও সামাজিক সংগঠনগুলো, বাঙালি সম্প্রদায় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে আলোচনা করতঃ সকল পক্ষের যৌক্তিক ও সংবিধান সম্মত দাবিগুলো সংযোজিত করে শান্তিচুক্তি যুগোপোযোগী করে দ্রুত বাস্তবায়ন করা।

৬. বাংলাদেশ সরকারের উচিত অতিদ্রুত পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিদ্রোহীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা। বিশেষ করে যেসকল সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মীরা অন্ধকার জীবন ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চায় তাদের শান্তিচুক্তিতে উল্লিখিত পুনর্বাসন প্যাকেজের আওতায় তাদের পুনর্বাসন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ দেয়া।

এ বিষয়ে গত ২ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে পার্বত্যনিউজ অনলাইনে প্রকাশিত ‘শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে তার যুগোপোযোগীকরণ অত্যন্ত জরুরী’ শীর্ষক লেখা এবং ২৯ এপ্রিল ২০১৯ সালে প্রকাশিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা কৌশলের পুনর্বিন্যাস জরুরী ‘ শীর্ষক আমার লেখা দুটি পড়ে দেখা যেতে পারে।

৭. পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলো  যেন গণমাধ্যম, সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আন্তর্জাতিক মাধ্যমে হিংসাত্মক, ঘৃণাত্মক, ধংসাত্মক, বাংলাদেশ বিরোধী প্রচার চালাতে সংগঠিত হতে না পারে এবং এ ধরনের প্রচার চালিয়ে জনসমর্থন, নৈতিক সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা আদায় না করতে পারে সে ব্যাপারে নজরদারী ও বিকল্প ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

৮. আদিবাসী ইস্যু ও ১৯০০ সালের শাসনবিধি নিয়ে আইনগত কিছু জটিলতা বর্তমানে। দ্রুত তা নিরসন করা।

৯. পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও ধর্মান্তরকরণের কাজে জড়িত এনজিও, বিদেশী সংস্থার কার্যক্রম ও তাদের মনিটাইজেশন নিয়ন্ত্রণ করা।

১০. পার্বত্য চট্টগ্রামের জনতাত্ত্বিক উন্নয়নে বৈষম্য নিরসন করা।

 

লেখক: সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ ও  চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন।


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ইউপিডিএফ, জেএসএস, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদ
Facebook Comment

One Reply to “ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র আন্দোলন”

  1. তথ্য ভিত্তিক এবং নিখুঁত বিশ্লেষণ । ধন্যবাদ লেখককে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × one =

আরও পড়ুন