গুচ্ছগ্রামে মানবেতর জীবন

সম্ভাবনার পাহাড়- ২

গুচ্ছগ্রাম

জাহিদুল ইসলাম, পার্বত্য অঞ্চল থেকে ফিরে:
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার চেংড়াছড়ি গুচ্ছগ্রাম। ১৯৮২ সালে এখানে বসতি স্থাপন করে ৭৩ পরিবার। এ গুচ্ছগ্রামে এখন বাস করছে প্রায় ৪০০ পরিবার। ছোট একটি ঘরে বাস করছে ৪ থেকে ৫ সদস্যের একটি পরিবার। ঘরের একটি অংশ ছেড়ে দেয়া হয়েছে গরু ও ছাগলের জন্য। গৃহপালিত পশুর সঙ্গে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন সেখানকার কয়েক লাখ মানুষ।

সূত্র জানায়, চেংড়াছড়ি গুচ্ছগ্রামের ওই ৭৩ পরিবারকে ২৫ শতক করে ভিটাজমি এবং পৌনে ৪ একর করে চাষের জমি দিয়েছিল এরশাদ সরকার। তবে জমিতে চাষের জন্য যেতে পারেনি অনেক বাঙালি পরিবার। এছাড়া কোনো কোনো গুচ্ছগ্রামের বসতভিটাও উচ্ছেদ করা হয়। উচ্ছেদ হওয়া এসব পরিবার চেংড়াছড়িতে পুনর্বাসন করা হয়।

সেখানে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, অপুষ্টির শিকার শিশুদের ছড়াছড়ি। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে শিশু-কিশোরদের শারিরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। পঞ্চশোর্ধ্ব বয়স্কদের চেহারায় বৃদ্ধের ছাপ। সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভুগছেন বৃদ্ধরা। এখানে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবাও প্রায় বিরল। শিক্ষার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। তাছাড়া দারিদ্র্যের শিকার শিশুদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগও প্রায় বিরল।

অন্যমিডিয়া

সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১১ সালের আদমশুমারি ও গৃহ গণনার তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় মোট জনসংখ্যা ১৫ লাখ ৯৮ হাজারের বেশি। এখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৭ শতাংশ বাঙালি। ১৩টি ক্ষুদ্র নৃজাতিগোষ্ঠী মিলে পার্বত্য এলাকার ৫৩ শতাংশ মানুষ উপজাতি।

তিন জেলার মোট অধিবাসীর ২৬ শতাংশই চাকমা। প্রায় শতভাগ শিক্ষার হারের সুবাদে উপজাতীয়দের জন্য সরকারি চাকরিতে ৫ শতাংশ কোটার বড় অংশই পাচ্ছে চাকমারা। এর বাইরে মারমাত্রিপুরা জনগোষ্ঠী পার্বত্য এলাকায় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বেশ প্রভাবশালী।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ব্যবসা-বাণিজ্য উপলক্ষে পার্বত্য এলাকায় অনেক আগে থেকেই বেশকিছু বাঙালির একটি অংশের যাতায়াত ছিল। সময়ের ব্যবধানে তারা এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। দফায় দফায় চাঁদাবাজি, অপহরণ ও হত্যার হুমকি সত্ত্বেও অর্থনৈতিকভাবে বাঙালিদের এ অংশটিও তুলনামূলক ভালো আছে।

তবে সরকারের সিদ্ধান্তে ১৯৮২ সাল থেকে পাহাড়ে পুনর্বাসিত হওয়া বাঙালিরা আর্থসামাজিক বিবেচনায় খুবই শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে। চাষাবাদের জন্য পৌনে ৪ একর করে জমি বরাদ্দ দিয়ে এসব পরিবারকে পাহাড়ে নেয়া হয়েছিল। সন্ত্রাসীদের ক্রমাগত হুমকি, হামলা, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় গুচ্ছগ্রামে তুচ্ছ জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে এসব পরিবার।

উপজাতি বাঙালী

সর্বশেষ খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে খাগড়াছড়িতে এ হার ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ। অপর পার্বত্য জেলা বান্দরবানে এখনও দারিদ্র্যের হার ৪১ দশমিক ১ শতাংশ। অবশ্য রাঙ্গামাটিতে এ হার ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ।

জাতিসংঘের উন্নয়ন সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) বাস্তবায়নে ২০১৪ সালে তৈরি করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৪৩ জন। পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে এ হার ৪৯ জন এবং বান্দরবানে ৬৩ জন। শুধু রাঙ্গামাটি জেলায় জাতীয় পর্যায়ের চেয়ে কম শিশু মৃত্যুবরণ করছে।

প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সারা দেশে দক্ষ ধাত্রীর তত্ত্বাবধানে জন্মের হার ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ। খাগড়াছড়ি ৯ দশমিক ১ শতাংশ, রাঙ্গামাটি ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বান্দরবানে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ প্রসূতি দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সেবা পাচ্ছে।

সারা দেশ ৮৫ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি ব্যবহারের সুযোগ পেলেও খাগড়াছড়ি জেলায় এর হার ৫৬ শতাংশ। বান্দরবানের ৪৬ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং রাঙ্গামাটিতে ৪৫ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি ব্যবহার করতে পারছে।

সারা দেশের বিবেচনায় স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাষণ ব্যবস্থার সূচকেও পিছিয়ে পার্বত্য অঞ্চল। খাগড়াছড়ি জেলার ৫৬ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার সুযোগ পাচ্ছেন। রাঙ্গামাটিতে এর হার ৩২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। পার্বত্য জেলাগুলোর মধ্যে একমাত্র বান্দরবানে জাতীয় হারের সমান শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ নিরাপদ স্যানিটেশন সুযোগ পাচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. শামসুল আলম এ বিষয়ে বলেন, পশ্চাৎপদ এলাকা হিসেবে দেশের অনেক অঞ্চলেই এখনও চরম দারিদ্র্য রয়েছে। যোগাযোগ অবকাঠামো ও সামাজিক সচেতনতার অভাবে এখনও পার্বত্য অঞ্চলের অনেক মানুষ সরকারের মৌলিক সেবাগুলোর বাইরে রয়েছে।

তিনি বলেন, সব এলাকার সব মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও পশ্চৎপদ এলাকায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এসব এলাকার যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

চেংড়াছড়ি গুচ্ছগ্রামে বাস করেন মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল ইসলাম। তার নেতৃত্বে এরশাদের আমলে বৃহত্তর রংপুর থেকে ২৭২টি পরিবার পার্বত্য খাগড়াছড়িতে পুনর্বাসন হয়েছিল। বর্তমানে একই পরিমাণ ভূমিতে কয়েক গুণ বেশি পরিবারের বাস। তিনি বলেন, সমতলে সরকারের অনেক কার্যক্রম সফল হয়েছে। সমতল ও পাহাড়ে আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়েছে। সরকার পাহাড়ে নতজানু অবস্থান নিয়েছে।

তিনি বলেন, পাহাড়ে বাঙালিরা ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। গণতন্ত্র নেই, পদে পদে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কারণে বাঙালিরা বরাদ্দ পাওয়া জমিতে যেতে পারছে না। ভিটা থেকে উচ্ছেদ করার কারণে অনেক পরিবার একসঙ্গে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এসব পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক সেবা নিয়েও কথা বলার কেউ নেই।

সূত্র- আলোকিত বাংলাদেশ

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen + 20 =

আরও পড়ুন