শরণার্থী ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের হামলায় ৩ রোহিঙ্গা মাঝি আহত

fec-image

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিনিয়ত মারামারি, খুন, অপহরণ, গুম, ঘটনা বাড়ছে। বুধবার গভীর রাতে কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের হেডমাঝি মোঃ আমিন (৪৫), মোঃ জাফর (৩৫), জাকারিয়া (৩৮) কে সন্ত্রাসীরা দা, লাঠি, সোঠা দিয়ে কুপিয়ে মারাত্মক আহত করেছে। তাদের রোহিঙ্গারা উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছে বলে জানা গেছে।

আনরেজিষ্ট্রার্ট ক্যাম্পের চেয়ারম্যান মোঃ নুর জানান, তারা রোহিঙ্গাদের সুন্দর ভাবে বসবাস, চলাফেরা করার কথা বললেও সন্ত্রাসীদের কারণে তারা তা পারছেনা। সন্ত্রাসীরা রাত হলে ক্যাম্প জুড়ে জোর করে চাঁদা আদায়, অপহরণ, গুম, খুন ইত্যাদি করে থাকে। যার জন্য রোহিঙ্গা ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সভাপতির পদ থেকে তিনি অব্যাহতি নিবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। ২০১৭ সালের আগষ্ট মাসের পর থেকে উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া ৩০ টি ক্যাম্পে ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।

সর্বশেষ বালুখালী হেডমাঝি আরিফুলাহকে গলাকেটে হত্যা করেছে উগ্রপন্থী রোহিঙ্গারা। এ নিয়ে গেল ২ বছরে উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্প গুলোতে ৪৩টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আধিপাত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতার জের, অভ্যন্তরীণ কোন্দলসহ প্রত্যাবাসনের পক্ষে-বিপক্ষে অবলম্বনকে কেন্দ্র করে উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলছে মারামারি, হানাহানিসহ ছুরিকাঘাতের মতো লোমহর্ষক ঘটনা। সম্প্রতি উখিয়ার বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে প্রায় ৪৩ রোহিঙ্গা খুন হয়েছেন রোহিঙ্গাদের হাতে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে রাত যাপন করছে সাধারণ রোহিঙ্গারা।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সম্পাদক ও রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, রোহিঙ্গারা হিংসাত্মক মনোভাব নিয়ে ত্বরিত সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে খুন-খারাবি করতে কোনোরূপ বিলম্ব করে না। রোহিঙ্গাদের এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব পড়ছে স্থানীয়দের মাঝে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের সরকারিভাবে প্রশাসনের লোকজন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এনজিও নিয়ন্ত্রিত ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গারা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার সুযোগ পাওয়ার কারণে অপ্রীতিকর ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।

উখিয়ার থাইংখালী ময়নারঘোনা ক্যাম্পের আবু তাহের মাঝি জানান, রোহিঙ্গারা পরাশ্রীকাতর। তারা অন্যের নেতৃত্ব সহ্য করতে পারে না। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে প্রতিনিয়ত ক্যাম্পে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও এনজিও কর্মীরা থামাতে পারছেন না। যে কোনো সময়ে লোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে। তিনি জানান, ১৮ জুন রাত ৮টার দিকে রোহিঙ্গাদের শীর্ষস্থানীয় নেতা (হেড মাঝি) আরিফ উলাহ নিজ বাসায় ফেরার পথে বালুখালী ১১ নং বকের পাশের রাস্তার ওপরে ৭-৮ জন দৃর্বত্ত তাকে গলা কেটে হত্যা করে। এ সময় সে প্রাণে বাঁচার জন্য চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি।

এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে উখিয়া থানার ওসি আবুল মনসুর জানান, আরিফ উলাহ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে পুলিশ তদন্ত করছে। ১৩ জানুয়ারি কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্পের ডি-৪ বকের বাসিন্দা মমতাজ আহমদ দোকান থেকে বাড়ি ফেরার পথে ৫-৬ জন মুখোশধারী দুর্বৃত্ত তাকে অপহরণ করে পাশের মধুরছড়া জঙ্গলে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে হাত-পা বেঁধে গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১৯ ফেব্র“য়ারি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে বাড়াবাড়ির একপর্যায়ে স্বামীর হাতে খুন হন স্ত্রী রেনুয়ারা বেগম।

এছাড়া গত বছরের জুন মাসে কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম নামের এক রোহিঙ্গা সোর্সকে প্রতিপক্ষরা প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা জানান, নুরুল ইসলাম রোহিঙ্গাদের নানা অপকর্মের খবরা খবর স্থানীয় প্রশাসন ও সাংবাদিকদের সরবরাহ করতেন। যে কারণে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

একই ভাবে গত বছরের জুন মাসে মিয়ানমারের বিদ্রেুাহী গ্র“পের সন্ত্রাসীরা কুতুপালং ক্যাম্পে হানা দিয়ে ক্যাম্পের মাঝি মোঃ আইয়ুব ও তার পাশের বাড়ির মোঃ ছলিমকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। দুই দিন পর বালুখালী খাল থেকে অপহৃত মাঝিসহ দু’জনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা ডা. জাফর আলম প্রকাশ ডিপো জাফর বলেন, এখানে যেসব রোহিঙ্গা যুবক রয়েছে, তাদের অধিকাংশই সন্ত্রাসী গ্র“পের সদস্য। তাদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, ক্যাম্পের ত্রাণ ভাগাভাগি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা পূর্বশত্র“তার জের ধরে একে অপরকে ঘায়েল করার চেষ্টা চলছে। যে কারণে ক্যাম্পে খুন-খারাবি বাড়ছে।

উখিয়া থানার ওসি মোঃ আবুল মনসুর বলেন, ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য ৭টি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হলেও লোকবল সংকটের কারণ বা পুলিশ ফাঁড়ি থেকে দূরত্বের কারণে অনেক সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: উখিয়া, ক্যাম্প, রাখাইন
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − five =

আরও পড়ুন