চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

fec-image

টানা ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় বিভিন্ন এলাকায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এতে পাহাড়ি ঢলে ও বৃষ্টির পানির জলবদ্ধতার গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে দুই উপজেলার অন্তত ১৪টি ইউনিয়নের প্রায় দুই শতাধিক পরিবার। মঙ্গলবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে মাতামুহুরী নদীর পানি হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানি বৃদ্ধি পেলেও আজ মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি।

এদিকে সোমবার ও মঙ্গলবার সারাদিন থেমে থেমে ভারি বর্ষণ ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধির কারনে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন এবং পৌরসভা এলাকায় বেশকিছু নিচু এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে গ্রামীণ সড়ক। বৈরি আবহাওয়া ও টানা বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি হেলে পড়েছে। কিছু কিছু জায়গায় বিদ্যুৎ ট্রান্সফার ত্রুটির কারণে গত দুই দিন ধরে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে দুটি উপজেলার অন্তত ৪০টি গ্রামের প্রায় লক্ষাধিক মানুষের জনদুর্ভোগ ও তাদের জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। যে ভাবে বৃষ্টিপাত হচ্ছে টানা ১০ থেকে ১২ ঘন্টা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বড় ধরণের ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন থেকে মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজের জন্য নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স কোম্পানির দেওয়া একটি অপরিকল্পিত মাটির বাঁধের কারণে ফাঁসিয়াখালী ও চিরিঙ্গা ইউনিয়নের অন্তত ৭টি গ্রামের লোকালয়ে পানি নিষ্কাশনে কোন ধরণের কালভার্ট না থাকায় পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। ওই এলাকার স্থানীয় নারী-পুরুষেরা নিজেদের বসতভিটার সহায়-সম্পদ রক্ষায় ম্যাক্সের দেওয়া অপরিকল্পিত মাটির বাঁধ অপসারণ করতেও দেখা গেছে।

অপর দিকে সারাদিন ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় ভয়াবহ বন্যার শঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন দুই উপজেলার মানুষ। ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পাহাড়বেষ্টিত গ্রামীণ এলাকায় পাহাড় ধসের আশঙ্কা থাকায় পাহাড়ের ওপরে ঢালু, ঝুঁকিপূর্ণ টিলা, খাদে এবং পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বা নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সরে যাওয়ার জন্য বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে। এছাড়াও উপকূলীয় এলাকায় যেসব স্লুইসগেট রয়েছে দ্রুত পানি নিচে ভাটির দিকে চলে যাওয়ার জন্য সব স্লুইচগুলো খোলা রাখার জন্য প্রশাসনের পক্ষথেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে।

মঙ্গলবার বিকেলের দিকে মাতামুহুরী উপজেলার বদরখালী, পশ্চিম বড় ভেওলা, ডেমুশিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ও উপকূলীয় পাঁচ ব্যান্ডের স্লুইসগেইট পরিদর্শন করেছেন ইউএনও শাহীন দেলোয়ার।

এ সময় তিনি সৃষ্ট জলাবদ্ধতা এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন। পরিদর্শন সময়ে সাথে ছিলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) দিলীপ দে, উপজেলা প্রকৌশলী আরিফ হোসেন, মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সোয়াইবুল ইসলাম সবুজসহ সরকারি দপ্তরের বিভিন্ন কর্মকর্তা।

উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউপির বাসিন্দা ও বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাইছার জানিয়েছেন, গত তিনদিন ধরে টানা ভারী বর্ষণের কারনে সোমবার দুপুর থেকে মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে এসেছে পাহাড়ি ঢল। পানির প্রবল স্রোতে তাঁর ইউনিয়নের বেশকিছু নিচু এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। চলাচলের প্রধান সড়ক দিয়ে হাটু সমান পানি উপচে পড়ছে। এতে মানুষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। রাতে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পুরো এলাকায় পানিতে নিমজ্জিত হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

বরইতলী ইউপি চেয়ারম্যান ছালেকুজ্জামান জানান, তাঁর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর, পহরচাঁদা, বিবিরখিল, হাফালিয়াকাটা, মছনিয়াকাটাসহ বিভিন্ন গ্রামে লোকালয়ে ঢুকছে ঢলের পানি। দুপুর থেকে ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের নিচু এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। রাতে নদীতে ঢলের পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে ইউনিয়নে নদীর তীরবর্তী কয়েকটি গ্রাম পানিবন্ধি হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। যে ভাবে বৃষ্টিপাত হচ্ছে সেই ভাবে রাতেও অব্যাহত থাকলে রাতের মধ্যে বড় ধরণের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হেফাজতুর রহমান চৌধুরী টিপু বলেন, ভারিবর্ষণে উপকূলীয় ইউনিয়নের বেশিরভাগ নীচু এলাকা হাঁটু সমান পানিতে জমে গেছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বড় ধরণের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এতে উপজেলার চিংড়ি জোনের হাজার হাজার মৎস্য প্রকল্প পানিতে তলিয়ে যাবে। এতে ঘের মালিক ও চাষীদের হাজার কোটি টাকার ক্ষতিসাধনের আশঙ্কা রয়েছে।

পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বরত চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) হারুন অর রশিদ জানান, ইউনিয়নের যেসমস্ত নিচু জায়গা রয়েছে ওইসব এলাকার প্রতিটি বাড়িতে হাটু পরিমাণ পানি ঢুকে পড়েছে। মূলত বৃষ্টির কারণে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত নিচের দিকে পানি নিষ্কাশনের কোন ধরণের ব্যবস্থা না থাকায় পানিবন্ধি হয়ে পড়েছে অন্তত শতাধিক পরিবার। এছাড়াও জলাবদ্ধতার কারণে প্রান্তিক কৃষকের বিভিন্ন রকমারী ফসলের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে নিমজ্জিত হয়েছে। রাতে কিছুটা বৃষ্টি থামলেও সকাল থেকে টানা ভারিবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। এ ভাবে একটানা ভারিবর্ষণ রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে বন্যার যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: শাহীন দেলোয়ার বলেন, সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে মাতামুহুরী নদীর পানি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত (রাত সাড়ে আটটা) পর্যন্ত নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। উপজেলার কোনো জায়গায় নদীর পানির প্রভাবের ফলে কোন ধরণের বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও জানান, উপকূলীয় এলাকার সকল ধরণের স্লুইসগেইটের কপাট খোলা রাখা হয়েছে। পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্ক করা হয়। এছাড়া এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি তদারকির জন্য উপজেলা প্রশাসন থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য শুকনো খাবারসহ সবকিছু প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: চকরিয়া
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন